করোনার মতি-গতি

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২০, ০৭:১৪ এএম

করোনা প্রকৃতিগত কারণে একটি অতি সংক্রামক ভাইরাস। এ মুহূর্তে বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশে ও অঞ্চলে করোনার উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এর গতি-প্রকৃতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তা মহাভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; বোঝা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে করোনা বারবার ভোল পাল্টাচ্ছে। তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগতিও মন্দ নয়। তবে সংক্রমণের আশঙ্কায় রোগীর সংস্পর্শে আসা তো দূরের কথা, তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান আবশ্যক হয়ে দাঁড়ানোয় রোগীকে আইসোলেশনে রাখতে হয়। যে কারণে রোগী সেবা-শুশ্রুষা ও সহানুভূতি পাওয়ার সর্বজনীন অধিকার বঞ্চিত হওয়ার ভয় থাকে। তাই আক্রান্ত হওয়ার পরীক্ষা করার অনীহা তথা লুকিয়ে থাকা বা পালিয়ে বেড়ানো কিংবা রোগ প্রকাশ না করার প্রবণতা বাড়ছে, এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকে আপনজনের মৃত্যুর তথ্যটি পর্যন্ত সংগোপন রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে অত্যন্ত ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস সংক্রমণেরই বিস্তার ঘটায় এবং তার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। করোনার বিস্তারে পণ্য ও সেবা খাতে উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে সৃষ্ট অচলায়তনে অস্থিরতা তৈরি হয়ে সব পর্যায়ে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষদের জীবনযাত্রা এবং ব্যয়নির্বাহসমূহ সমস্যায় আপতিত হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি, দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক ব্যত্যয় ও বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। উন্নত ও অনুন্নত নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রায় সব অর্থনীতিতে মহামারী আকারে করোনার বিস্তার প্রায়ই একযোগে এবং অর্থ-বিত্ত, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে বাঘা বাঘা দেশ ও সমাজ কুপোকাত হওয়ায় বিপদে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে এবং আশা-ভরসা হারিয়ে যাচ্ছে।

এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, কোনো কোনো দেশে এসব নিয়ে দুর্দান্ত আন্দোলন আর কৌশলগত আক্রমণ মাঠেই মারা যেতে চলেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশ রাষ্ট্র ও সমাজে অব্যাহত অদক্ষতা, অপারগতা, অযোগ্যতা ও ছোট-বড় দুর্নীতি এমনকি আর্থিক খাত ধ্বংসকারী লুটপাট ও ঋণখেলাপের দায়ভার অজুহাত-উপলক্ষ হিসেবে করোনার ওপর চাপিয়ে পার পাওয়ার প্রয়াস চলছে। করোনা এখন এমন একটা ইস্যু, যা যাবতীয় মাথাব্যথার অনেক ব্যাপার-স্যাপার থেকে অনেকের দৃষ্টি সরানোর সমূহ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। করোনা মোকাবিলার নামে, দেশে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, লকডাউন চলছে চলবে এবং এতদুপলক্ষে প্রচুর প্রণোদনা ও আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থারা মোটা অঙ্কের অনুদান ও ঋণ তহবিল গড়ছেন, দেশি-বিদেশি চিন্তা চৌবাচ্চারা ব্রেইন স্টর্মিংয়ের কাজ পেতে যাচ্ছেন। স্বল্প মেয়াদে যেমন মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে করোনা অধিকাংশ অর্থনীতির জন্য সংকট-সর্বনাশ হলেও স্বার্থান্ধ ও ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন কতিপয়ের পৌষ মাস প্রতীয়মান হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বড় বড় প্রতারণা, গাফিলতি ও দুর্নীতির থলের বিড়াল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। করোনার কারণে স্বাস্থ্য খাতে যতটা না ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি খাতের আয়-ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ উৎপাদন, পর্যটন, পরিসম্পদ অবকাঠামো নির্মাণ তথা সামষ্টিক আর্থিক খাতে। দীর্ঘমেয়াদি মন্দার দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব অর্থনীতি।

ডিজিটাল ও ইনফরমেশন টেকনোলজি এবং মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের অগ্রগামী ভূমিকা ও অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী সবকিছুর মধ্যে ‘পলিটিকস’ ঢুকিয়ে ভেদ-বুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির ও সেবা-সরবরাহে ধোঁয়াশা তথ্য পরিসংখ্যান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পারঙ্গগমতা প্রসারিত হচ্ছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য ও হিসাব মিলছে না। করোনার উদ্ভব উৎপত্তি ও এর দ্বারা সৃষ্ট আর্থসামাজিক বিপর্যয় এবং এর রাজনৈতিক অর্থনীতির মারপ্যাঁচ আড়ালে-আবডালে থেকে যাচ্ছে। আর মানবভাগ্যে বরাবরের মতো নেমে আসছে দারুণ ট্র্যাজেডি।

মহামারী আসলে বরাবরই বিবিধ বাড়াবাড়ির প্রতিফল। প্রকৃতির প্রতিশোধ। এটা অনস্বীকার্য যে, যেকোনো ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি ভিন্নতর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। যেমন মাত্রা অতিক্রম করলেই সাহস হঠকারিতায়, আত্মোৎসর্গ আত্মহত্যায়, প্রতিযোগিতা হিংসায় এবং স্বৈরাচার ও অতিক্ষমতাবানে পরিণত হতে পারে। অবস্থাবিশেষে সমালোচনা পরচর্চায়, প্রশংসা চাটুবাদে, তেজ ক্রোধে, দেশপ্রেম দেশদ্রোহিতায় এবং অতি ধর্মপ্রীতি ধর্মান্ধতার স্তরে নেমে আসতে পারে। খাদ্য স্বভাব ও উপায় উপকরণ, চাল-চলন থেকে শুরু করে মৌলিক অধিকার অস্বীকৃতি, সুশাসন নির্বাসন, পারস্পরিক দোষারোপে জবাবদিহিহীনতায়, পরিবেশ দূষণ-দুষকর্মে সদাচার, সহমর্মিতা ও সত্যম শিবম সুন্দরের সহ-অবস্থানের সুযোগ যখন তিরোহিত হয়, তখন প্রতিবিধানে জাগতিক বা বাহ্যিক বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতিত্বের কারণে অপারগ, তখন তার মতো প্রতিশোধ প্রতিবিধানের একটা পথ বেছে নেয় প্রকৃতি। করোনা প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং প্রতিকার প্রতিফলের তেমন এক প্রকার উপায় বা উপলক্ষ। তাবৎ ঐশী গ্রন্থে সৃষ্টিকর্তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যখন যে জনপদ, সম্প্রদায় নানাভাবে বাড়াবাড়ি করেছে, স্বভাবে সজ্ঞানে বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনায় সীমালঙ্ঘন করেছে, তখন তাদের ওপর নিপতিত হয়েছে অশেষ দুর্ভোগ। উদ্ধত উদভ্রান্ত অনেক জনপদকে উল্টিয়ে দেওয়ার উপমা টেনে, ফল, ফসল ও জীবনের অশেষ ক্ষয়ক্ষতির উদাহরণ টেনে অনুশোচনার উপলব্ধিকে করা হয়েছে জাগ্রত। সুতরাং করোনাকে নয়, সবার উচিত সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করা এবং অনুশোচনা, অনুতাপের মাধ্যমে মার্জনা প্রার্থনা করা। প্রকৃতির নেয়ামত বা সম্পদ অস্বীকার-অপব্যবহার, সুযোগের অপপ্রয়োগ, অন্যের অধিকার হরণের মতো প্রবঞ্চনার প্রবণতা থেকে ফিরে আসার অয়োময় প্রতিজ্ঞাই আজকের করণীয়।

প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। আজ এটা স্পষ্ট যে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার প্রান্তিকপর্যায়ে পৌঁছানো প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হলো সংক্রমিত হওয়া থেকে নিজেকে সুরক্ষা। সুতরাং আতঙ্কিত না হয়ে করোনা মোকাবিলায় নিজের দায়িত্ব হিসেবে পরামর্শমতো নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলে পরিপালনে নিজের যেমন সুরক্ষা মিলবে, অন্যকেও তেমন সংক্রমিত হওয়া থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব পালিত হবে। আসন্ন ঈদুল আজহায় অধিক সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যেন আরও না বাড়ে, সে ব্যাপারে সতর্কতা সচেতনতা এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দাবি।

মনে রাখা দরকার, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ : জ্বর, অবসাদ, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলাব্যথা, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপরোক্ত সব উপসর্গ দেখা গেলেও জ্বর থাকে না। তবে ইদানীং করোনার ছদ্মবেশী রূপ নিচ্ছে এবং বাতাসের মাধ্যমেও এর সংক্রমণ সম্ভব, এ ধরনের তথ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে বৈকি। তবে আক্রান্ত হলেও সেরে ওঠা সম্ভব এটা স্পষ্ট হচ্ছে। শুধু শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে বাহিত হয়ে ফুসফুসে ভাইরাস মারাত্মক সংক্রমণে নিউমোনিয়া প্রবল হলে, অন্যান্য জটিল রোগ থাকলে, বয়স্ক রোগীর চিকিৎসা বা নিরাময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেউ করোনায় আক্রান্ত কি না নিজেই নিজের পরীক্ষা করতে পারেন লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে তা ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। যদি এ সময়ের মধ্যে আপনার কাশি এবং বুকে ব্যথা অনুভব না হয়, তাহলে আপনি করোনামুক্ত ও সুস্থ আছেন। কোনো ধাতব তলে বা বস্তুতে করোনা পড়লে প্রায় ১২ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই সাবান দিয়ে হাত ধুলেই যথেষ্ট হবে। কাপড়ে করোনা প্রায় নয় ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই, কাপড় ধুয়ে নিলে বা রোদে দুই ঘণ্টা থাকলে এটি মারা যাবে। হাতে বা ত্বকে করোনা ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে। তাই, অ্যালকোহলমিশ্রিত জীবাণুনাশক, সাবান হাতে মেখে নিলেই জীবাণুটি মারা যাবে। করোনা গরম আবহাওয়ায় বাঁচে না। ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এটিকে মারতে পারে। কাজেই, ভালো না লাগলেও এখন বেশি বেশি গরম পানি পান এবং আইসক্রিম থেকে দূরত্ব বজায় রাখাও জরুরি। লবণমিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগল করলে গলার মিউকাস পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টনসিলের জীবাণুসহ করোনাও দূর হবে, ফুসফুসে সংক্রমিত হবে না। আক্রান্ত হয়েছেন জানলে অন্তত ১৫ মিনিট পরপর পানি পান করুন। মানে খাদ্যনালি ভেজা রাখুন। নিয়মিত চা পানেও বিশেষ উপকার পাওয়া সম্ভব। ভাইরাসটি কোনোভাবে মুখের ভেতর এলে তা চা বা পানির সঙ্গে পাকস্থলীতে চলে যাবে, যা পাকস্থলীর অ্যাসিডে সহজেই মরে যাবে। আর নাকে-মুখে আঙুল বা হাত না দেওয়ার অভ্যাস অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ, মানব শরীরে জীবাণু প্রবেশের সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ!

সম্ভাব্য সবাইকে শনাক্তকরণের পরীক্ষাপদ্ধতি প্রক্রিয়া সহজসাধ্য বা নাগালের মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করাসহ, সরকারি ও ব্যক্তি খাত মিলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সমন্বয়ে সামাজিক সেবাশক্তির আত্মপ্রকাশ ও বিকাশের ক্ষেত্রে অপারগতা ও বিলম্ব বাঞ্ছনীয় নয়।

লেখক

সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত