ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির অভিযোগে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক তার পুনর্নিয়োগের বিষয়টিও নাকচ করে দিয়েছে। তবে নিজ ব্যাংকের পর্ষদকে ম্যানেজ করার পাশাপাশি সরকারি দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার তদবিরে এমডি হিসেবে মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের পুনর্নিয়োগের আবেদন পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত বছরের এপ্রিলে মোসলেহ উদ্দিন ও তার স্ত্রীর নামে পাঁচটি ব্যাংক, দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠন ও চারটি ব্রোকারেজ হাউজে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য এসেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশেষ অনুসন্ধানে। ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা ছাড়াও পরামর্শক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাজার থেকে টাকা জমা হয়েছে এনসিসি ব্যাংকের এমডির ব্যক্তিগত হিসাবে। একটি ব্যাংকের এমডি পদে থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে মোসলেহ উদ্দিন ওই ‘অবৈধ’ অর্থের মালিক হয়েছেন বলে বিএফআইইউর তদন্তকারীরা মনে করছেন।
পরবর্তীতে বিএফআইইউর অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের আয়ের উৎস ও সম্পদের বিষয়ে খতিয়ে দেখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দেওয়া হয়। দুদক তদন্তের অংশ হিসাবে গত বছরের আগস্টে আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা মোসলেহ উদ্দিনের ৮ কোটি টাকা জব্দ করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রক্রিয়া শুরু করলেও এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি তদন্ত চলাকালে সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়নি তাকে। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও গত ১৫ মাসের বেশি সময় নিজ পদে বহাল রয়েছেন। এখন তার পুনর্নিয়োগ পুনর্বিবেচনার আবেদন পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর এনসিসি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) পদে যোগ দেন মোসলেহ উদ্দিন। ২০১৭ সালের আগস্টের শুরুতে তিনি এমডির দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি যমুনা ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চলতি মাসে এনসিসি ব্যাংকের এমডির পুনর্নিয়োগের বিষয়ে আবেদন আসে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা তা নাকচ করে দিয়েছি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এনসিসি ব্যাংক এমডির পুনর্নিয়োগের আবেদন নাকচ করার পর সম্প্রতি তা পুনর্বিবেচনার জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে আবারও আবেদন করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এমডি হিসেবে পুনর্নিয়োগে সরকারি দলের কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলাদেশ ব্যাংকে মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের পক্ষে সুপারিশ করেছেন। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে তার। ফলে দুদকের তদন্তকাজে কালক্ষেপণ এবং ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৫ (৪) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে ব্যাংকের এমডি নিযুক্ত করা হয়। কোনো এমডির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেলে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় বা জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
জানা যায়, বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মোসলেহ উদ্দিনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তার কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। তিনি যে ব্যাখ্যা দেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অপসারণ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি করা হয়। এরপর কয়েক দফা ব্যাখ্যা তলবের পাশাপাশি মোসলেহ উদ্দিনকে শুনানির জন্য ডাকা হয়। কয়েক মাস আগে কমিটি তাদের সুপারিশ গভর্নরের কাছে দাখিল করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে শুনানি চলাকালে মোসলেহ উদ্দিন আদালতে রিট করে অপসারণ প্রক্রিয়া আটকে দেন। রিট আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু তিনি বিএফআইইউর প্রতিবেদন পাননি, সে জন্য স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে চাহিদামতো জবাব দিতে পারছেন না। অবশ্য আদালত বিএফআইইউকে কোনো প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেনি। এতে রিট নিষ্পত্তিতে কালক্ষেপণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
