শত্রুর ডেরায় বাস করতেন হ্যারল্ড লারউড

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২০, ০৭:১০ এএম

হ্যারল্ড লারউড, ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার। মাত্র ২১ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২৮.৩৫ গড়ে নিয়েছিলেন ৭৮ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট চারবার, ১০ উইকেট একবার। বিস্ময়ের ব্যাপার মাত্র ২৮ বছর বয়সেই ক্রিকেটকে গুডবাই বলে দেন তিনি। কারণ ‘বডিলাইন’ সিরিজ। ক্রিকেট ইতিহাসে ১৯৩২-৩৩-এর এই সিরিজের কারণে লারউডের যে দুর্নাম হয়েছিল, তা তার ক্যারিয়ারের সুনাম পুরোটাই ঢেকে দেয়। সেই ক্ষোভ থেকেই কি-না ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটার জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতি ঘটিয়ে চলে যান যাদের বিরুদ্ধে খেলে তার ‘দুর্নাম’ রটেছিলে সেই অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৫০-এ পাকাপাকিভাবে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমানোর পর সিডনিতে কেটেছে তার অর্ধেক জীবন। সেখানেই ১৯৯৫-এর ২২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

নটিংহ্যাম নিবাসী লারউডের বাবা ছিলেন পাথর খনির একজন শ্রমিক। পড়াশোনার পাঠটা বেশিদূর হয়ে ওঠেনি লারউডেরে। স্কুল ছেড়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে লেগে যান কাজে। কী ভেবে যেন ১৮ বছর বয়সে ট্রেন্টব্রিজে নটিংহ্যামশায়ার ক্লাবের ট্রায়ালে চলে আসেন লারউড। ওই সময় দলটির ভালো পেসার প্রয়োজন। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার লারউড তখন ভয়ংকর গতি তুলছেন বলে। ব্যাস, তাকে আর পায় কে; প্রথম ট্রায়ালেই বাজিমাত করে নটিংহ্যামশায়ারের দ্বিতীয় দলে জায়গা করে নিলেন। এক বছরের মাথায় ১৯২৫ সালে ঢুকলেন কাউন্টির মূল দলে। পরের বছর ইংল্যান্ড জাতীয় দলে। তাও আবার অ্যাশেজেই। তার ৬ উইকেটে ওভাল টেস্ট জিতে সিরিজ নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড।

বছর খানেকের মধ্যেই বিশ্বসেরা গতিময় পেসার হিসেবে লারউডকে শ্রদ্ধা করতে লাগল ক্রিকেট বিশ্ব। ১৯২৮-এ বাঁহাতি পেসার বিল ভসের সঙ্গে বিশ্বসেরা ওপেনিং বোলিং জুটি গড়ে তোলেন লারউড। ১৯২৮-২৯-এর অ্যাশেজে ব্রিসবেন টেস্টে ৩২ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা পারফর্ম করেন লারউড। শুরুর ৬ ব্যাটসম্যানকেই তুলে নিলেও সেই সিরিজে অভিষিক্ত ডন ব্র্যাডম্যানের উইকেটটি পাননি। দু’বছরের মধ্যে এই ব্র্যাডম্যান হয়ে ওঠেন বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান, যাকে আউট করা ছিল দুঃসাধ্য।

ব্র্যাডম্যান অনাক্রমণসাধ্য আর লারউড বিশ্বের সেরা পেসারÑ এমন অবস্থা নিয়ে ১৯৩২-৩৩-এর অ্যাশেজ এগিয়ে আসছে। নটিংহ্যামশায়ার অধিনায়ক আর্থার কার ততদিনে একটি কৌশল তৈরি করে ফেলেছেন। ব্যাটসম্যানের লেগসাইডে ক্যাচিং পজিশনে ফিল্ডার রেখে তার গা লক্ষ করে বল করা। যার সফল রূপ দেন লারউড কাউন্টিতে। তার বল খেলতে গিয়ে কয়েকজন ব্যাটসম্যান অচেতন হয়ে মাঠ ছাড়ছেন, কেউ আঘাত পাচ্ছেন, কেউ ভয়ে বল খেলতেই পারছেন না। এই কৌশলটাই ১৯৩২-৩৩-এ অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রয়োগ করেন তখনকার ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন।

ব্যাস ততক্ষণে নেতিবাচক ক্রিকেট প্রদর্শনী হিসেবে রটে গেছে এই কৌশল। দর্শক-সমর্থক ও সমালোচকরা ইংল্যান্ডের এই কৌশলকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। সেই সিরিজের অ্যাডিলেড টেস্টে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে যখন অস্ট্রেলিয়ার বিল উডফল ও বার্ট ওল্ডফিল্ডি লারউডের বলে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়েন। খলনায়ক হয়ে গেলেন লারউড।

ইংল্যান্ডে হুলস্থূল কা-। সঠিক যোগাযোগের অভাব, সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জিত খবর ও সিরিজে বডিলাইন কা-ে ইংল্যান্ডের নাম খারাপ হওয়ায় সব ঘৃণা গিয়ে পড়ল লারউডের ওপর। তিনি বুঝলেন তাকে এমন বোলিং করার জন্য ক্ষমা চাইতে হতে পারে। কিন্তু লারউড স্বেচ্ছায় তো এমনটা করেননি, অধিনায়কের নির্দেশেই অমন বল করেছিলেন। তাই অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইংল্যান্ডের ক্ষমার চিঠিতে স্বাক্ষর করতে অপারগতা প্রকাশ করেন লারউড। আর এরপর থেকে আর টেস্ট খেলেননি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা সেখানেই শেষ।

তবে ইতিহাস সত্যটা প্রকাশ করে দেয়, বডিলাইন কা-ের আসল ভিলেন হয়ে ওঠেন অধিনায়ক জার্ডিন। আর অধিনায়কের প্রতি লারউডের বাধ্যতা প্রশংসা পায়, যা সমাদৃত হয় তার মৃত্যু অবধি। জাতীয় দলে না খেললেও ১৯৩৬ পর্যন্ত কাউন্টিতে খেলে যান লারউড এবং পাঁচবার সেরা গড় তোলা বোলার হন। অবশেষে ১৯৩৮-এ অবসর নিয়ে নিজের ছোট ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৪৯-এ দীর্ঘদিন ক্রিকেটের বাইরে থাকা লারউডকে সম্মানসূচক এমসিসির সদস্যপদ দেওয়া হয়। পরের বছর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার জ্যাক ফিংলেটন। রাজি হন লারউড। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে প্রতিপক্ষ দলের বোলার হিসেবে যে আমন্ত্রণ তিনি পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, এবার উল্টোটা পান। সিডনিতে বসবাসকালেও সবার কাছে ভালোবাসাই পেয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় একটি কোমলপানীয় কোম্পানির হয়ে কাজ করেছেন লারউড। আর ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলে ধারাভাষ্য দিতে ডাক পড়ত তার। কিন্তু কখনই সাংবাদিকদের কাছে বডিলাইন সিরিজ বা ক্রিকেট নিয়ে পরবর্তী জীবনে কোনো কথাই বলেননি। বৃদ্ধ বয়সে একবার এক সাংবাদিক লারউডের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে লারউড বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট বা বডিলাইন নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেছো কি তোমার সঙ্গে আমি কথা বলাই বন্ধ করে দেব।’ বলা হয়ে থাকে, ইংল্যান্ডের প্রতি রাগ থাকলেও ডগলাস জার্ডিনের কারণে যে তাকে ‘খলনায়ক’ হতে হয়েছিল, এ জন্য অধিনায়কের প্রতি কোনো ক্ষোভ ছিল না তার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত