সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা ইস্যুতে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে। বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে সর্বত্রই যেন অস্থিরতা ও অস্বস্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং সন্দেহ নেই যে এই যুদ্ধ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
তারপরও এখন পর্যন্ত চীন পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এই মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বেশকিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার জরিপ অনুযায়ী চীন আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে অতিক্রম করবে।
জিডিপি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ছিল ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট অর্থনীতির চার ভাগের একভাগ। অন্যদিকে চীনের জিডিপি ১৪.১৪ ট্রিলিয়ন ডলার যা বিশ্বের মোট অর্থনীতির ১৬.৩৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে জাপান সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী জিডিপি অনুযায়ী ২০৩০ সালে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করবে। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার আলোকে সম্প্রতি প্রকাশিত (মে, ২০২০) ‘ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রাম’-এর গবেষণা অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ক্রয়ক্ষমতার দিক দিয়ে চীনের জিডিপি ১৯.৬১ ট্রিলিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯.৫১ ট্রিলিয়ন ছিল। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি ২০১৯ সালে ছিল ৩৪৫.৬ বিলিয়ন ডলার যদিও তা ২০১৮ এর ৪১৯.৫ বিলিয়ন-এর থেকে ১৮% কম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী যুক্তরাজ্যের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী বিশ্বের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে। এরপর শীতল যুদ্ধের অবসান ও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে তার নেতৃত্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এখানে উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত এবং এর পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এর সবগুলোই আমেরিকার ভূখ-ের বাইরে এবং এই সময়ই আমেরিকার অর্থনীতি আরও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।
মূলত পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বিশেষত আফ্রিকা ও এশিয়ায় যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিস্তার শুরু হয়, এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীর ক্ষমতা মঞ্চে পশ্চিমাদের সর্বময় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পশ্চিমা দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রীতিনীতি ও জীবন-যাপনের প্রথা এবং এগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও অর্জিত হয়েছে বিভিন্নভাবে।
অন্যদিকে মাও সে তুং-এর চীন জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের পর, আশির দশকের শেষের দিকে দেং জিয়াও পিং-এর আমলে কমিউনিস্ট ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই অর্থনীতি উন্মুক্ত করতে থাকে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিপদ বুঝে চীন এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে চীন মোটামুটি মুক্তবাজার অর্থনীতির কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে, পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক মিত্রে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীন ও আমেরিকার সম্পর্ক নানা উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। মাও সে তুং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দেওয়ার পর পশ্চিমাদের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক চূড়ান্ত খারাপ হয়। অথচ এর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালায়, ইতিহাসে এই প্রচেষ্টা পিংপং কূটনীতি হিসেবে পরিচিত। পিংপং কূটনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতার যোগসূত্র আছে। দীর্ঘ বিরোধের পর ১৯৭০-৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট চীন আবার কাছাকাছি এলে ঐ সময়ে এই দুই দেশই জোটবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে গোপনে চীন সফর করেন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির ভেতরে থেকে গত দুই দশকে চীন নিজেকে সমগ্র পৃথিবীর কারখানা হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাদের অর্থনীতিও বেশ বাড়ন্ত এবং এখন চীন নিজে পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় চালকের আসনে বসার স্বপ্ন দেখছে। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চীন সারা বিশ্বে একটা রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতির কাছে ধরাশায়ী অনেক দেশই।
এই সামগ্রিক অবস্থায় ক্ষমতা ও পুঁজিবাদের কেন্দ্র বদলই পশ্চিমাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। আর এই দুশ্চিন্তা থেকে সারা বিশ্বে চীনবিরোধী অনেকগুলো ইস্যুর জন্ম নিয়েছে। হুয়াওয়ে মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি, মেধাস্বত্ব¡ চুরি, দক্ষিণ চায়না সাগরের ওপর চীনের একক কর্র্তৃত্ব, হংকংয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ ও উইঘুরদের ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদিসহ আরও অনেক কিছু। নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে চীনের অতীত ও বর্তমান রেকর্ড ভালো নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীতে এটা শুধু চীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অন্যান্য আরও অনেক দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যারা পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
অন্যদিকে, ওই একই সময় বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে শে^তাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটে। এই জাতীয়তাবাদের উত্থান বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে নয়, বরং এর উত্থান ঘটে নিজেদের কর্র্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখার অভিপ্রায়ে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের একটা বড় অংশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় পড়ে যায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল চীন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব তথা পশ্চিমা বিশ্বের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আর এই চ্যালেঞ্জই সংঘাতের মূল কারণ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে পুঁজিবাদের যে একচ্ছত্র জয়যাত্রা শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাপী তার ওপর ভর করেই চীন ক্ষমতার কেন্দ্রীয় চরিত্রকে পরিবর্তন করতে চাইছে, এক্ষেত্রে সংঘাত অনিবার্যই বটে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
