জেকেজির করোনার নমুনা সংগ্রহ

ডিজিসহ নানামুখী চাপে অনুমোদন দিতে বাধ্য হন এডিজি নাসিমা

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২০, ০৪:৩৯ এএম

জেকেজি হেলথ কেয়ারকে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গতকাল বুধবার বিকেলে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গিয়ে তাকে এক ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তিনি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদেরসহ নানামুখী চাপে জেকেজিকে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমোদনসংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন বলে ডিবির তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। ডিবির ওই দলে থাকা একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। যদিও অনুমতিপত্র সংবলিত ওই ফাইল ডিবি কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেননি অধ্যাপক নাসিমা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদুর রহমান জানান, করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন জালিয়াতিতে জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি) বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তের প্রয়োজনে ডিবি কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য নিয়েছেন।

জানা যায়, গতকাল বিকেলে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের একটি টিম জেকেজিকে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যায়। তারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানার সঙ্গে তার কক্ষে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন।

ডিবির ওই দলে থাকা এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেকেজির অনুমোদনসংক্রান্ত নথিতে ডা. নাসিমার স্বাক্ষর রয়েছে। মূলত তার স্বাক্ষরেই জেকেজিকে করোনার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। বিষয়টি স্বীকার করে ডা. নাসিমা ডিবির টিমকে বলেছেন, তার কাছে নথি উপস্থাপন হওয়ার পর তিনি বিষয়টি নাকচ করে দেন। পরে অধিপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (সদ্য পদত্যাগ করা) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ তাকে ফাইল অনুমোদন করার নির্দেশ দেন। এরপরও তিনি (নাসিমা) তিন দিন ফাইল আটকে রাখেন। পরে মহাপরিচালকসহ নানামুখী চাপে তিনি জেকেজির ফাইলে স্বাক্ষর করেন। করোনার নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি তার জানা ছিল না। তাদের সঙ্গে শর্ত ছিল নমুনা সংগ্রহ করে তারা আইইডিসিআরে পাঠাবে। তারা প্রতিদিন নমুনা আইইডিসিআরে পাঠাত।

আইইডিসিআরে নমুনা পাঠানোর পাশাপাশি জেকেজি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে ৪৪টি বুথ বসিয়ে ও হটলাইন খুলে অনুমোদনের চেয়ে অধিক হারে নমুনা সংগ্রহ শুরু করে। এছাড়া তারা করোনা পরীক্ষার ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাবরিনা জেকেজির চেয়ারম্যান নয়, আহ্বায়ক ছিলেন : জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়, আহ্বায়ক হিসেবে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (ডিবি) প্রধান আবদুল বাতেন। গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ‘চেয়ারম্যান হিসেবে নয়, জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি) আহ্বায়ক ছিলেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন। গ্রেপ্তারের আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডা. সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান পরিচয় দিলেও ডিবির তদন্তে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চেয়ারম্যান হিসেবে কোনো নথিপত্র আমরা পাইনি। তবে আহ্বায়ক হিসেবে সম্পৃক্ত থাকার নথিপত্র পাওয়া গেছে।’

এর আগে ডিবির কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. সাবরিনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি জেকেজি থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন নিতেন। এছাড়া জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে নেওয়া দুটি চেক পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল বাতেন আরও বলেন, ‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা দ্রুতই চার্জশিট দিতে পারব।’

করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গত ২৩ জুন আরিফুল হক চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। জেকেজির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর ২৪ জুন করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির অনুমতি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পুলিশি তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে করোনা সনদ জালিয়াতিতে ডা. সাবরিনার নাম আসে। তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার। গত ১২ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং ওইদিনই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাকে ১৩ জুলাই তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরীকে গত বুধবার দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। আর সাবরিনাকে দ্বিতীয় দফায় দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় গত শুক্রবার। ডিবি কার্যালয়ে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরিফকে গত ১৯ জুলাই এবং সাবরিনাকে ২০ জুলাই (সোমবার) কারাগারে পাঠানো হয়। তারা দুজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত