ঈদ আসুক শুশ্রুষা ও সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২০, ০৬:৪২ এএম

ঈদুল আজহা মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত ঈদুল ফিতরের মতো এবারও এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহ। হজেও এসেছে বিপুল পরিবর্তন। হজের সময় পবিত্র মক্কা থেকে মিনা পর্যন্ত যেখানে প্রতি বছর ২৫ লক্ষাধিক মুসলিমের পদচারণা থাকত, এবার সেখানে হজ পালন করছেন মাত্র ১০ হাজার মুসল্লি।  মহামারী প্রতিরোধে সতর্কতার কারণে ইসলামের বৃহত্তম এই ধর্মীয় সম্মিলন এবার সীমিত পরিসরে পালনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আরাফাতের ময়দানে মসজিদে নামিরায় দেওয়া হজের খুতবায় শায়খ আবদুল্লাহ বিন সোলায়মান আল মানিয়া করোনা মহামারী থেকে মুক্তি ও বিশ্বশান্তি কামনা করে দোয়া করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নামাজ, পবিত্রতা অর্জন, রোগীর সেবা, মহামারী উপদ্রুত এলাকায় প্রবেশ না করা এবং ওইসব এলাকা থেকে অন্যত্র না যাওয়ার বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এমন সতর্কতার বাণী নিয়েই এবার সারা দুনিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদুল আজহা পালিত হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে এবার ঈদ এলো জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে। চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা মহামারীতে অর্থনীতি এরই মধ্যে বিপর্যস্ত। তার ওপর দেশজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার প্রকোপে জনজীবনের অসহায়ত্ব এখন চরমে উঠেছে।  আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উজানের পানি নামার জটিলতায় এবারের বন্যা ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার মতো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে দেশের মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকাসহ রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী নিম্নাঞ্চল দুই থেকে তিন সপ্তাহের জলাবদ্ধতায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে এখন পর্যন্ত দেশের ৩১ জেলার ১৫৩টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই মাস পার করা বন্যায় এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে। কিন্তু করোনার কারণে এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নেই বললেই চলে।  সরকারি ত্রাণ তৎপরতাও আশানুরূপ নয়। ফলে, ৩১টি জেলায় করোনাভাইরাস মহামারী এবং বন্যার দুই দুর্যোগ একসঙ্গে মোকাবিলা করাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারী, ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং বন্যা পর পর এই তিন দুর্যোগে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি মানুষের আশ্রয় সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে।

কোরবানির পশুর হাটে ব্যাপক লোকসমাগম আর ঈদের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষের শহর-বন্দর থেকে গ্রামাঞ্চলে যাতায়াতের কারণে দেশজুড়ে করোনার সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। কিন্তু পশুর হাট কিংবা দেশব্যাপী গণপরিবহনে যাতায়াতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আর মানুষের সুরক্ষায় আশানুরূপ পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সংক্রমণের শঙ্কা রয়েছে দেশজুড়ে ঈদের জামাতকে ঘিরেও। মহামারীর শুরুর দিকে বিগত ঈদুল ফিতরের সময় বারংবার সতর্কতার পরও ঈদের জামাতে লোকসমাগম সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ বিষয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় জনগণকে উৎসাহিত করার বিষয়ে সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি নাগরিকদেরও তা মেনে চলার দায়িত্ব রয়েছে। এবার ইসলামের বৃহত্তম ধর্মীয় সম্মিলন পবিত্র হজ অত্যন্ত সীমিত পরিসরে আয়োজনের দৃষ্টান্ত থেকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানদেরই এ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, এবারই প্রথম বাংলা ভাষাসহ মোট দশটি ভাষায় হজের খুতবা দুনিয়াব্যাপী প্রচার করা হয়েছে। সরকার বাংলায় হজের খুতবা প্রচার করে জনগণের মধ্যে মহামারী বিষয়ক সচেতনতা জাগানোর চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি ঈদের জামাতের খুতবাতেও ইমামরা দেশের মানুষকে মহামারীর বিপদ থেকে সুরক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন।

কোরবানি আমাদের ত্যাগের মহিমা শিক্ষা দেয়। আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যেই কোরবানি দেওয়া। কিন্তু দেখা যায় অনেকেই প্রকৃত ত্যাগের মানসিকতা অর্জনের চেষ্টা না করে লোক দেখানো কোরবানি দিয়ে থাকে। আলেমরা বলেন বিপদের দিনেই মানুষের প্রকৃত পরীক্ষা নেন আল্লাহ। এখন সারা দেশে মহামারী ও বন্যায় লাখ লাখ দরিদ্র ও অসহায় মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ অবস্থায় জরুরি ত্রাণ সহায়তা জোরদার করতে সরকারকে অবশ্যই জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি অসহায় মানুষদের ত্রাণ দিয়ে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের কিছুটা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে হলেও বিপদের দিনে মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে সবাই কোরবানির শিক্ষা কাজে লাগাতে পারি। ঈদুল আজহা মহামারী থেকে শুশ্রুষার বার্তা নিয়ে আসুক। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার অনুপ্রেরণা দিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত