গার্মেন্টসহ বোনাস বকেয়া ৬ হাজার কারখানায়

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২০, ০৫:৪৯ এএম

করোনা মহামারীর মধ্যে আগামী ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। অন্যান্য সময়ে এই ঈদে নাগরিকদের একটি অংশ গ্রামে যায়, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ শ্রমিক। গত ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। ঈদে বাড়ি ফেরার বিষয়েও ছিল কঠোরতা। কিন্তু এবার যখন করোনা পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক তখন গণপরিবহন চালু থাকছে। ফলে ঈদে বাড়ি যাওয়ার বাধা অনেকটা নেই বললেই চলে। তাই কারখানামালিকরা বলছেন, গণপরিবহন চালু রেখে কেবল ছুটি কমিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে আটকে রাখা যাবে না।

যদিও গণপরিবহন খোলা রাখার সিদ্ধান্তে অটল থেকে ঈদে শ্রমিকদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এজন্য ঈদের ছুটি তিন দিন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ জুলাই সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে তৈরি পোশাক কারখানায় ঈদের ছুটি তিন দিন থাকার ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ২২ জুলাই শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে এ ব্যাপারে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার সময় শিল্পকারখানাগুলোর কার্যক্রম সরকার ঘোষিত ঈদের সাধারণ ছুটির দিন ছাড়া চলমান রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের আবশ্যিকভাবে কর্মরত এলাকায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিষয়টি আমলে নিয়ে পোশাক মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ স্ব স্ব সদস্যদের নির্দেশনাও দিয়েছে।

বেশিরভাগ কারখানাই ঈদের ছুটি তিন দিন রেখেছে। তবে কোনো কোনো কারখানা শ্রমিকদের অনুরোধে দু-একদিন বাড়িয়েছে। এ ছাড়া গতকাল  সোমবার ছিল বোনাস প্রদানের শেষ দিন। আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে অর্ধেক আগাম বেতন দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি এম এ রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা না হয় তিন দিন ছুটি দিলাম। কিন্তু পরিবহন বন্ধ না করলে কীভাবে শ্রমিকদের আটকাব। তারা তো এই তিন দিনের ছুটিতেই গ্রামে চলে যাবে। যাদের বাড়ি কাছাকাছি তারা হয়তো সময়মতো এসে কাজে যোগ দেবে। আবার কেউ অফিস কামাই দিয়ে অজুহাত দেখাবে। কেবল পরিবহন বন্ধ রাখলেই শ্রমিকের বাড়ি যাওয়া আটকানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশকেও তৎপর হতে হবে।’

বাংলাদেশ শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদনে থাকা ৭ হাজার ৬০২টি কারখানার মধ্যে গতকাল সোমবার পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৫৮৮টি কারখানা শ্রমিকের ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ২ হাজার ৪০৬টি কারখানার বোনাস এখনো বকেয়া। এ ছাড়া ৮১৮টি কারখানা এখনো জুনের বেতন পরিশোধ করেনি।

পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা বলছেন, তাদের সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৮৭৪টি চালু কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৩৭৮টি কারখানার বোনাস পরিশোধ হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। ইতিমধ্যে জুলাইয়ের আগাম বেতনের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। আর সব কারখানা জুনের বেতন পরিশোধ করেছে। গণপরিবহন চালু রেখে কেবল ঈদ ছুটি কমিয়ে শ্রমিকের বাড়ি ফেরা আটকানো যাবে না বলেও মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানী বাদে আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহÑ এই ৬ অঞ্চলে ৭ হাজার ৬০২টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে আরও প্রায় ৫০০ কারখানা আছে। সব মিলে দেশে এই মুহূর্তে প্রায় ৮ হাজার কারখানা উৎপাদনে। এসবের মধ্যে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৮৮২টি কারখানার মধ্যে বোনাস বকেয়া ১ হাজার ৪৩৯টির, বিকেএমইএর ১ হাজার ১০১টি কারখানার মধ্যে বোনাস বকেয়া ৯৬৭টির, বিটিএমএর ৩৮৯টির মধ্যে বকেয়া ৩০৫টির, বেপজার ৩৬৪টির মধ্যে বকেয়া ১৬৫টির ও অন্যান্য খাতের ৩ হাজার ৮৬৬টির মধ্যে বকেয়া ৩ হাজার ১৩৮টির।

জুনের বেতনের বিষয়ে শিল্প পুলিশ বলছে, জুনে রাজধানীর বাইরে ৬টি শিল্প জোনে ৭ হাজার ৬০২টি কারখানা চালু ছিল। এর মধ্যে বিজিএমইএর ১৭৬টির, বিকেএমইএর ৬৩টি, বিটিএমএর ৫২টি, বেপজার ৭টি ও অন্যান্য খাতের ৫৩৬টি কারখানার বেতন এখনো বকেয়া। ইতিমধ্যে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে।

অন্যদিকে বিজিএমইএ দাবি করছে, এই মুহূর্তে চালু কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৮৭৪টি। এর মধ্যে ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে ১ হাজার ৩৭৮টি। বাকি ৪৯৬টির ঈদ বোনাস প্রক্রিয়াধীন আছে। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে অধিকাংশ কারখানার বোনাস পরিশোধ করা সম্ভব হবে। ঈদের আগাম বেতন পরিশোধের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে দাবি তাদের। এ ছাড়া বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর কতটি কারখানার বোনাস এই মুহূর্তে পরিশোধ হয়েছে তার সঠিক তথ্য সংগঠনগুলোর কাছে নেই। তবে অধিকাংশ কারখানার বোনাস পরিশোধ হয়েছে বলে দাবি তাদের।

শিল্প পুলিশ ও বিজিএমইএর তথ্যে এত ব্যবধান কেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যে তথ্য পেয়েছি তার আলোকে প্রতিবেদন করা হয়েছে। এখন বিজিএমইএ ঠিক কিসের ভিত্তিতে এতগুলো কারখানার বোনাস পরিশোধের কথা বলছে তা তারাই ভালো বলতে পারবে।

অন্যদিকে বিজিএমইএর মুখপাত্র খান মনিরুল আলম শুভর কাছে তথ্যের পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তথ্যে কোনো ঘাটতি নেই। আমরা প্রত্যেকটি কারখানার সাথে আলাদাভাবে কথা বলে প্রতিবেদন করেছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদ উপলক্ষে জুলাইয়ের আগাম বেতন পরিশোধ নিয়ে ৯০০ কারখানা ঝুঁকিতে ছিল। তবে সরকার জুলাইয়ের বেতন পরিশোধের জন্য সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার ঘোষণার পর ঝুঁকি অনেকটাই কেটে গেছে। ইতিমধ্যে কারখানাগুলো ১৫ দিনের বেতনের নথি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে জমা দিয়েছে। এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এসব নথি যাচাই-বাছাই করছে।

আজ মঙ্গলবার থেকে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব টাকা শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। তবে রপ্তানির বাইরে থাকা প্রায় ২০০ কারখানা এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতেরও বেশ কয়েকটি কারখানার আগাম বেতন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। মূলত এসব কারখানা প্রণোদনার অর্থে বেতন দিতে পারছে না। তাই কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত