ইচ্ছে করলেই মোবাইল ফোন অপারেটরদের জন্য তরঙ্গ দাম কমানো যায় না। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে, এমনকি কখনো কখনো প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগে। দাম কমাতে হলে অপারেটররা সরকারের সঙ্গে কথা বলতে পারে। সম্পূর্ণ তরঙ্গ কিনলে দাম কমানো যেতে পারে। গতকাল বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ‘গ্রাহক স্বার্থরক্ষায় মানসম্মত টেলিকম সেবার জন্য পর্যাপ্ত তরঙ্গ বরাদ্দে প্রতিবন্ধকতা নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান জহুরুল হক এ কথা বলেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলেই মোবাইল ফোন অপারেটরদের জন্য তরঙ্গ মূল্য কমাতে পারে না বলে মন্তব্য করে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, অপারেটররা একসঙ্গে বেশি পরিমাণ তরঙ্গ কিনলে দাম কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আংশিক নিলে দাম কমানো সম্ভব হবে না। বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘রেগুলেটর রেগুলেট না করলে ১৬ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ ও ১০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হতো না। ভালো রেগুলেশনের জন্য সরকার ভালো রাজস্ব পাচ্ছে। বিটিআরসি অপারেটরদের স্বার্থ দেখে এবং সুবিধা দেখতে চায়। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে যে নিলাম হয়েছে সে দাম থেকে কম হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তবে আলোচনা করে সমাধানে আসা যাবে। বিটিআরসি সব সময় পজিটিভ। তরঙ্গ অব্যবহৃত হয়ে আছে এটা খারাপ দিক। একটি পলিসি থাকা উচিত যেন তরঙ্গ অব্যবহৃত না থাকে। টেলিকম সেবায় ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় কলড্রপ হচ্ছে, এখানে প্রযুক্তি কোনো ব্যক্তি চেনে না। তরঙ্গের দাম কমানো বাস্তবে অসম্ভব। নিলামে ১৫ বছরের জন্য তরঙ্গ দেওয়া হয়, ১৫ বছরের জন্য যা দেওয়া হয়েছে দাম কমালে সেই মূল্য বা টাকা কি তারা ফেরত চাইবে না। অপারেটররা যৌক্তিক প্রস্তাব দিলে মানা হবে।
২০১৮ সালের তরঙ্গ নিলামের কথা উল্লেখ করে জহুরুল হক বলেন, নিলামে দাম বেশি হলে আপনারা কেন নিলামে আসেন।
২০১৮ সালে দেশে ফোর-জি চালু করার জন্য তরঙ্গ নিলাম করে বিটিআরসি। নিলামে মোট ১১টি ব্লকে ৪৬ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামের জন্য ছিল। এর মধ্যে তিনটি ব্লকে ১৫ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ বিক্রি হয়। ৬৭ শতাংশ তরঙ্গ অবিক্রীত হওয়ার মূল কারণ উচ্চমূল্য বলে দাবি করে আসছে অপারেটররা।
বিটিআরসির হিসাবে, টু-জির ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ও ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং থ্রি-জির ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২০ মেগাহার্টজ ব্যবহারযোগ্য রয়েছে। এ তিন ব্যান্ডে মোট ৪০ দশমিক ৮ মেগাহার্টজ তরঙ্গ রয়েছে, যেখান থেকে অপারেটররা কিনতে পারে।
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, ‘ইচ্ছা করলেই তরঙ্গের দাম কমানো সম্ভব নয়। ১৫ বছরের জন্য তরঙ্গ নিলামে দেওয়া হয়েছে। এ সময় পার হলে বিবেচনা করা যেতে পারে। পরবর্তী নিলামের আগে দাম কমানো সম্ভব নয়। তবে তরঙ্গের দাম কমানো হলে সেবার মান বাড়বে নিশ্চয়তা দিয়ে অপারেটররা সরকারকে জানালে আমরা উদ্যোগ নেব।
রবির ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন সরকার, গ্রাহক ও অপারেটরদের মধ্যে একটা ব্যালেন্স আনতে হবে। বর্তমান রেগুলেটরি খুবই আন্তরিক তবে তাদেরও লিমিটেশন আছে, তারা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। বিটিআরসি তরঙ্গ দাম কমানোতে পজিটিভ, তবে তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। তাই নীতিনির্ধারকদের আগে থেকে যুক্ত করতে হবে, বিটিআরসি যা বুঝে হয়ত অর্থ মন্ত্রণালয় তা বুঝছে না। সবশেষে আমরা চাই গ্রাহকরা ভালো সেবা পাক, মিশনের সঙ্গে পলিসির একযোগে কাজ করতে হবে।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তৈমুর রহমান বলেন, ‘টিকে থাকার জন্যই ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় তরঙ্গ কেনা হয়েছিল, যার জন্য আমাদের সেবার মান এখন আরও ভালো হয়েছে। তরঙ্গ সরকারের সম্পদ এবং বিটিআরসি সরকারের পক্ষে নিলামে তুলছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিটিআরসি কাজ করছে, এটা আমরা বুঝতে পারছি। বিটিআরসি টেকনিক্যাল সংস্থা হিসেবে সরকারকে যদি বোঝাতে পারে যে, এই অব্যবহৃত তরঙ্গ রেখে লাভ নেই বরং যত ব্যবহার হবে রাজস্ব তত বাড়বে। মাত্র দুই বছর আগেই আমরা তরঙ্গ কিনলাম। এখন চাইলেই বিটিআরসি দাম কমাতে পারবে কি-না কারণ এটা তখনই একটা মূল্যে বিক্রি করা হয়েছিল। বিটিআরসি সরকারকে বুঝাতে পারে যত তরঙ্গ দেবে তত রাজস্ব বাড়বে।’
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিটিআরসি কমিশনার (এসএম) মো. আমিনুল হাসান, অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব নুরুল কবির, এরিকসনের কান্ট্রি ম্যানেজার আবদুস সালামসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
