বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী ছিলেন ফাহিম সালেহ। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। নাইজেরিয়া, কলম্বিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে লাখো মানুষ। হন্তারকের নির্মম আঘাতে অসময়ে চলে যাওয়া এই তরুণকে নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ
তরুণ উদ্যোক্তা
ফাহিম সালেহ ‘প্রাঙ্কডায়েল’ ও সেটির মাতৃপ্রতিষ্ঠান বিনোদন অ্যাপ ‘কিকব্যাক অ্যাপস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। এছাড়াও প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ‘হ্যাকহাউজ ঢাকা’র। দেশের জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং ‘পাঠাও’ অ্যাপসেরও সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ওয়েবসাইট তৈরির মধ্য দিয়ে ইন্টারনেটে তার পদচারণা শুরু। এরপর তৈরি করেছেন বেশ কিছু অ্যাপস। যেগুলো লাখো মানুষের ভাগ্য ও জীবন বদলে দিয়েছে।
মা-বাবার কর্মসূত্রে ফাহিমের জন্ম সৌদি আরবে। সেখানে কেটেছে অনেকটা সময়। এরপর নিউ ইয়র্কের রচেস্টারে চলে আসেন ২০১৬ সালে। সেখান থেকে ছোট্ট শহর পাফকিপসিতে বসবাস শুরু করেন। সহোদর দুই বোন তার। ছোটবেলা থেকেই উপার্জনের ঝোঁক ছিল ফাহিমের। সুযোগ হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে অষ্টম গ্রেডের ছাত্র। পড়তেন পাফকিপসির একটি বিদ্যালয়ে। নানা ওয়েবসাইট ঘুরে, পড়ালেখা করে গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গুগলের প্রতিষ্ঠাতাদের (ল্যারি পেইজ এবং সার্গেই ব্রেন) সম্পর্কে জানার আগ্রহে তার জীবনের গতিপথ বদলে যায়। কম্পিউটার বিজ্ঞানী বাবার কাছ থেকে নয়, তার বদলে প্রযুক্তিতে ফাহিমের অসামান্য দক্ষতা ও কৌশলী মন এবং মস্তিষ্কটি গড়ে দিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে ভিডিও গেমস খেলার অভ্যাসটি।
১৫ বছর বয়সে
শুরুতে যে ওয়েবসাইটটি বানিয়েছিলেন তা ছিল পরিবারকেন্দ্রিক। নাম ‘সালেহফ্যামিলি.কম’। একটি বিশেষ কম্পিউটার থেকে তথ্যগত সুবিধা, সেবা এবং অ্যাপ্লিকেশনগুলো সেই নেটওয়ার্কের অন্য কম্পিউটারগুলো হোস্টিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে। সেই ওয়েবসাইটটি ছিল শহরকেন্দ্রিক। ছেলের এমন কৃতিত্বে কম্পিউটার বিজ্ঞানী বাবা বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আত্মীয়দের অনুরোধ করেছিলেন, ‘আমার ছেলের ওয়েবসাইটি ঘুরে দেখুন’। তবে শুরুর দিকে হতাশ হতে হয়েছে তাকে। পুরো মাসে পাঁচের বেশি ভিজিটর পায়নি তার সাইট। কিন্তু সীমিত ভিজিটরেই উত্তেজনা ও উৎসাহের কমতি ছিল না ফাহিমের। ফলে বিপুল বেগে কাজে নামলেন তিনি। ১৫ বছর বয়সেই শুরু করলেন প্রোগ্রামিংয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তখনই তিনি তৈরি করেছিলেন ‘টিন-হ্যাংআউট.কম’। সেটি ছিল সময়ের অনেক বেশি আগে তৈরি কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক গণমাধ্যম। বন্ধুদের ধরে ধরে সেখানে তাদের লেখাগুলো দিতে বলতেন। এতে ব্লগিং ফোরামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর আরও অনেক প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের পর আয়ের মুখ দেখলেন। প্রথম মাসে ২ থেকে ৩ ডলার আয় হতো। যখন সাফল্য এসে ধরা দিল সেই দিনগুলো তার কাছে ছিল সুখস্মৃতির মতো।
সাফল্যের পথে
কম্পিউটারের ডেমোগ্রাফার হিসেবে কলেজে পড়ার সময়ই বছরে ১ থেকে ২ লাখ ডলার আয় করতে শুরু করেছিলেন ফাহিম। তিনি তার কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলো নিজে বানিয়েছিলেন। তার মধ্যে আছে ‘এইমডুডে.কম’, ‘আইকনফান.কম’, ‘এমএসএনডলজ.কম’, ‘আইকনডুডে.কম’সহ আরও অনেকগুলো। তিনি বলেছিলেন, ‘মনে আছে আমি অনেক সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতাম। কাজ করতে থাকতাম। সবসময় ভয় পেতাম, আমি উঠে গেলে কখন বাবা এসে বসে পড়বেন। বাবা ভাবতেন, এভাবে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকলে আমার বিদ্যালয়ের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ভালো ও মনোযোগী ছাত্র ছিলাম বলে আসলে তা হয়নি।’
ইন্টারনেটে জীবনের উল্লেখযোগ্য প্রথম আয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রাপকের হাতে পৌঁছাতে হবে এমন একটি ৫০০ ডলারের চেক পেলাম গুগলের কাছ থেকে। তখন কিশোর মাত্র।’ আয়ের অর্থ বাবাকে দেখাতে নিয়ে গেলে কোনো ধরনের উচ্চাশা প্রকাশ না করে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ভালো। চলো আমরা একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলি।’
সেই ওয়েবসাইটটি পরে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ডলারে। এই সময়ে হঠাৎ করে ফাহিমের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের কায়েল ক্যাপারের সঙ্গে। একজন তরুণ, ফাহিমের মতোই। তারও প্রযুক্তিতে গভীর জ্ঞান ও উচ্চকাক্সক্ষা আছে। তিনিও ওয়েবসাইট তৈরি করেন এবং বিক্রি করেন। আলাদা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের হলেও ওয়েবসাইট বানানোর তীব্র অনুরাগের দিক দিয়ে একে অপরের সঙ্গে মিল খুঁজে পেলেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়া
ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন ফাহিম। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, পাহাড়ে চড়া, গাড়িতে ঢিল ছোড়া ছিল তাদের প্রতিদিনের কাজ। একদিন এক গাড়ির মালিক ধরে ফেলেন তাকে। গাড়ির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০০ ডলার জরিমানা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন বাবা-মা। এতে তাদের সঞ্চয়ের খাতায় মোটে ১ হাজার ডলার অবশিষ্ট থাকে। আমেরিকায় বসবাস কঠিন হয়ে পড়ায় বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনেরও পরিকল্পনা করছিল পরিবারটি। তবে সৌভাগ্যবশত পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ানোর একটি আমন্ত্রণ পেলেন ফাহিমের বাবা। যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গেলেন তারা। এ প্রসঙ্গে ফাহিম বলেছিলেন, ‘আমরা যদি সহজ পথ বেছে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যেতাম, তাহলে আজ পর্যন্ত আমাদের উন্নতি ধীরে ধীরেই হতো।’
গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনাটিই ছিল ফাহিমের নীতিগতভাবে ভালো ও মানবিকভাবে কাজ করার টার্নিং পয়েন্ট। সাফল্য তাকে অনুসরণ করতে শুরু করল বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। সেখানে কম্পিউটার ইনফরমেশন সিস্টেমস পড়ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘কলেজে আমার পড়াশোনা ছিল ধার-কর্জ করে। খুব লজ্জা লাগত। ঋণ শোধের জন্য আমাকে দীর্ঘসময় সাইড ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। ফলে গভীর মনোযোগের সঙ্গে খুঁজে, খুঁজে বের করতে হতো কীভাবে মানুষজন শান্তভাবে আনন্দ লাভ করতে পারেন তেমন বিষয়গুলো।’ কলেজ জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে রুমমেটকে নিয়ে একটি কাস্টমাইজড টি-শার্ট কোম্পানি চালু, নাম ছিল ‘থিংক অ্যাড হার্ডি’। ছাত্রছাত্রীরা যাতে খাবার ডেলিভারি দিতে পারেন, সেজন্য ‘মেন্যুভু’ নামে একটি ফেইসবুক অ্যাপ্লিকেশনেরও যাত্রা শুরু করেছিলেন।
প্রাঙ্কডায়েল
২০০৯ সালে তিনি গ্রাজুয়েশন শেষ করলেন। যে ধরনের কাজ করতে চান, তেমন চাকরি জোগাড় করতে পারলেন না। নিজে কিছু করার প্রতি খুব আগ্রহবোধ করেন। তার দুষ্টুমি থেকে তৈরি সৃজনশীল প্রযুক্তিগত ভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এমন সবচেয়ে ভালো কাজের সঙ্গী হলো ইন্টারনেটে একটি বিশেষ কাজের জন্য ফোন করা। সেটিই ‘প্রাঙ্কডায়েল সার্ভিস’। এটি তার নিপুণভাবে সামাজিক মাধ্যমে মজা ও আন্তঃসম্পর্কিত কাজের অভিজ্ঞতার ফসল। একজন ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করতে করতেই নিজেকে তিনি মোদ্দাকথায় অ্যাপ ব্যবসার সবই শিখে ফেললেন। সেগুলোর মধ্যে আছে কৌতুক বা দুরভিসন্ধিমূলক ছলনায় নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করা। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কণ্ঠস্বরের অ্যাপসটি এখনো আছে। নিজের কৌতুক বন্ধুদের কাছে একটি মোডে পাঠিয়েছিলেন। প্রাঙ্কডায়েল বিরাট আকারে বাড়তে লাগল। ২০১৬ সালের হিসেবে এই অ্যাপের মাসিক পাঁচ লাখ ব্যবহারকারী ছিল। প্রাঙ্কডায়েল কোম্পানির সদর দপ্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের সাফেক কাউন্টির চেলসি শহরে। একটি সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে। বারবার ভ্রমণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে ফাহিম সেখানে তার স্বপ্নের জীবন কাটিয়েছেন। তবে অভিযাত্রাটি সহজ ছিল না তার জন্যও। যদিও এই পথে তিনি নানা কিছু শিখেছেন এবং দুটি অ্যাপ কোম্পানি তৈরি করেছেন। স্বীকার করেছেন ‘আমি একজন বিরাট বড় নেতা নই। আবার সেই লোকটি নই যিনি তার অফিসে ঘুরে বেড়াবেন। তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামর্থ্যরে শেষবিন্দু দিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবেন। একজন সিইও বা প্রধান নির্বাহী হিসেবে সবচেয়ে বড় কাজ হলো কর্মকর্তা নয়, চিন্তাশীলদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করানো। তবে যারা আপনার লক্ষ্য ও সাফল্য ভোগ করেন, তাদেরও তেমন হতে হবে।’ যারা এই ভুবনে কাজ করতে চান তাদের ফাহিমের উপদেশ হলো ‘দুটি বিষয় আপনাদের মধ্যে থাকতেই হবে। খুব ভালো ও যৌক্তিক কিছু উদ্ভাবনী ক্ষমতার মাধ্যমে তৈরি করতে হবে। কোনো উদ্ভাবনের উন্নতি ও কোনো পণ্যের উন্নয়ন করলে হবে না। ব্যবহারকারীবান্ধব ও তাদের প্রতি খেয়াল রেখে সবকিছু করতে হবে। আপনার পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের ভালোবাসা কীভাবে পেতে হবে উপলব্ধি করুন। ক্রেতাদের সমর্থন নিয়ে দ্রুত লাভে চলে এলে আসল সময় লাভে ছারপোকা ধরে।’ প্রাঙ্কডায়েলকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসায় রূপ দিয়েছিলেন ফাহিম।
তার চিন্তা-ভাবনা
নিজের কাজের ধরন সম্পর্কে ফাহিম বলেছিলেন, ‘আমি মানবতার জন্য সারা জীবন কাজ করবে এমন কিছু তৈরি করতে ভালোবাসি।’ প্রাঙ্কডায়েলের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘অ্যাপ ডিজাইনের মাধ্যমে যেভাবে পরস্পরের মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে, তার চেয়ে আমি পরের দিকে মনোযোগ দিতে চাই। আমার এই অ্যাপ মানুষকে হাসায় বলে তা খুব ভালো ও কার্যকর। তবে এখনো সেটি বিরাট কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে আসল প্রশ্ন হলো এই পণ্য বা সেবাটি আমি তৈরি করার আগে মনুষ্যত্ব কেমন ছিল আর আমার কাজের ক্ষমতার মাধ্যমে তাকে কীভাবে উন্নত করতে পেরেছি।’
ফাহিম প্রাঙ্কডায়েল শুরু করেছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে। ব্যবহারকারীরা একটি মেসেজ দিয়ে ঢুকে পড়েন ও কম্পিউটার তাদের পছন্দের একটি নম্বরে রোবটের নিচু গলায় ফোন করে। সাইটটিও তিনি বানিয়েছেন। কয়েকবার ব্যবহার করেছেন ও কলেজে ওঠার পর ভুলে গেছেন। এরপর একজন তার সাইটের নকল করে প্রাঙ্কডায়ালার.কম চালু করলেন। এবার একের পর এক ইন্টারনেটভিত্তিক উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহর রাস্তায় নামলেন। এই অ্যাপের আইফোন অ্যাপ সংস্করণ ৫ লাখেরও বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। অ্যানড্রয়েড সংস্করণ ডাউনলোড হয়েছে চার লাখেরও বেশিবার। আজ পর্যন্ত ১ কোটিবার ইচ্ছে করে বা মজা করে কল করেছেন ক্রেতারা (একে তিনি প্রাঙ্ক কল বলতেন)। প্রাঙ্ক সাইট থেকে তিনি নতুন ব্যবসা খুঁজতেন। ফেইসবুকের কভার ফটো থেকে শিশুদের আইফোনের গেমস খেলা সবই করা যায় তার অ্যাপের মাধ্যমে।
নেই, তবুও থাকবেন
মাত্র ৩৩ বছরে এই প্রযুক্তি জাদুকর হত্যাকারীর হাতে মারা গেছেন। তার লাশ পাওয়া গেছে নিউ ইয়র্কের পূর্ব হাউসটনের বিলাসবহুল একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ১৭ তলায়। থাকতেন ২.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দামে কেনা দুটি শোবার ঘর, দুটি বাথরুম নিয়ে। বলতেন, ‘এটি আমার বাড়ি।’ এসেছিলেন ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। ২ জুন টুইট করেছিলেন ‘২০২০ সাল খুব ভালো কাটবে মনে হচ্ছে।’ লিংকডইনে নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন, ‘আমি একজন উদ্যোক্তা যে নানাকিছু খুঁজে বেড়ায়।’ তিনি তার মা-বাবার দেশ বাংলাদেশের ‘পাঠাও’ রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। শুরু করেন ইলিয়াস হোসেনকে নিয়ে ২০১৫ সালে। একে বলা হয় দেশের সবচেয়ে ভালো স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোগ। ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্য পাঠাওয়ের। ২০১৮ সালে তিনি পাঠাও থেকে সরে আসেন। সে বছরই একই ধরনের ছোট ব্যবসা নাইজেরিয়ায় রাইড শেয়ারিং বা টাকার বিনিময়ে মোটরসাইকেল আরোহণের সঙ্গী আরেক অ্যাপস চালু করলেন। নাম রেখেছেন ‘গোকাডা’। সে বছর উবার সে দেশে ব্যবসা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সিইও হয়েছেন গেল বছর। ১ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত মোটরসাইকেল চালক তাদের। ১০ লাখের বেশিবার যাত্রী পরিবহন করেছেন। তার পরিকল্পনা ছিল, নাইজেরিয়ার প্রতিটি শহরে একটি রেস্তোরাঁসহ গোকাডা ক্লাব চালু করবেন। সেখানে চালকরা বসে বিশ্রাম করবেন। একটি গোকাডা দোকানও করবেন, যাতে চালকরা প্রতিদিনের পণ্যদ্রব্য যেমন কলা, আলু ও চাল সস্তায় কিনতে পারবেন। গোকাডা ব্যবহারের জন্য অন্যদের চেয়ে ভালো সুবিধা দিতেন। প্লাটফর্মটি ব্যবহারের জন্য চালকদের ৩ হাজার নাইজেরিয়ান নাইরা বা প্রায় ৮ মার্কিন ডলার দিতে হয়। ফাহিমের ভাষ্য ছিল ‘আমরা কোনো বাজে কাজ করতে চাই না। ভয় দেখিয়ে কাউকে আনব না। আমাজনের মতো একটি প্ল্যাটফর্ম বানাতে চাই। চালকদের আমরা একের পর এক সেবা দেব। সেগুলোর মধ্যে মোটরসাইকেলের বীমা, ব্যক্তিগত জীবন বীমা ও ক্ষুদ্রঋণ থাকবে।’ সম্প্রতি তিনি গোকাডাকে পণ্য পরিবহন সেবা খাতে রূপ দেওয়ার কাজে নিজে সাহায্য করছিলেন। সে দেশে তার সর্বশেষ অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। ২০১৯ সালের নভেম্বরে টুইটারে লিখেছেন, ‘কাজ করার সব ধরনের অনুমতি থাকার পরেও নাইজেরিয়ার ইমিগ্রেশন অফিসাররা আমাকে জোর করে তাদের অফিসে নিয়ে গিয়েছেন।’ তারা তার পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চালু করেন ম্যানহাটনভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের ফার্ম অ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড। তারা কলম্বিয়া ও নাইজেরিয়াতে বিনিয়োগ করেন। কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ‘পিআপ’-এ তার বিনিয়োগ আছে। বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন আইডিয়াতে-পূর্ণ মানুষ। অনেকেই ফাহিমকে বলতেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের এলন মাস্ক’। তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা করতেন নাইজেরিয়া ও বাংলাদেশে। তার মৃত্যুকে নিউ ইয়র্ক টাইমস একজন পেশাদার খুনির কাজ বলে জানিয়েছে। মা-বাবা ছেলের মৃত্যুকে বলেছেন, ‘অতল আঘাত’।
