গত কয়েক দিন ধরে আমাদের সংবাদমাধ্যমের একটা প্রিয় শব্দ হয়ে উঠেছে ভাবমূর্তি। অনেক রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবারই সাংঘাতিক দুশ্চিন্তা এই ভাবমূর্তি নিয়ে। সাহেদ নামের একজন আওয়ামী লীগ নেতার করোনা টেস্ট জালিয়াতি ও সরকারি আনুকূল্যে ডাক্তার সাবরিনা-আরিফ দম্পতির জেকেজি কেলেঙ্কারির খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে তারা সবাই চিন্তিত। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, করোনার ভুয়া সনদে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের সত্যতা মেলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনেও। ‘সাহেদ-সাবরিনা : আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে আসায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ, বিপাকে প্রবাসীরা’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে (১৭ জুলাই ২০২০) বিবিসি বাংলা লেখে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে যে খবরটি প্রকাশ করে তার শিরোনাম, ‘বিগ বিজনেস ইন বাংলাদেশ : সেলিং ফেইক করোনাভাইরাস সার্টিফিকেটস।’ অর্থাৎ বাংলাদেশে জাল করোনাভাইরাস সার্টিফিকেট নিয়ে বিরাট ব্যবসা ফাঁদা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে এই ধরনের সার্টিফিকেটের একটা বড় বাজার আছে। কারণ ইউরোপে কাজ করেন যেসব বাংলাদেশি, তারা সেখানে ফিরে যেতে উদগ্রীব। এই অভিবাসী বাংলাদেশিরা সেখানে মুদির দোকান, রেস্তোরাঁয় কাজ করেন বা রাস্তায় পানির বোতল বিক্রি করেন। যেসব বাংলাদেশি ইতালিতে কাজ করেন, তাদের চাকরিস্থলে মালিকরা তাদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে এরকম সার্টিফিকেট চাইছেন।
কাতারভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভশনে এবং তাদের ইংরেজি ওয়েবসাইটেও এই খবরটি বড় করে প্রচার করা হয়েছে।
বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট তুলে ধরে বিবিসি লেখে, বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে দুর্নীতির খবর যে-রকম ফলাও প্রচার পেয়েছে, তাতে এসব দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ।
বিবিসি বাংলা তাদের রিপোর্টে ‘নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ’ কথাটি লিখে নিশ্চয়ই তার পাঠককে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে এই দেশটির ‘ভাবমূর্তি’ বহির্বিশ্বে অহরহই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে। কারণ মাত্র কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়েছেন অবৈধ মানবপাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে। তবে পাপুল তার পাপ কুয়েতে ঢেকে রাখতে না পারলেও আওয়ামী লীগ এই পাপের দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে বেশ দ্রুততার সঙ্গেই।
আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য এবং দলটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রকাশ্য দহরম মহরম মাখামাখি সত্ত্বেও করোনা কেলেঙ্কারিতে ধরা খাওয়ার পর দলটি জানিয়ে দিল, সাহেদ কস্মিনকালেও তাদের কেউ ছিল না। একই ভাবে যে পাপুলকে আওয়ামী লীগ এমপি বানিয়ে আনল, তার বউকে নারী কোটায় এমপি বানাল ও দলীয় পদ দিল, সেই পাপুল কুয়েতে পাকড়াও হওয়ার পরে বলে দিল এই লোক তাদের কেউ না। তিনি তো স্বতন্ত্র এমপি! অথচ এই পাপুলকে জেতানোর জন্য আওয়ামী লীগ কী ভূমিকা নিয়েছিল তা এখন প্রকাশিত হচ্ছে। তাকে জেতাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল ইসলামের সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। আপনাদের জানা আছে যে শহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত নেতা ও মাঠ পর্যায়ের সক্রিয় কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বৃহত্তর স্বার্থে এ আসনে বিজয় দলের পক্ষে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে শহিদুল ইসলামকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বরাদ্দ দেওয়া তার প্রতীকে বিজয় নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরি।
যে পাপুলকে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত নেতা ও মাঠ পর্যায়ের সক্রিয় কর্মী, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে ঘোষণা দিল, সেই পাপুলের হাতে কুয়েতে হাতকড়া পড়ার পর এখন আর সে আওয়ামী লীগের কেউ না! আওয়ামী মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়ার পাপের দায় এড়াতেও একই কৌশল প্রয়োগের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল আওয়ামী লীগ।
এই করোনাকালে শুধু সাহেদ-সাবরিনা-পাপুল কান্ডই বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এসেছে তাই নয়। এর আগে আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের সংবাদেও প্রকাশ হয়েছিল, বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলার জন্য সরকারি বরাদ্দের টাকা ও চাল চুরি করেছেন জনপ্রতিনিধিরা। তাতে কি দেশের ভাবমূর্তি বেড়েছিল? কিন্তু সরকার সেই চাল চোরদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে বরং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় নেমে পড়ে বিরুদ্ধমতের মানুষদের হয়রানি, মামলা ও গ্রেপ্তারের কাজে।
সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন পোস্ট, ছবি, অডিও-ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করেও প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সরকার। মে মাসের শুরুর দিকে সরকার শুধু তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুঁশিয়ারি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। কার্টুনিস্ট কিশোরসহ ১১ লেখক-সাংবাদিক-সংগঠককে মামলা দিয়ে জেলে পুরে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। ভাবমূর্তি রক্ষার নামে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতা এই করোনাকালেও বন্ধ থাকেনি। হাইস্কুলে পড়া শিশুও বাদ যায়নি আইসিটি আইনে মামলার হাত থেকে।
এই উন্মুক্ত বিশ্বে কিছু লুকিয়ে রাখা কঠিন। যে যেমন ভাব নিয়েই থাকুন না কেন, কোনো না কোনো ভাবে তার আসল মূর্তিটা বের হয়ে আসবেই। এই দেশের সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কথা কে না জানে? এই দেশের টাকা পাচারের সংবাদ, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের টাকার পাহাড়, হঠাৎ অতিধনী বৃদ্ধির রেকর্ড, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের হিড়িক, কানাডার বেগম পাড়ার খবর কার অজানা? এগুলো আমাদের কী ভাবমূর্তি তুলে ধরে? গণতন্ত্র সূচকে যে আমরা কোথায় আছি সেটা তো প্রতি বছরই প্রকাশ হচ্ছে। এই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের শাসনের তিরোধান, ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি নিপীড়ন সারা বিশ্ব জানে। গুম, খুন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার হরণ তো বিশ্ব মিডিয়ায় প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছে। এর কোনটা নিয়ে আমরা বিশ্বদরবারে মুখ উঁচু করে কথা বলতে পারছি?
তবে হ্যাঁ, এতদিন শাসক গোষ্ঠী নানান গল্প দিয়ে একটা ভাব নিয়ে ছিল বটে। শহরের উড়াল সেতু, কিছু মেগা প্রজেক্ট, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স শব্দগুলো তাদের এক ধরনের আরোপিত ভাব এনে দিয়েছিল। তারা উন্নয়নের গল্প দিয়ে গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার, মানবাধিকার, সুশাসন ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছিল। কিন্তু সেই গল্পের বেলুনটাকে ফুটো করে দিয়েছে করোনা। দেশের অন্য প্রতিটা খাতের মতোই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও যে কতটা নড়বড়ে তা স্পষ্ট করে দিল এই করোনা।
মহামারীর কালে দেশের নকল মাস্ক ও করোনা টেস্টের জালিয়াতি বিশ্বমিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তোলায় দেশের ভাবমূর্তির চেয়েও বেশি বিপদে পড়েছেন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সোয়া কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি। যারা এই দেশটির অন্যতম চালিকাশক্তি, তারাই এই দেশের সরকার ও তাদের দলীয় লোকজনের জালিয়াতির কারণে আজ বিপদগ্রস্ত। তাদের দিকে অন্য দেশের মানুষ এখন সন্দেহের চোখে তাকায়। কোনো অপরাধ না করেও তারা আজ অনেকের চোখে অপরাধী হয়ে পড়েছেন। অনেক দেশ আমাদের ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। তাই এখন তথাকথিত ভাবমূর্তি ও ভাব নিয়ে না ভেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কী করে বিব্রতকর অবস্থা ও বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়, সে চেষ্টাটাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।
লেখক
চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
