প্রতিটি মানুষ যে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ০১:৩৪ এএম

‘কেমন আছেন, ভালো তো?’ এখন কাউকে কি আমরা এটা সহজে জিজ্ঞাসা করতে পারি? পারি না। করোনার এই সময়ে প্রশ্নটা নিষিদ্ধ না ঠিক, তারপরও প্রায় নিষিদ্ধের মতোই। পৃথিবীর সবাই যখন সংকটে তখন নিজে ভালো আছি, এটা বলাও লজ্জার। যদি কথার অভ্যাসে বলিও, তাতে বেদনার সুর মিশে থাকে। আমাদের অবস্থাটা এখন ঠিক রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা গানের মতো। ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ নব্বই দশকের এই প্রেমের গানটি এখনকার বাস্তবতা। সবার জন্য। কাগজের চিঠি লেখার চল এমনিতেই উঠে গেছে। কিন্তু কাগজের চিঠির কথা ভাবতে ভালো লাগে। কারণ কাগজের চিঠিতে প্রিয়জনদের স্পর্শ লেগে থাকে। কিন্তু স্পর্শ এখন বুলেট। এখন এমন সময়, আমরা কেউই জানি না, কে কার জন্য মৃত্যুদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

তাই চিঠি এখন আমাদের আকাশেই লিখতে হবে। দেখা করতে গেলেও ঐ আকাশ দিয়েই। ইন্টারনেটে। ফোন তরঙ্গে। এখন আর দৈহিক বলে কিছু নেই! আমরা সবাই ভার্চুয়াল মানে মনোদৈহিক হয়ে গিয়েছি। ভিডিও গেমসের কল্পনার রাজ্য, সায়েন্স ফিকশন ছবির উদ্ভট দৃশ্যগুলো নিয়তির মতোন আমাদের মধ্যে নেমে এসেছে। এমনটা আগে হয়নি। এমন নয় যে মহামারী এর আগে পৃথিবীর মানুষ দেখেনি। মৃত্যু দেখেনি। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ভয়াবহ সব প্লেগ, কলেরা, গুটি বসন্ত, ভাইরাস বা অণুজীব মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর উজাড় হয়ে গেছে। সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে।

এইতো ঠিক একশ বছর আগেই স্প্যানিশ জ্বরে মারা গিয়েছিল ৫ কোটি মানুষেরও বেশি। বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই সাম্প্রতিক সময়েও আমরা অনেক মৃত্যু দেখেছি। গত দশ বছরে সিরিয়ার যুদ্ধে ৪ থেকে ৬ লাখ মানুষ মারা গেছে। আমাদের খাবার টেবিলে এই সংখ্যা কোনো আলোড়ন তোলেনি। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া কোথায় কতজন মারা গেল, আমরা মাথা ঘামানোর সময় পাইনি। খবরও রাখিনি, হুতু-তুতসিদের জাতিগত লড়াইয়ে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ৩০ লাখ শহীদ জীবন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনেছে। সংখ্যার বিশালত্ব আমরা পুরোটা বুঝতে পারি, এমনটা মনে হয় না। ইতিহাসে লিপিবদ্ধ এইসব মৃত্যুর তুলনায় করোনায় প্রাণহানির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো অনেক কমই হবে। এটা নিশ্চিত না হলেও এমনটাই অনুমান।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা যাই হোক, করোনাকালকে কেবল মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে ইতিহাস মনে রাখবে না। এই সময়কে আগামীর ইতিহাস মনে রাখবে, সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস হাজার বছর ধরে একটা ধারায় চলছিল। এই ধারাটা করোনাকালে এসে ঘুরে গিয়েছিল। ইতিহাস বলে, যুদ্ধ অথবা প্রাকৃতিক যে কোনো সংকট থেকেই মানুষ কিছু না কিছু অর্জন করেছে। শিখেছে। আবিষ্কার করেছে। যা তাকে আগামীর পথে নিয়ে গিয়েছে। এটিই সভ্যতার বিবর্তন। ইতিহাসের তরঙ্গ। এই ইতিহাসের তরঙ্গে ধরা থাকবে, করোনাই মানুষের ইতিহাসে প্রথম সংকট যেখানে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই সংকট বাড়বে কিংবা কমবে, তা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ওপর নির্ভর করছে। আমরা জানি, এই সংকট থেকে মানুষ ঠিকই বের হয়ে যাবে। কেননা মানুষই এটা পারে। কেন পারে?

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজেকেই প্রশ্ন করেছে। নিজে যা জানে, সেই জানাকে সন্দেহ করেছে। জানার মাঝে অজানাকে সন্ধান করেছে। মানুষের মধ্যে এই আবিষ্কার মানুষের ধর্মের কারণে, মানুষ পারে নিজেকে পাল্টে নতুন করে গড়তে। আর কেউ পারে না। আমরাও নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের সবকিছুকে নতুন করে গড়ছি। অভ্যাস। চিন্তার ধরন। দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সবার থেকে দূরে সরে এসে নিজেকে বাঁচানো, চিরকাল এটা আমরা স্বার্থপরতা হিসেবেই দেখেছি। এখন উল্টো। এখন- আমি নিজেকে বাঁচালাম মানে বিশ্বকে বাঁচালাম। তোমাকে ভালো রাখার জন্যই আমাকে ভালো থাকতে হবে। এমনভাবে মানুষকে এর আগে ভাবতে হয়নি। এটাই এখনকার মানুষের পাল্টে যাওয়া। নতুন পৃথিবীতে নিজেকে নতুন করে গড়া।

এই নতুন পৃথিবীতে প্রত্যেক ‘আমি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রত্যেকেই পৃথিবীর সব মানুষের ভালো থাকার কারণ। খারাপ থাকার হুমকি। এতদিন পৃথিবীর কোনায়, হতে পারেন তিনি মেঘনাপাড়ের আমিনা তার খোঁজ রাখার প্রয়োজন কেউ বোধ করেনি। অথবা রংপুর থেকে কাজের খোঁজে শহরে হারিয়ে গিয়েছেন যে সোলেমান মিয়া, কিংবা পাহাড়ের আদিবাসী হিম্মত স্নাল পৃথিবীর কোনো পরিসংখ্যান বা হিসাবের খাতায় তাদের খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন তারা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্জন দত্তের গানের হরিপদ দত্তের মতো ছোটখাটো সাদামাটা লোক যারা-  তাদের প্রত্যেকের ওপরেও সবাই চোখ রাখছে। পৃথিবীর সবাই মিলে কে কী করছে, তার হিসাব রাখছে। এভাবে আমরা পৃথিবীর সবাই মিলে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা অভিন্ন ব্যবস্থাপনা বা সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠছি। এই পাল্টে যাওয়াটাই করোনা সময়ের গল্প।

এদিক থেকে করোনা শুধু একটা রোগের কাহিনী নয়। এটা একটা পৃথিবী বদলে দেওয়ার গল্প। করোনায় মানুষের অর্জন এটাই। দেশ, ভাষা, জাতি, সম্প্রদায়ের সীমানা যদিও এখনো আছে। এখনো বিভেদ আছে। যুদ্ধ আছে। কিন্তু তারপরও, এইসব সীমানা অতিক্রম করে আমাদের একসঙ্গে হতে হবে, এই বাস্তবতাটা এখন আর স্বপ্ন নয়। এটি এখন বাস্তবতা। করোনা এই বাস্তবতাটা তৈরি করেছে। এইদিক থেকে, করোনার ভূমিকা বিপ্লবের মতো।

ইতিহাস বলে, বিপ্লবের পরে একটা কষ্টের সময় আসে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পাড়ি দিতে হয়। ফরাসি বিপ্লবের পরে আমরা দেখেছি- দীর্ঘ অরাজকতা। প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সোভিয়েত রাশিয়ায় এটা আমরা দেখেছি। বিপ্লব পরবর্তী সমাজ গঠন করতে গিয়ে কোটি কোটি মানুষকে সেখানে জীবন দিতে হয়েছে। মহাচীনে দেখেছি। দীর্ঘ দশক ধরে দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু। এসব, পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ভালোর জন্য কষ্ট। রোগ করোনা হয়তো শেষ হবে। কিন্তু করোনা যে পরিবর্তনটা আনছে, তার জন্য সামনের দিনগুলোতে একটা সংকট আসছে। ইতিহাস তাই বলে। সমাজ বিজ্ঞানীরাও সেরকম আভাস দিচ্ছেন। তবে আমরা যদি সংকটটা বুঝতে পারি, এই সংকট কাটিয়ে ওঠার পর যে নতুন পৃথিবী তৈরি হবে সেটাকে বুঝে কাজ করি, তবে এই সংকটকালের কষ্টটা কমবে। সময়ও কম লাগবে।

তাহলে আমরা এখন কী করব? কীভাবে প্রস্তুতি নেব আগামীর জন্য? তার আগে একটা ‘কিন্তু’ আছে। আফ্রিকার লোককবিতা থেকে প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় একটা গান বেঁধেছিলেন। হাড়ভাঙা খাটুনির পর ক্লান্ত শ্রমিক আকাশের চাঁদের কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর চেয়ে বেড়ায়। কী করে দুটো খেতে পাই? চাঁদ সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। সেই প্রশ্নের উত্তরটাই এখন আমাদের খুঁজতে হবে। আমরা যদি এখন টিকে থাকতে না পারি, ভবিষ্যৎ ভাবনা করে কী করব? এটাই জীবনের প্রশ্ন।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ওপর একটা গবেষণা করেছিলেন। গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, দেশে খাবারের অভাবের কারণে দুর্ভিক্ষটা হয়নি। দেশে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার ছিল। বাজার ভরা। কিন্তু বাজার থেকে খাবারটা কেনার জন্য মানুষের পকেটে টাকা ছিল না। কৃষি ছাড়া আমাদের সবকিছুই বিদেশনির্ভর। এখন কিছুদিন বিদেশের পথ বন্ধ। রপ্তানি কমবে। গার্মেন্টসের অর্ডার কমবে। প্রবাসী আয় কমবে। বৈদেশিক সাহায্য কমবে। কে দেবে এখন? যে দেবে তার নিজেরই এখন অর্থ দরকার। তাহলে টাকার যে প্রবাহ এতদিন চলছিল, তা এখন কমে যাবে। আমাদের পকেটে টাকা থাকবে না। কেনাকাটা কমে যাবে। বিক্রিবাট্টা কমে যাবে। উৎপাদন কমে যাবে। ব্যবসা চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে যাব। তখন বাসাভাড়া দেব কীভাবে? বাচ্চার পড়ার খরচ? প্রতিদিনের বাজার? গ্যাস বিল? বিদ্যুৎ বিল? যাতায়াত? আমরা এখন বাঁচব কী করে?

প্রকৃতিতে এর উত্তর আছে। বন্যার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তাদের অনেকেই দেখেছেনও এরকম। বন্যায় চারদিক ডুবে গেছে। কোথাও মাটি নেই। হয়তো একটা উঁচু জায়গা তখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। মানুষ, গরু, সাপ, ব্যাঙ, কুকুর সব গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। যারা কখনো একসঙ্গে থাকে না, তারাও বুঝে গিয়েছে সবার ওপর যখন বিপদ আসে, তখন এটা সবারই বিপদ। আলাদা হয়ে এসময় টিকে থাকা যায় না। আমাদেরও একসঙ্গে টিকে থাকতে হবে। করোনার শিক্ষাও কিন্তু আসলে এটাই। নিজেকে রক্ষা করা মানে অন্যকেও রক্ষা করা। এই কথাটার মানে শুধু এই কথাটা নয়। এর মধ্যে আরেকটা নির্দেশনা লুকিয়ে আছে। আরেকজন ভালো থাকলে তবেই আমি ভালো থাকব। একজনও যদি অরক্ষিত হয়ে পড়েন, তবে আমিও অরক্ষিত হয়ে পড়ব। এটাই নতুন যুগের বার্তা। একা আমি আসলে একলা আমি নই। এই পৃথিবীর সবাইকে নিয়েই আমি। সবাইকে নিয়ে সবাই। সবার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

অসংখ্য পেশাজীবী সামাজিক-সাংস্কৃতিক-সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, অ্যাসোসিয়েশন ও সমিতি আছে। সংগঠন কেন? যদি প্রয়োজনের সময় সে কাজই না করে? সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে। যেন কেউ নিজেকে এই লড়াইয়ে একলা না ভাবে। মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে তাদের অবকাঠামো নিয়ে মানুষের পাশে আসতে হবে। 

সরকারের কাজ কী? একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পরিচালনা। সবকিছু কেমনভাবে চলবে। এর জন্য সরকারকে প্রথম দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। .এখনই। যারা দুর্নীতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম হতে হবে। সরকারের যে শাখা-প্রশাখাগুলো আছে তাকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। নিরলস। যে সরকারের সমালোচনা করে, সেও আসলে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সরকারকে বুঝতে হবে, সবাইকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আসলে তারই। তাই সবাইকে নিয়েই তাকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে হবে। মানুষের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই সংকটকে নিয়ে তথাকথিত ‘রাজনীতি’ না করে সত্যিকারের অর্থে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। একসঙ্গে সবাই এটাই সংকটে টিকে থাকার ধর্ম। তাহলে দুধেভাতে না হোক আধপেটা খেয়ে হলেও এই সংকট পাড়ি দিতে পারব আমরা।

আর একটি কাজ আছে। সবার। নিজেরা নিরাপদ থাকা আর অন্যকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি নিজেকেও গড়ে তুলতে হবে। আগামী পৃথিবীর জন্য। সংকটে মানুষের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিগুলো জেগে ওঠে। ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখলে চলবে না। একটা পুরনো প্রবাদ আছে। যখন কোনো কাজ নেই, সে সময়ে যে কাজ দেখতে পায়, কাজ তৈরি করতে পারে আগামীটা তারই। করোনার পরের আগামী আমাদের সবার হোক। 

লেখক

কথাসাহিত্যিক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত