হ্যামিলটন মাসাকাদজা : অম্ল মধুর ক্যারিয়ার

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২০, ০৮:১০ এএম

হ্যামিলটন মাসাকাদজার কথা উঠলেই মোহাম্মদ আশরাফুলের অভিষেক মনে পড়ে। দুজনেই টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি করেছিলেন। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে কলম্বোতে ১১৪ রানের ইনিংস খেলার সময় আশরাফুলের বয়স ছিল ১৭ বছর ৬১ দিন। উইন্ডিজের বিরুদ্ধে হারারে টেস্টে অভিষেক সেঞ্চুরির সময় মাসাকাদজার বয়স ছিল ১৭ বছর ৩৫২ দিন। আশরাফুল এখনো কম বয়সী টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান। মাসাকাদজার রেকর্ডও কেউ ভাঙতে পারেনি। পারবেও না। তিনিই প্রথম ব্ল্যাক আফ্রিকান ব্যাটসম্যান যিনি কম বয়সে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন। আর ২০০১ সালে সেই সেঞ্চুরিটা এসেছিল ২৯ জুলাই আজকের এই দিনে।

এই শতাব্দী শুরুর আগে থেকেই জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে সোনালি সময় চলছিল। দলে তখন খেলছেন ফ্লাওয়ার ভাইয়েরা। আছেন হিথ স্ট্রিক। সম্ভাবনা জাগিয়ে হেনরি ওলোঙ্গা উঠে এসেছেন। জিম্বাবুয়ে তখন খুব প্রবল না হলেও ফেলনা প্রতিপক্ষ নয়। ভারত-উইন্ডিজের মতো দলের সঙ্গে ভালো লড়াই দিত। সেই সময় টেস্ট দলে ডাক পেলেন হ্যামিলটন মাসাকাদজা নামে এক তরুণ। যিনি তখনো হারারের চার্চিল হাই স্কুলের ছাত্র।

উইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে তার অভিষেক। প্রথম দুই টেস্টে পাত্তা পায়নি জিম্বাবুয়ে।

তৃতীয় টেস্টে এন্ডি ফ্লাওয়ার দলে ঢোকেন। প্রথম দুই টেস্টে তিনি ছিলেন না। আর স্টুয়ার্ট কার্লাইলের পরিবর্তে দলে নেওয়া হয় মাসাকাদজাকে। হারারে টেস্ট শুরু হয় ২৭ জুলাই। টস জিতে আগে ফিল্ডিং করেছিল উইন্ডিজ। স্পিনার নেইল ম্যাকগ্রেল আর পেসার কলিন স্টুয়ার্টের দাপটে ১৩১ রানে অল আউট হয় জিম্বাবুয়ে। তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাসাকাদজা ৯ রানে স্টুয়ার্টের বলে বোল্ড হন। জবাবে রামনরেশ সারওয়ান আর শিবনারায়ণ চন্দরপলের দাপটে ৩৪৭ করে ২১৬ রানের লিড নেয় উইন্ডিজ। দ্বিতীয় দিনের শেষে আবার ব্যাট করতে নেমে ১ উইকেটে ২৭ রান তোলে স্বাগতিকরা। ২৯ জুলাই সকালে ৯ রানে অপরাজিত অ্যালিস্টার ক্যামবেলের সঙ্গে ব্যাট করতে নামেন মাসাকাদজা। মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় বলে বাউন্ডারি মেরে খাতাও খোলেন। দলের ১১৮ রানের মাথায় ৬৫ করে বিদায় নেন ক্যামবেল। এরপর তৃতীয় উইকেটে ক্রেগ উইহার্টের সঙ্গে ১৬৯ রানের জুটি গড়েন মাসাকাদজা। ৯৩ করে রান আউট হন উইহার্ট। ১০৮ বলে হাফসেঞ্চুরি করা মাসাকাদজা তখন নব্বইয়ের ঘরে। এরপর সেঞ্চুরি করে আরও কিছুক্ষণ টিকে ছিলেন। সেদিন ৩৮৮ মিনিট উইকেটে থেকে ৩১৬ বলের মোকাবিলায় ১১৯ রান করেছিলেন মাসাকাদজা। তার দৃঢ়তায় হারারে টেস্ট ড্র হয়েছিল।

অভিষেকে সেঞ্চুরির পর মাসাকাদজা ২০০১ সালে বাংলাদেশ সফরে আসেননি পড়াশোনার চাপে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন শেষ করার জন্য তিনি ২০০৪ সাল পর্যন্ত ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। মাসাকাদজা ক্যারিয়ারের শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন বাংলাদেশের মাটিতে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গত বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিনি ক্যারিয়ারের শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বাধিক রানের রেকর্ড গড়েন। ১৬৯.০৪ স্ট্রাইক রেটে ৪২ বলে করেছিলেন ৭১। দলও জিতেছিল। হ্যামিলটন মাসাকাদজা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৩৮ টেস্ট, ২০৯ ওয়ানডে ও ৬৬ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। টেস্টে ৩০.০৪ গড়ে ৫ সেঞ্চুরিসহ করেছেন ২২২৩ রান। ওয়ানডেতেও ৫ সেঞ্চুরিসহ ২৭.৭৩ গড়ে ৫৬৫৮ রান করেছেন তিনি।

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের বর্ণবাদের কারণে শুরু ও শেষের মাসাকাদজার মধ্যে কী আকাশ-পাতাল ব্যবধান। ১৮ বছরের ক্যারিয়ার। মাত্র ৩৮ টেস্ট নামের পাশে। ৫ সেঞ্চুরিতে ৩০.০৪ গড়ে ২২২৩ রান। অভিষেক কীর্তির কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যান। তিন বছরের পাঠ। কিন্তু পাঠ শেষ হওয়ার আগে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বর্ণবাদের ছোবলে হয় নীল। আগেভাগে ফিরতে হয়। এমন ভাঙাচোরা সময়ে নিজেকে কিছুটা আলাদা করা গেলেও দল নিচে নামতে থাকে। এরপর এক সময় টেস্ট থেকেই নির্বাসনে যায় জিম্বাবুয়ে। ৬ বছরের বিরতির পর ২০১১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে ফিরলে মাসাকাদজা পান তার দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। প্রথম ও পরেরটার সঙ্গে এক দশকের ব্যবধান!

টেকনিকে দারুণ ডানহাতি মাসাকাদজা ২০৯ ওয়ানডেতে ৫৬৫৮ রান করেছেন ৬ সেঞ্চুরিতে। ২৭.৭৩ গড়। শুরুটা ভালো ছিল না। তবে মানিয়ে নিয়েছেন একসময়। ইতিহাসে এক সিরিজে দুবার ১৫০ বা তার বেশি রান করা প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে তার নাম লেখা (কেনিয়ার বিপক্ষে ১৫৬ ও ১৭৮*)।  ৬৬ টি-টোয়েন্টিতে ১১ ফিফটিতে ১১৭-এর ওপরে স্ট্রাইক রেটে ১৬৬২ রান মাসাকাদজার সামর্থ্যরে কথাই বলে।

বর্ণবাদ, এর সূত্রে সংকট, আনপ্রেডিক্টেবল বোর্ড, খেলোয়াড়দের দেশ ছেড়ে যাওয়া, শেতাঙ্গ প্রতিভাদের ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়া, আর্থিক সংকট, ভেঙেপড়া ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোসহ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জিম্বাবুয়ে। মাসাকাদজার ক্যারিয়ারে এসব নেতিবাচক বিষয়ের নির্মম প্রভাব পড়েছে। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা খেলে বিদায় বলার সময় ক্যারিয়ারকে মূল্যায়ন করেন ‘অমøমধুর’ হিসেবে। ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন তিনি এমন, ‘এটা আমার শেষ ম্যাচ। আরও ভালো পরিস্থিতির মধ্যে বিদায় নিতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু কী আর করা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত