বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ এর আক্রমণে নাকাল পৃথিবী। এই বৈশ্বিক মহামারির সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে মারাত্মক বন্যা। দেশের ৩০টি জেলা প্লাবিত। এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের দেশের প্রায় ৪৩ লাখ মানুষ। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৯৩ জন।
গত জুন থেকে দেশের প্রায় ৩০ জেলার নিম্নাঞ্চল কয়েকবার প্লাবিত হয়েছে। এখনো কোথাও কোথাও পানি বাড়ছে। কোথাও কোথাও নদীর সর্বনাশা ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলের জমি হারিয়ে অসংখ্য পরিবার আশ্রয়হীন ও দিশেহারা। বানভাসি মানুষের দুঃখ কষ্ট আজ সীমাহীন। আশ্রয়হীন মানুষ, গৃহপালিত পশু এমনকি বনের পশুও আজ আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধে, উচুঁ জায়গায়। দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে জনজীবন। একদিকে করোনার সংক্রমণ ও আতঙ্ক- অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যা।
গরিব মানুষ বন্যায় পানিবন্দী আর ধনীরা করোনাতঙ্কে ঘরবন্দী। এমন এক বৈরী সময়ে আসছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল-আজহা। বিশ্বজুড়ে চলছে করোনার রাজত্ব। করোনা আমাদের স্বাভাবিক জীবন- যাপনের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে ধনীরা সাধারণত মুক্ত- স্বাধীন থাকে। কিন্তু, করোনার ভয়-আতঙ্কে ধনীরাও ঘরবন্দী জীবন যাপন করছে।
অদৃশ্য করোনা ধনী-গরিব সকলেরই স্বাধীনতা হরণ করেছে। উৎসব-আনন্দ সবই আজ সীমিত-বিধিবদ্ধ। তবুও, সময় তো থেমে থাকে না, সময়ের পথ বেয়ে আসছে ঈদুল আযহা। আমাদের এই সমাজে সব উৎসবই সামাজিক উৎসব। সবাই চায় যার যার মতো করে সকলের সাথে উৎসবে মিলে যেতে। উৎসব মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতার বলয় থেকে বের করে মিলন মেলায় মিলিয়ে দেয়। কিন্তু এখন সে মিলনে বাদ সেধেছে কভিড- ১৯ নামক আগ্রাসী এক ভাইরাস। ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানুষের সামাজিক মিলনকে সীমিত করে দিয়েছে।
মানুষ নতুন স্বাভাবিকতায় নতুন রীতিতে উৎসব উদযাপনের চেষ্টা করছে। ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়। কারণে ও অকারণে বদলায়, সকাল ও বিকালে বদলায়।’ মুনির চৌধুরীর এ বিখ্যাত উক্তি মানবজীবনের বড় সত্য।
তবে, করোনার কারণে আজ শুধু ব্যক্তিমানুষ নয় মানুষের জীবন - জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব - আনন্দ, অর্থনীতি, শীষ্টাচার সবই বদলে গেছে। মুসলমানদের বছরে দুটি ঈদ- ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা। করোনাকালেই পালিত হয়েছে ঘরবন্দি ঈদুল ফিতর । করোনা কবে যাবে আমরা জানি না। ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদও করোনাকালেই পালন করতে হবে।
আমরা আশা আর স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি। সময় যতই বিরূপ হোক তবুও মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখে, আশায় বাঁধে বুক। করোনার এ ঘোর-অমানিশা শেষে আসবে নতুন ভোর। এ আশাতেই স্বাগত ঈদুল আজহাকে।
ঈদুল আজহার অন্যতম বিষয় পশু কোরবানি। কোরবানি একটি ইবাদত। ইসলামের সকল ইবাদত ও বিধানই মানুষের জন্য কল্যাণকর। এই কল্যাণ জাগতিক এবং পরকালীন। কোরবানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম ( আ:) ও তার শিশুপুত্র ইসমাইল এর ত্যাগ ও উৎসগের অনুপম- অনন্য ইতিহাস। মহান আল্লাহ এর পক্ষ থেকে হজরত ইব্রাহিম ( আ:) ওপর নির্দেশ এলো তার প্রিয় পুত্র কোরবানির বা উৎসর্গ তিনি তার পুত্রকে বললেন, ‘প্রিয় পুত্র আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার মতামত বল।’ নবীর ছেলে,ভবিষ্যতের নবী। বয়স অল্প হলেও বুঝে ফেললেন এটা মহান আল্লাহ পাকের ওহি এবং আল্লাহর রাহে নিজেকে উৎসর্গ করার সর্বোত্তম সুযোগ।
পুত্র ইসমাইল পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ:) এর ছুরির নিচে মাথা পেতে দিলেন। উৎসর্গ, স্রষ্টার দাসত্ব আর আত্মসমর্পণের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে। পিতা-পুত্র একই চেতনা আর প্রেরণায় উজ্জীবিত। হজরত ইব্রাহিম (আ:) ছুরি চালালেন একান্ত প্রিয় শিশু পুত্র ইসমাঈল এর গলায়।
আল্লাহপাকের উদ্দেশ্যে পিতা-পুত্রের ত্যাগের কী অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহ এর কুদরতে পুত্রের বদলে কোরবানি হয় পশু। ‘প্রিয়বস্তু' উৎসর্গ চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হজরত ইব্রাহিম (আ:) আর ধৈর্য পরম পরীক্ষায় পাশ করেন হজরত ইসমাইল (আ:) । এই অনন্য ত্যাগের মহিমাকে স্মরণীয় করে রাখা হয়েছে ঈদে পশু কোরবানির মাধ্যমে। পিতা - পুত্রের সেই অমর স্মৃতিকে মানব জাতির ইতিহাসে জাগরুক রাখতে প্রতিবছর তাদের অনুসরণে পশু কোরবানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগত ঈদুল আজহায় সারা বিশ্বের মুসলমানরা দু'হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি করে যার যার সাধ্যমতো পশু কোরবানি করবে। ঈদুল আজহা একদিকে ত্যাগের পরীক্ষা অন্যদিকে আনন্দের উৎসব। পশু কোরবানি দেওয়া সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ওয়াজিব বা বিশেষ কর্তব্য। পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগ আর উৎসর্গ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনই কোরবানির মূল উদ্দেশ্যে। কোরবানি দেওয়া পশুর রক্ত - মাংস কিছুই স্রষ্টার কাছে পৌঁছে না, শুধু পৌঁছে তাকওয়া ।
অনেক মুসলিম এটি বুঝতে না পেরে ত্যাগের উৎসবকে ভোগ আর প্রদর্শনীর মহড়ায় পরিণত করে। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বা মানুষের বাহবা কুড়ানোর জন্য কোরবানির বড় পশু কেনাটা অর্থ - বিত্তের উৎকট প্রদর্শনী বৈ অন্য কিছু নয়। এটা ধর্ম ও ত্যাগ কোনটিই নয়। এটা ভোগ আর প্রদর্শনী। বিত্তের প্রতিযোগিতা নয়, বৈভবের প্রদর্শনী নয়, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ধর্মীয় ভাব- গাম্ভীর্য বজায় রেখে কোরবানি করাই আসল কোরবানি। পশু জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনের পশুকেও কোরবানি দিতে পারলেই ত্যাগের পরীক্ষায় পাস করে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। একটি জাতির ভাষা, ধর্ম, উৎসব, ইতিহাস - ঐতিহ্য, শিল্প - সাহিত্য ইত্যাদি নিয়েই তার সংস্কৃতি। এটি মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম খুব ভালো করে বুঝতেন। সে কারণেই নজরুলের কবিতায় ধর্মীয় উৎসব এবং এর উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও শিক্ষা এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার 'কোরবানি' কবিতায় কোরবানির আসল উদ্দেশ্য সুন্দর ভাবে বলেছেন, ‘ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ' শক্তির উদ্বোধন দুর্বল ! ভীরু ! চুপ রহো, ওহো খামাখা ক্ষুব্ধ মন ! ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর, -- আজিকার এ খুন কোরবানির ! ‘ঈদুল আজহার চাঁদ আনন্দ ও খুশির সঙ্গে বয়ে আনে ত্যাগ আর মনের পশুকে দমন করার বার্তা। বিদ্রোহী কবি নজরুল তার 'নতুন চাঁদের তকবীর শোন' কবিতায় দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘এল স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদজ্জোহার এই সে চাঁদ, ( তোরা ) ভোগের পাত্র ফেল দে ছুড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ। কোরাস: কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে। প্রাণের যা তোর প্রিয়তম আজকে সে সব আন, খোদার রাহে আজ তাহাদের করবে কোরবান। কি হবে ওই বনের পশু খোদারে দিয়ে (তোর) কাম ক্রোধাদি মনের পশু জবেহ কর নিয়ে। কোরাস : কোরবানি দে তোরা কোরবানি দে।।’
এই করোনাকালে একদিকে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিতরা জীবন ও জীবিকা উভয়ের জন্যই লড়াই করছে। দেশের বড় একটা অংশ বন্যাকবলিত। বানভাসি মানুষের দুঃখ - কষ্টের সীমা নেই। এর মধ্যেও এক শ্রেণির মানুষের লোভ আর ভোগের পেয়ালা উপচে পরছে। এরা কী লোভকে দমন করে ভোগকে কমিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে ? যদি না দাঁড়ায় তাহলে তার পশু কোরবানি বৃথা। যে আল্লাহপাকের উদ্দেশ্যে কোরবানি, তার অভুক্ত - অসহায় বান্দার প্রতি মমতা ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা।
মানুষের কবি নজরুল তার এক কবিতায় বলেছেন, ‘তোর পাশের ঘরে গরিব কাঙাল কাঁদছে যে তুই তাকে ফেলে ঈদগাহে যাস সঙ সেজে, তাই চাঁদ উঠল, এল না ঈদ, নাই হিম্মত, নাই উন্মিদ, শোন কেঁদে বেহেশত হতে হজরত আজ কি চাহে।।’ লোভ - লালসা, অতিভোগ, দ্রুত অবৈধভাবে ধনী হওয়ার জন্য দুর্নীতি অনেক মানুষকে আজ মানুষের মহত্তম আসন থেকে পশুরও অধম অবস্থানে নামিয়ে এনেছে।
আল্লাহ ভীতি, আত্মমর্যাদা, প্রজ্ঞা, মানুষের প্রতি মমতা-ভালোবাসা, ত্যাগের মানসিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ আজ বড় প্রয়োজন। এ বছরের ঈদুল আজহা দরদি সমাজ আর মানবিক পৃথিবী গড়ায় মানুষের ভেতরের পশুত্বকে দমিয়ে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার আকুতি নিয়ে হাজির হয়েছে। সাহায্যের হাত প্রসারিত হোক। বানবাসী মানুষের পাশে থাকুক সচ্ছল ও তুলনামুলক স্বস্তিতে থাকা মানুষগুলো। পশু ক্রয়-বিক্রয় ও কুরবানীর স্থান এবং ঈদগাহ হোক র জন্য স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদ উদ্যাপন হোক ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ও আনন্দময়।
লেখক: আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া
ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড
