স্বাস্থ্য প্রশাসনে আতঙ্ক কখন কার নাম বেরোয়

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ০৬:০৯ এএম

নমুনা পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান মোহাম্মদ সাহেদ ও জিকেজির ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীসহ এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজনের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের পর থেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তোলপাড়; বিশেষ করে এ ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদের (সদ্য বিদায়ী) পদত্যাগ এবং এর আগে-পরে কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ওএসডি ও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম ও প্রতারক সাহেদকে অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা চেয়ে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে ই-মেইল ও কুরিয়ারের মাধ্যমে এই নোটিস পাঠানো হয়। গতকাল শুক্রবার ন্যাশনাল ল-ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এম জুলফিকার আলী জুনু এ নোটিস দেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এখন সবাই নতুন ডিজির জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি কোন জায়গায় থেকে কাজ শুরু করবেন এবং তার পরিকল্পনা কী হবে এবং কী নির্দেশনা দেওয়া হবে তার অপেক্ষা সবার। এদিকে রিমান্ডে সাহেদ, সাবরিনা ও আরিফের দেওয়া তথ্য নিয়েও সবার মধ্যে আতঙ্ক চলছে। কখন কার নাম চলে আসে; বিশেষ করে গত বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আজাদ ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানাকে দুদকের টিমের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যাওয়ার পর থেকে আতঙ্ক আরও বাড়তে থাকে। যদিও ওই দিন ডা. আজাদ অধিদপ্তরে যাননি। দুদকের টিম নাসিমা সুলতানার কাছে জেকেজিকে নমুনা পরীক্ষার অনুমোদনের নথিপত্র চেয়েছে। কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেল এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জেকেজির অনুমোদনে স্বাচিবের (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ) প্রভাবের কথা শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া অধিদপ্তর থেকে নমুনা পরীক্ষার বিষয় সরিয়ে মন্ত্রণালয়ে কীভাবে গেল সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, শুধু অধিদপ্তরকে শাস্তি দিলে হবে না। এর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বড় প্রভাব যুক্ত রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।

জানা গেছে, রিমান্ডে সাহেদ ও সাবরিনা অনেকের নাম বলেছেন। সেখানে মন্ত্রণালয় ও স্বাচিবের কথা এসেছে। এটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে এখন মহাদুর্যোগ চলছে। ফলে কোনো কাজই আর এগোচ্ছে না।

জানা গেছে, আগামীকাল রবিবার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন স্বাস্থ্য মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম যোগদান করতে পারেন। এর আগে আজ তিনি সকাল সাড়ে ৮টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। তবে এদিন তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না।

নতুন ডিজি খুরশীদ আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, যোগদানের আগে তিনি গণমাধ্যমে কোনো কথা বলবেন না। তিনি আশা করছেন রবিবার যোগদান করবেন এবং পরে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন। এর আগে কোনো বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানিয়েছেন, নবনিযুক্ত স্বাস্থ্য মহাপরিচালক বৃহস্পতিবার থেকেই হোম ওয়ার্ক শুরু করেছেন। তিনি তার ঘনিষ্ঠজন এবং কয়েকজন জনস্বাস্থ্যবিদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন, সে বিষয়েও তিনি পরামর্শ নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, করোনা ইস্যুতে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতিতে যখন স্বাস্থ্য খাত আস্থাহীন হয়ে পড়ছে, তখন সরকারপ্রধানের নির্দেশে একজন ক্লিন ইমেজের ডিজি খোঁজা হয়। ডা. খুরশীদ আলমকে নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক নেই। তিনি সৎ এবং নিষ্ঠাবান হিসেবেই পরিচিত। একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে তার ক্লিন ইমেজের বিষয়টি উঠে আসে।

প্রসঙ্গত, নমুনা পরীক্ষায় বিতর্কিত রিজেন্ট হাসপাতাল, জেকেজি হেলথ কেয়ারের জালিয়াতি ফাঁস হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। সম্প্রতি বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নেওয়া দুটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সেখানে বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পে গগলস ও পিপিইর দাম বাজারমূল্যের কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে। যদিও এই প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের আগেই গত মাসে প্রকল্প পরিচালককে বদলি করে সরকার। মহামারীর মধ্যে নানা অভিযোগ ওঠায় এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ডা. আবুল কালাম আজাদ বিদায় নেন।

জানা গেছে, শুধু সচিব বা মহাপরিচালক নন। মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত সচিবকে ইতিমধ্যে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহসহ ৮ থেকে ১০ জন বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি করা হয়েছে। অধিদপ্তরের ১০ থেকে ১২ মধ্যমপর্যায়ের কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এখন পরিচালক পদমর্যাদার ১৫ থেকে ২০ জন কর্মকর্তা বদলির সিদ্ধান্ত রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল হাসানকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজির গ্রেপ্তার চেয়ে আইনি নোটিস

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম ও প্রতারক সাহেদকে অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা চেয়ে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে ই-মেইল ও কুরিয়ারের মাধ্যমে এই নোটিস পাঠানো হয়।

নোটিসে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেখে এটাই প্রমাণিত যে, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চরমে পৌঁছেছে। অধিকাংশ কভিড হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ নেই বলে জানা গেছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই দুর্নীতি শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজির (আবুল কালাম আজাদ) আশীর্বাদপুষ্টদের কাছে করোনা যেন আশীর্বাদরূপে আবির্ভাব হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী যেমন পিপিই, মাস্ক ও ওষুধ সরবরাহ দিয়ে শুরু বলা যায়। এসব অনিয়ম কর্র্তৃপক্ষের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কি আদৌ আছে? করোনাকালেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রীর কেনাকাটায় দুর্নীতি চরমে। এর দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদত্যাগকারী ডিজি এড়াতে পারেন না। করোনা মহামারীর এই সংকটকালে পুরো জাতি যখন ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন, যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, যখন সরকারি হিসাব মতে দৈনিক প্রায় ৪০ জন করে করোনা রোগী মারা যাচ্ছেন, তখন স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের শামিল। স্বাস্থ্য খাতের জবাবদিহিহীন দুর্নীতির দায় অবশ্যই সদ্য পদত্যাগকারী ডিজিকে বহন করতে হবে। এ ছাড়া জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণা ও রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তি স্বাক্ষরের দায় অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নিতে হবে।’

নোটিসে আরও বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকেই রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্স অবৈধ জানা সত্ত্বেও হাসপাতালটিতে করোনা টেস্ট ও চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কীভাবে চুক্তি করল? ওই চুক্তি অনুষ্ঠানে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিবসহ কয়েকজন সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর উপস্থিতি থাকার প্রটোকল নেই।

তাই এই আইনি নোটিসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারক সাহেদকে অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে আবুল কালামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির সুনির্দিষ্ট বিধান মতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার অনুরোধ জানানো হয়। অন্যথায় জনস্বার্থে যথাযথ নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট করা হবে বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত