আদিবাসীদের দেখার বাঙালি চোখ

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২০, ০৭:১৯ এএম

সিনেমা পরিচালক তরুণ মজুমদার বেশ কয়েক বছর আগে একটা গল্প বলেছিলেন। গল্প বললাম বটে কিন্তু ঘটনাটা সত্যি। তরুণ মজুমদারের ভাষায় পুরুলিয়া বা বাঁকুড়ার কোনো এক গ্রামে নতুন ছবির লোকেশন দেখতে গেছি। সঙ্গে দু-চারজন লোক। তখন গরম কাল। সকাল থেকে টো টো করে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে কখন যে দুপুর হয়ে গেছে টেরও পাইনি। ক্ষিদে-তেষ্টায় অস্থির হয়ে তাড়াতাড়ি হোটেলে যাব এমন সময়ে প্রোডাকশন ম্যানেজার একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, কাছেই একটা চমৎকার আদিবাসী গ্রাম আছে, ওটা চলুন একবার দেখে যাই। দেখবেন ওখানে আপনি যা চাইছেন সব পেয়ে যাবেন। কী আর করি! ভাবলাম বলছে যখন ঘুরেই যাই। কিন্তু এমন জল তেষ্টা পেয়েছে একটু জল না খেলে এক পাও চলতে পারব না। দূরের পথে চেয়ে দেখি দু-চারজন আদিবাসী মেয়ে যাচ্ছে। প্রায় ছুট্টে দলের এক ছেলে ওদের কাছে গিয়ে জল চাইলে ওরা বলে দিল জল তো নেই। দাঁড়িয়ে থাকো। জল এনে দিচ্ছি। চলে গেল ওরা। আমরাও আর অপেক্ষা না করে লোকেশনের খোঁজে পাশের গ্রামে রওনা দিলাম।

সেখানে গিয়ে সত্যি যা যা চাইছিলাম তাই একদম সাজানো গোছানো। প্রকৃতি নিজেই যেন চিত্রনাট্য পড়ে সেট বানিয়ে রেখেছে। সেখানে গিয়ে আগে মনের সুখে ঢকঢক করে জল খেলাম। পরে একধামা মুড়ি খেয়ে সব পছন্দ করে মনের আনন্দে হোটেলে ফিরতে লাগলাম। বেশ কিছুটা এগোতেই কানে এলো কারা যেন ছুটতে ছুটতে বলছে ‘আমরা যে জল নিয়ে খাড়াইয়ে আছি সেই তখন থেকে। নে পান কর।’ ভাবুন অবস্থা, বাবুরা গরমে জলটুকু চাইল বলে ওরা গ্রামে গিয়ে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফিরলে জল খাওয়াবে বলে। তরুণ মজুমদার কাহিনী শেষ করেছিলেন এই বলে যে, এটাই ভারতবর্ষ। এই হচ্ছে আমার আদিবাসী মানুষজন। শহরের চোখ দিয়ে তাদের আপনারা চিনতে পারবেন না।

আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা না হয় চিনতে পারলাম না। কিন্তু স্বয়ং সত্যজিৎ রায় কি চিনতে পেরেছিলেন ভারতের ভূমিসন্তান আদিবাসী জনজাতিদের! চিনলে অরণ্যের দিনরাত্রির মতো সিনেমা করতেন না। অবশ্য শুধু সত্যজিৎ রায়কে একা কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক না। ষাট-সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ খ্যাতিমান লেখকদের আদিবাসী নারী-পুরুষ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একান্তই সামন্ততান্ত্রিক। মেয়েদের বেলায় চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিক। গ্রামে জঙ্গলে উইকএন্ডে যাও। চুটিয়ে মদ খাও। আর সস্তা আদিবাসী নারী ভোগ করো। অনেক পরে চাইবাসায় প্রথম আলাপে লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী আক্ষেপ করেছিলেন অনেকদিন এই আদিবাসী অধ্যুষিত চাইবাসা, চক্রধরপুর, কিরিবুড়ো, মেঘাতুবুড়– ঘুরতে ঘুরতে মনে হয় ষাট-সত্তর দশকের সাহিত্যিকদের অতিকথন আমাদের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত মনে আদিবাসী জীবন সম্পর্কে এক ইউটোপীয় বা কল্পকাহিনীর জন্ম দিয়েছে। সত্যজিৎ রায় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছিলেন তা বোঝা যায় তার শেষের দিককার ছবি আগন্তুক দেখলে। কিন্তু এতবড় যে কলকাতা শহর আর বিশাল এই প্রগতিশীল পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমনে আদিবাসী জনজাতির জীবন বলতে সেই জঙ্গল, মাদলের বোল আর মাথায় ফুল দিয়ে দলবেঁধে নাচ-ই থেকে গেছে।

এ এক অদ্ভুত চিত্রকল্প। বছরের পর বছর ধরে তা সযতেœ চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনমনে। এখন নতুন এক খেলা শুরু হয়েছে গোটা রাজ্যে। তা হচ্ছে বিনোদন ট্যুরিজম। দক্ষিণ, উত্তর যে বঙ্গেই যান হোটেল রিসোর্টে সন্ধ্যে নামতেই নিভু নিভু আলোয় শহরের বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য এক দল আদিবাসী সেজেগুজে নাচ দেখায়। আমরা বাবু ভদ্দরলোকেরা অধিকাংশ হাতে মদের গ্লাস নিয়ে তারিফ করি। রাত বাড়ে। নেশার মাত্রাও। তারিফ ক্রমেই মাত্রাছাড়া হতে থাকে। আদিবাসী সমাজ আমাদের কাছে যেন একধরনের অ্যান্টিক বা পুরাতাত্ত্বিক বিষয় মাত্র। তাদের দেখিয়ে পয়সা রোজগার করা যায়। কিন্তু ভালোবেসে আপন করা যায় না।

বান্দোয়ান সিমলিপাল বেলপাহাড়ি, এগারো মাইল, ঝাড়গ্রাম, অযোধ্যাপাহাড়, সিরকাবাদ কত কত জানা-অজানা অসম্ভব সুন্দর গ্রাম। ওরগোদায় সারা রাত মেলা বসে। বাদনা পরবে গ্রামে গ্রামে দেখা যায় গরু বা মহিষখুটান। শোনা যায় গরু তখন কথা বলতে পারত। মানুষের অনেক উপকার করেও সে মন পেত না। অবহেলায় অযত্নে কোনোরকমে দিন কাটত। বাধ্য হয়ে সে নালিশ করল ওপরওয়ালাকে। তিনি একজন দূত পাঠালেন তদন্ত করতে। কিন্তু মানুষ তো চিরকাল অত্যন্ত বুদ্ধিমান। দূতকে হাত করে বিষয়টা জেনে নিয়ে ওপরওয়ালা যেদিন আসবে সেদিন গোয়াল খাটাল একবারে ঝকঝকে করে তুলল। ভালো খাবার। জল। গরুর প্রতি যত্নের শেষ নেই। ঈশ্বর সব দেখে গরুকে শাপ দিলেন মিথ্যে কথা বলার অপরাধে সারা জীবন বোবা হয়ে থাকার। বেচারা অবোধ প্রাণী ধূর্ত মানুষের কূটবুদ্ধির কাছে হেরে গেল। চতুর মানুষ সেই একটা দিন যদি ফের ওপরওয়ালা আসেন সেই ভয়ে আজও গরুকে যত্ন করে। গোয়াল সাজায়। আর বিকেল হলেই খেলে। আর ঘর দরজা সাজায়। আলপনা দেয়। মেতে ওঠে সোহরাই ও বাদনা পরবে।

চড়িদায় গ্রামে গ্রামে দেখা যায় ঝুমুর শিল্পীদের। এইতো কয়েকদিন আগেও বেঁচে ছিলেন কিংবদন্তি লোকশিল্পী গম্ভীর সিং মুড়া। নেপাল মাহাতো, কঁকা মাহাতো অসাধারণ সব ঝুমুর গানের শিল্পীরা অনেকেই চলে গেছেন। জঙ্গল মহলের প্রথম ডিলিট বিশিষ্ট নৃতাত্ত্বিক পশুপতি প্রসাদ মাহাতোও আর নেই। পশুপতি দা ছিলেন বর্ণময় চমৎকার এক মানুষ। ক্ষেপে যেতেন আমাদের ওপর। বলতেন এই সুবিশাল হড়’মিতান সাম্রাজ্য তোরা দিকুরা নষ্ট করেছিস। ব্রাহ্মণ্যবাদী সভ্যতার হম্বিতম্বিতে ঢাকা পড়ে গেছে ভারত উপমহাদেশের আদিবাসী সন্তানদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। এ এক কালচারাল সায়লেন্স অথবা বলা যায় সংস্কৃতিকে নীরব করে দেওয়া। আধিপত্যবাদী

সংস্কৃতি জোর করে পুরনো সম্পূর্ণ স্বাধীন এক জীবনধারা পাল্টে দিতে সক্রিয়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদী অপচেষ্টায় জেনে অথবা না জেনে শামিল হয়েছেন সত্যজিৎ রায় থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কে নয়! আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট লোকগবেষক ছো নাচের মুখোশ পরার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, আদিবাসীরা কুৎসিত বলে তাদের এই মুখোশ-প্রেম! আমেরিকার কালো মানুষদের জন্য আমরা কথা বলি। ফেইসবুকে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ পোস্ট দিই। অথচ স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে একজনও আদিবাসী নেই কেন তা নিয়ে সামান্য প্রশ্নও মনে আসে না। বরং কোনো মুর্মু, বাস্কে, মান্ডি, সোরেন, হাঁসদা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক দেখলে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। ওসব কোটায় পেয়েছে বলে আড়ালে বিষ উগরে দিই।

২৫ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে ভারতের সংবিধানের খসড়া করতে গিয়েই এদেশের সংবিধানের মূল রচনার কারিগর, দলিত নেতা বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকর আশঙ্কা করেছিলেন, সংবিধানে যা লেখা হবে তাতে ভারতে রাজনৈতিক সাম্য এলেও আর্থ-সামাজিক সমতা আসবে না। ১৯৫০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান আমরা পেলাম। তাও দেখতে দেখতে ৭০ বছর হয়ে গেল। আম্বেদকর যে আশঙ্কা করেছিলেন তাই অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। বাবাসাহেব বলেছিলেন যে দেশে সামাজিক ন্যায়, স্বাধীনতা ও ভাতৃত্ববোধ না থাকলে গণতন্ত্র কথার কথা হয়েই রয়ে যাবে। সে গণতন্ত্রের মৃত্যু অনিবার্য। এখন এদেশে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত দেখে বাবাসাহেবের সতর্কবাণীর কথা খুব মনে পড়ছে। আম্বেদকর জানতেন ব্রাহ্মণ্যবাদী, মনুবাদী বর্ণব্যবস্থায় আদিবাসী দলিতদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ না থাকলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে।

অন্যান্য রাজ্যের কথা আপাতত বাদই দিলাম। পশ্চিমবঙ্গে দলিত মোটামুটি দশ শতাংশ। আর আদিবাসী পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি। যে কোনো জেলায় গেলে সাইকেল চালিয়ে আদিবাসী তরুণ-তরুণীকে দেখতে পাবেন স্কুলে যাচ্ছে। পাশাপাশি আর একটা সংখ্যা দেখুন কয়েক বছর আগে এ রাজ্যে কলেজ ইউনিভার্সিটি মিলিয়ে অধ্যাপক মোটের ওপর ৫০ হাজার প্রায়। তার মধ্যে আদিবাসী জনজাতির সংখ্যা মোটে ৪৫১ জন। এটা ছয়-সাত বছর পুরনো হিসাব। নিশ্চিন্ত থাকুন ছবিটা খুব একটা পাল্টায়নি।

করপোরেট পুঁজির আক্রমণ যত তীব্র হচ্ছে, জল জঙ্গল জমি থেকে জোর করে যত আদিবাসী উচ্ছেদ হচ্ছে ততই নতুন করে আদিবাসী ক্রোধ সংহত হচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গও তার থেকে আলাদা নয়।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত