করোনাভাইরাস মহামারীর আগে বিগত বছরের শেষদিকে আর চলতি বছরের শুরুতেও কারণে-অকারণে সরকারি কর্মকর্তাদের দলবেঁধে বিদেশ সফর ছিল খুবই আলোচিত-সমালোচিত একটি বিষয়। সে সময় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ‘শিক্ষাসফর’, ‘সরেজমিন পরিদর্শন’সহ নানা নামে নানা ছুঁতোয় কর্মকর্তাদের এসব বিদেশ সফরের বেশিরভাগই মূলত প্রমোদভ্রমণ। একের পর এক এমন খবরে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলতে থাকে। চলতি বছরের মার্চে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সংগত কারণে সব ধরনের বিদেশ সফরই বন্ধ হয়ে যায়। আর এখন তো বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল ও যাতায়াতও বন্ধ। অনেক দেশ ইতিপূর্বে দেওয়া ভিসাও স্থগিত করেছে। বিশ্বজুড়ে মহামারীর প্রলয়ে এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে নানা দেশের শিক্ষার্থী-শ্রমিক-ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার অগণিত মানুষ আটকে পড়েছে কিংবা যেতে পারছে না। এসব কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ গুরুতর সংকটেও পড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে একটি ক্ষেত্রে শাপে বর হলো এতে। করোনার এই মহামারী এখন সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশ্নবিদ্ধ সফরের রোগ সারাতে চলেছে।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণে লাগাম’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভ্রমণ ব্যয়ের জন্য বাজেট অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ স্থগিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। রবিবার এ বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ বিভাগ। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র। পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য। তাই সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের রুটিন ভ্রমণ পরিহার করতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটে ‘ভ্রমণ ও বদলি’ বাবদ ২ হাজার ২৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ পরিপত্র কার্যকরের মাধ্যমে সরকার অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে চায়।
কর্মকর্তাদের যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণের মারাত্মক প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে। অনেকে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন এক মন্ত্রণালয়ের জন্য, দেশে ফেরার পর তাদের সেখান থেকে অন্যত্র বদলি করে দেওয়ার নজিরও আছে। সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান সরকারের কোনো কাজে লাগে না। এভাবেই সরকারি অর্থের অপচয় হয়। অনেকেই আবার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যান। ‘মেয়াদান্তে ৭৫ সচিবের হার্ভার্ড সফর প্রকল্প’ শিরোনামে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন গত ২২ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশ হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ সফরের আশ্চর্য রোগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও কিছুতেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখলেও তা বন্ধ হয়নি। গত ১১ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এসব বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর। প্রতিবেদনের পাশাপাশি গত বছরের ১৮ অক্টোবর ‘দেশের টাকায় বিদেশ সফরের আশ্চর্য রোগ’ এবং গত ২১ জানুয়ারি ‘বিদেশ না দেখে দেশের ভালো দেখুন’ শিরোনামে এ বিষয়ে দুটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তারাও টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রশিক্ষণ শেষে সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। উচ্চপদস্থ সচিব থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কর্মকর্তারাও এই প্রবণতার বাইরে নন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই আগে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বরাদ্দ নিশ্চিত করে নেওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণের ফলে শুধু দেশের অর্থই অপচয় হচ্ছে না, বাস্তব দক্ষতার বিকাশ থেকেও কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রয়োজনে অবশ্যই কর্মকর্তারা বিদেশে যাবেন, প্রশিক্ষণ নেবেন, পড়ালেখা করবেন, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শিক্ষাসফরের নামে প্রমোদ ভ্রমণে পর্যবসিত না হয় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। মহামারীর মন্দা কাটাতে সরকারি ব্যয়ের রাশ টানার জন্য বিদেশ ভ্রমণের বাজেট বরাদ্দ অর্ধেকে নামিয়ে আনা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে, ব্যয় সংকোচনের এই চিন্তা সবসময়ই থাকা প্রয়োজন।
