তিন ঠিকাদার গিলে খাচ্ছে আজিমপুর মাতৃসদন!

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২০, ০৪:৩২ এএম

তিন ঠিকাদারের একটি চক্র যেন গিলে খাচ্ছে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। মা ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এ প্রতিষ্ঠানটি দেড় যুগ ধরে এই চক্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। হাসপাতালটির ক্যানটিন পরিচালনা থেকে শুরু করে ওষুধ কেনা, সরঞ্জাম সরবরাহসহ সবকিছু চক্রটির নিয়ন্ত্রণে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কও তাদের কথার বাইরে যেতে পারেন না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতাকে ম্যানেজ করে এই তিন ঠিকাদার দীর্ঘদিন থেকে অনিয়ম করে যাচ্ছেন বলে দেশ রূপান্তরকে হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এলাকাবাসী জানিয়েছেন। গত ১৮ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা করে। ওই দিনই ২৫ আসামির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন মামলার বাদী ও দুদকের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিক। পরে আসামিরা আদালত থেকে জমিন নেন। অবশ্য মামলা হলেও হাসপাতালটিতে ডা. ইশরাত জাহানসহ চার আসামির সবাই আছেন বহাল তবিয়তে।

মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তদন্ত তদারকিতে থাকা দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চার মামলার অভিযোগপত্র তৈরির কাজ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তা কমিশনে উপস্থাপন করা হবে।’

এলাকার বাসিন্দারা জানান, মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের কাছে আজিমপুর মেটার্নিটি নামে পরিচিত। এই হাসপাতালে যে তিন ঠিকাদারের সিন্ডিকেট কাজ করে সেগুলো হচ্ছে মনার্ক এস্টাব্লিশমেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. ফাতে নূর ইসলাম, মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্নারের স্বত্বাধিকারী শেখ ইদ্রিস উদ্দিন ওরফে চঞ্চল এবং সান্ত¡না ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নিজামুর রহমান চৌধুরী। তারা সবাই দুদকের মামলার আসামি। এই তিন ঠিকাদারের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ওষুধ কিনতে হয়। এমনকি কোনো চিকিৎসকই তাদের সরবরাহ করা তালিকার বাইরে কোনো ওষুধের নাম প্রেসক্রিপশনে লিখতে পারেন না। তাদের তালিকার বাইরে ওষুধের নাম লিখলেই সেই চিকিৎসককে নানাভাবে নাজেহাল করা হয়। ওষুধও কিনতে হয় তাদের নির্ধারিত দোকান থেকে।

তিন ঠিকাদারের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাতে নূরের বিরুদ্ধে আজিমপুর লালবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ ছিল। লালবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, হামলাসহ বেশ কিছু মামলাও আছে তার নামে। একসময় তিনি আজিমপুর ছেড়ে মিরপুরে চলে যান। তবে প্রতিদিনই হাসপাতালে আসেন এবং ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের কাজ করেন।

আরেক ঠিকাদার শেখ ইদ্রিস উদ্দিন ওরফে চঞ্চলের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। হাসপাতালের সামনে একটি ফার্মেসির দোকান আছে তার। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই তার কাছে একরকম অসহায়। চঞ্চলের মামা বাবুল মিয়া ছিলেন আজিমপুর মেটার্নিটির গাড়িচালক। পরে তিনি চঞ্চলের শ^শুর হন। মূলত এই গাড়িচালক শ^শুরের মাধ্যমেই চঞ্চল আজিমপুর মেটার্নিটিতে আস্তানা গাড়েন। নিষিদ্ধ প্যাথেডিনসহ মাদকদ্রব্য বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাদকদ্রব্য বিক্রির অভিযোগে তাকে বেশ কয়েকবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তারও করেছিল। এ ছাড়া আমদানিনিষিদ্ধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগে মোবাইল কোর্ট তাকে জরিমানা করে।

অপর ঠিকাদার নিজামুর রহমান চৌধুরী আজিমপুর মেটার্নিটিতে সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ করেন। হাসপাতালে সুঁই-সিরিঞ্জ থেকে শুরু করে চেয়ারটেবিল ও আবসাব তার কাছ থেকে নিতে হয়। তার সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ হাসপাতালে কোনো দরপত্রে অংশ নেওয়া বা পণ্য সরবরাহ করতে পারে না। প্রভাবশালী স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন তিনি।

বিভিন্ন হাসপাতালে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট কাজ করছে। বিভিন্ন হাসপাতালে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

গত ডিসেম্বরে দুদক তিন ঠিকাদারসহ আজিমপুর মেটার্নিটিতে দুর্নীতির অভিযোগে ২৫ জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে। মামলাগুলোর এজাহারে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্র্তৃক নির্ধারিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত দরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ কেনার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সেটা না মেনে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে তিন ঠিকাদারের কাছ থেকে ওষুধ কিনছে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। দুই সংস্থার ওষুধের তালিকা ও তালিকায় উল্লিখিত মূল্যের বাইরে ওষুধ কেনার প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদন নেয়নি। ওষুধের মোড়কের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ মূল্যের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী। বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে আত্মসাৎ করা হয় ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কেনাকাটার ক্ষেত্রে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এই কেনাকাটায় বড় ভূমিকা রাখেন প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহান।

কমিশনের অনুসন্ধান কর্মকর্তা প্রায় দুই বছরের বেশি সময় অনুসন্ধান করে ডা. ইশরাত জাহানসহ আসামিদের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনেন। চার মামলার ২৫ আসামির মধ্যে রয়েছেন ১৭ চিকিৎসক ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ৫ কর্মকর্তা ও তিন ঠিকাদার। এর মধ্যে ইশরাত জাহানকে চার মামলাতেই আসামি করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওষুধ, সার্জিক্যাল-যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি আইটেম টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার ক্ষেত্রে এমআরপি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল্যতালিকা অনুসরণ করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল রিকুইজিট (এমএসআর) সামগ্রীর মূল্যতালিকা অনুসারে সার্জিক্যাল আইটেম ও যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। এমএসআরবহির্ভূত মালামাল কেনার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই বাজারদর আমলে না নিয়ে কেনাকাটা করা হয়। এ ক্ষেত্রে বাজার যাচাই কমিটির তৈরি মনগড়া ও ভিত্তিহীন দরকে বিবেচনায় নিয়ে চড়া দামে মালামাল কেনার মাধ্যমে ওই পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সান্ত¡না ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দিয়ে বাজারদরের চেয়ে উচ্চমূল্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার কথা বলা হয়।

দুদকের মামলায় আসামি যারা : চার মামলায় আসামিরা হলেন আজিমপুর মতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও টেন্ডারসংক্রান্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইশরাত জাহান, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য পারভীন হক চৌধুরী, মাতৃসদনের সাবেক সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য মাহফুজা খাতুন, সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ) ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য চিন্ময় কান্তি দাস, সাবেক মেডিকেল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সাইফুল ইসলাম, মেডিকেল অফিসার (শিশু) ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য মাহফুজা দিলারা আকতার, হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য নাজরিনা বেগম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য জেবুন্নেসা হোসেন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ও বাজারদর যাচাই কমিটির সভাপতি রওশন হোসেন জাহান, মাতৃসদনের সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ) ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. লুৎফুল কবীর খান, মেডিকেল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য রওশন জাহান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হালিমা খাতুন, মাতৃসদনের বিভাগীয় প্রধান (শিশু) ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য মো. আমীর হোচাইন, সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য মোসা. রইছা খাতুন ও সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী গোলাম আহসান, সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) নাদিরা আফরোজ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার ও মেডিকেল অফিসার আলেয়া ফেরদৌসিকে আসামি করা হয়েছে।

সক্রিয় শক্তিশালী দালালচক্র : হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজিমপুর মেটার্নিটিতে শক্তিশালী দালালচক্র আছে। তাদের কাজ হচ্ছে হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা। এই চক্রের হয়ে কাজ করে কয়েকজন আয়া, কর্মচারী ও পাশের ক্লিনিকগুলোর নিয়োগ করা প্রতিনিধি। আজিমপুর মেটার্নিটির আশপাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন অন্তত ১০টি মেটার্নিটি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে দালালরা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার কাজ করে। দালালচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযাগে হাসপাতালের আয়া রাশেদাকে বরখাস্ত করা হয়। বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আলম, জামাল, সাঈদ, জাহিদ, দেলোয়ার, রাশেদা, ইয়ার আলীসহ বেশ কয়েকজন দালাল। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

তিন ঠিকাদার চক্রের কাছে আজিমপুর মেটার্নিটি জিম্মি হয়ে পড়ার বিষয়ে হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য গতকাল বুধবার তার অফিসে গেলে জানানো হয় তিনি করোনা পরিস্থিতির কারণে অফিসে আসেননি। পরে বেশ কয়েক দফায় ফোনে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত