রাজধানীর নিম্নাঞ্চল গত দুই সপ্তাহ ধরে বন্যাকবলিত। বিপদসীমার ওপর বইছে আশপাশের সবকটি নদ-নদী। অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। অনেক সড়ক দেড় ফিট পানির নিচে তলিয়ে যায়। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত অনেক সড়ক বৃষ্টির পানিতে ডুবে ছিল। বন্যার পানি ও জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী। আর দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি মধ্য আগস্টে উন্নতি হলেও মাসের শেষের দিকে আবারও নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীজুড়ে ছিল ভ্যাপসা গরম। গতকাল সকালের ঘণ্টাব্যাপী বৃষ্টি তাপপ্রবাহ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। ড্রেনের নোংরা পানি সড়কে উঠে পড়ে। অনেক এলাকায় দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়ে। এ সময় অনেককেই নোংরা পানির ওপর দিয়েই গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টিতে তাপপ্রবাহ কিছুটা কমলেও আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
গতকালের বৃষ্টিতে রাজধানীর নিম্নাঞ্চলের পানি আরও কিছুটা বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইলেও পানি তেমন বাড়ছে না। তাই রাজধানীর বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে। ভারী বর্ষণ না হলে রাজধানীর বন্যা পরিস্থিতি আপাতত অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
গতকাল রাজধানীর ডেমরা, বাড্ডা, রামপুরা, সাঁতারকুল, উত্তরখান, উলুখোলা, বেরাইদ এলকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওইসব এলাকার নিম্নাঞ্চলের অনেক ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। অনেক বাড়ির আবার পানি ছুঁই ছুঁই অবস্থা। ৩-৪ দিন আগেও এসব এলাকায় নিয়মিত পানি বাড়লেও গত দুদিন ধরে তেমন বাড়ছে না। তবে বৃষ্টির কারণে গতকাল পানির উচ্চতা কিছুটা বেড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। ওইসব এলাকার অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কাজকর্ম বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা ও রাজধানীর আশপাশের নদীগুলোর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টা মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
রাজধানী লাগোয়া বালু নদী বিপদসীমার ১২ সে. মি., তুরাগ নদ বিপদসীমার ৪১ সে.মি., শীতলক্ষ্যা বিপদসীমার ১৮ সে.মি., এলাসিন পয়েন্টে ধলেশ্বরী বিপদসীমার ৮৪ সে.মি. ও জাগির পয়েন্টে ৬৯ সে.মি. এবং টঙ্গী খাল বিপদসীমার ৩৩ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা বিপদসীমার ৭৮ সে.মি., মাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৭ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ওইসব এলাকার বেশিরভাগ নদ-নদীর পানিপ্রবাহ আগের চেয়ে অনেক কমেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বসতভিটায় ফিরেছেন। তবে পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে তারাও খাদ্য সংকটে ভুগছেন। নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। দূষিত পানি পান করে অনেকেই পানিবাহিত রোগে ভুগছেন।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। কুশিয়ারা ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, নাটোর, মানিকগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
বর্তমানে দেশের ১৮ জেলায় বন্যা চলছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে ১৭টি নদ-নদী। ২৬টি সমতল স্টেশনের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে ৭২টির হ্রাস পাচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মধ্য আগস্ট নাগাদ দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে আগস্টে বঙ্গোপসাগরে এক-দুটি বর্ষাকালীন লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। মাসজুড়ে সারা দেশে ২৭৩৫-৩৩৪০ মি.মি. বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গত ২ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছর ৩৩ জেলার ১৫৮টি উপজেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৪১ জন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪১০ টন চাল, ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১ কোটি ১০ টাকার শিশুখাদ্য, ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকার গো-খাদ্য, ৩০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ৯ লাখ টাকা গৃহনির্মাণ মজুরি বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৫২৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৫৬ হাজার ৩৯৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
সাভারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : সাভারে খাল-বিল ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় প্লাবিত হয়েছে অর্ধশতাধিক গ্রাম। ফলে পানিবন্দি অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের কয়েক লাখ মানুষ।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সাভার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় যোগ দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘দেশে বন্যা এক মাস হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ ত্রাণ পায়নি কথাটি সঠিক নয়। হয়তো দুর্গত এলাকা বা অনেক দূরবর্তী এলাকায় ত্রাণ পৌঁছতে দেরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সবার মাঝেই ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। না খেয়ে আছে বা না খেতে পেয়ে কষ্ট পেয়েছে এমন রিপোর্ট এখনো আসেনি।’
বাংলাদেশ এখন তৃতীয় দফা বন্যা মোকাবিলা করছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীর আশপাশে বন্যার পানি স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হবে। এখন পর্যন্ত দেশের ৩৩টি জেলায় প্রায় ৪৩ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে।’
সিরাজগঞ্জে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি : যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর পয়েন্টে গত দুদিন সামান্য বৃদ্ধি পেলেও গতকাল ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সিরাজগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে জেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের।
