মহামারীকালে সুরক্ষা উপকরণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, গাউন- সবই প্লাস্টিকের তৈরি। বিপুল হারে ব্যবহারের পর এই প্লাস্টিক পণ্যগুলোর জায়গা হচ্ছে মাটিতে, পানিতে। ক্ষতির মুখে পড়ছে মাছ, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী। নতুন এই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
পিপিই যখন পরিবেশ দূষণের কারণ
নভেল করোনাভাইরাসকে ঠেকাতে মানুষের সেবায় ফ্রন্টলাইনে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন সাহসী চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা। তাদের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট অর্থাৎ পিপিই। এই পিপিইর মধ্যে আছে মাস্ক, গ্লাভস, গগলস এবং গাউন। অথচ মানুষের সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত এই উপকরণগুলোই আবার ক্ষতিকারক হয়ে উঠছে মানুষ তথা পরিবেশের জন্য। পরিণত হচ্ছে ভয়াবহ জঞ্জালে। ভাইরাস ছড়ানো বন্ধে এই উপকরণগুলোর ব্যবহার কার্যকর হলেও মাস্ক, গ্লাভসের মতো হালকা উপকরণগুলো খুব সহজেই বাতাসে উড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে পড়ে। আর এতে খুব সহজেই সেগুলো নদী বা সমুদ্রের পানিতে গিয়ে জমতে থাকে। পাখি বা সামুদ্রিক মাছ খাবারের সন্ধানে এগুলো মুখে নেওয়ার কারণে তাদের শারীরিক ক্ষতি এমনকি মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। মেরিন কনজারভেশন অর্গানাইজেশন ওসিয়ান এশিয়া হংকং এর কাছে সোকো দ্বীপে মাস্কের বৃদ্ধি নিয়ে একটি রিপোর্ট করেছিল। সেখানে তারা দেখিয়েছে কীভাবে দ্রুত পরিবেশে প্লাস্টিকের দূষণ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন ব্যবহারযোগ্য ফেস মাস্কের সংখ্যা বছর শেষে এসে দাঁড়াবে ৬৬,০০০ টনে। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মাস্কের চেয়ে এ সংখ্যা দশ গুণ বেশি। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করছেন অনেকে। ‘সিটি টু সি’ দেশটির একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে তারা ক্যাম্পেইন করছে। এই ক্যাম্পেইনের প্রধান জো মরলির মতে, এই মহামারী আমাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘টেস্ট করানো বা চিকিৎসা প্রদানের সময় পিপিই ব্যবহার করে সুরক্ষিত থাকার বিষয়টিকে আমরা পূর্ণ সমর্থন করি। একই সঙ্গে আমরা ভাবছি কীভাবে এই মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার শেষে নষ্ট করে ফেলা যায় তা নিয়ে।’ পুনরায় ব্যবহার করা যায় এমন মাস্ক নিয়ে তিনি বেশি আশাবাদী। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল মেরিন কনজারভেশন অ্যান্ড ক্যাম্পেইনিং চ্যারিটি ‘সার্ফার্স এগেইনস্ট সুয়েজ’ জানিয়েছে, দ্রুতহারে এভাবে পিপিই’র বৃদ্ধি মোটেও ভালো লক্ষণ নয় পরিবেশের জন্য। আর এই মুহূর্তে বিষয়টিকে একদম আড়াল করা উচিত নয়। সংস্থাটির সিইও হুগো ট্যাগোম বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে মহামারীর আগে পিপিই এতটা লক্ষণীয় কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ আগে থেকেই ছিল। আর এখন নতুন করে পিপিই যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক দূষণের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে। এই প্লাস্টিক পণ্যগুলো যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। আমাদের সমুদ্র নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যত যাই কিছু হোক, বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে ভাবার সময় এসেছে।’
বিশ্বজুড়ে এ মুহূর্তে প্রতি মাসে ১২৯ বিলিয়ন ফেস মাস্ক এবং ৬৫ বিলিয়ন গ্লাভস ব্যবহার করা হচ্ছে। ডুবুরি এবং পর্যবেক্ষকেরা পানির নিচে এই সবের অস্তিত্ব পাচ্ছেন। দিন দিন এগুলো সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বন্যপ্রাণী, পাখিদের বেলায়ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। ওশিয়ান কনজারভেন্সির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডগ ক্রেস বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে আমরা খুব গুরুতর সমস্যার মধ্যে পড়েছি। মহামারীর আগেই সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ শুরু হলেও বৈশ্বিক মহামারীতে এটি এখন বেড়ে গেছে বহুগুণ। ফেস মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার শেষে যথাযথভাবে নষ্ট করা হয় না বলে এগুলো রাস্তায় পড়ে থাকে। বাতাসে উড়ে আসে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। দিন দিন পরিবেশের ক্ষতি বেড়েই চলেছে। আবার পিপিই ডাস্টবিনে ফেললেও যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে তাও নয়। কারণ দিন শেষে এগুলো অন্যান্য ময়লার মতো একইভাবে পানিতে এসে মিশছে। এ ছাড়া মাটিতে পড়ে থাকা জঞ্জাল বাতাস, বৃষ্টির পানির সঙ্গে চলে যাচ্ছে নদী-সমুদ্রে, ক্ষতি করছে সামুদ্রিক প্রাণীদের। একটা মাস্ক বা গ্লাভস একটি তিমি মাছকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে।’
সার্জিক্যাল মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক, গ্লাভস সবই বানানো হয় সিন্থেটিক, নন-বায়োডিগ্রেডেবল উপাদান দিয়ে। অর্থাৎ এগুলো পরিবেশে একশ বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনসহ অনেক চিকিৎসক বলেছেন কভিড-১৯ এর প্রকোপ ঠেকাতে প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য ডিসপজেবল মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এ ছাড়াও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারও বাধ্যতামূলক নয়। চোখে মুখে হাত না দিয়ে, কিছুক্ষণ পরপর সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিলে ভাইরাস দূরে থাকবে এবং সেটাই বেশি কার্যকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়েছে, সার্জিক্যাল মাস্ক নয়, বরং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মাস্ক ব্যবহার করতে। কাপড়ের মাস্ক বারবার ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া যায়।
হাসপাতালের প্লাস্টিক উপকরণ
ওয়াশিংটন ডি সি’র জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে কভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগীদের দিকে যথাযথ খেয়াল রাখতে হতো। প্রতি ঘণ্টায় রোগীদের পর্যবেক্ষণ করার জন্য নার্সদের যেতে হতো। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসক চলে আসতেন দ্রুত। এক কথায়, একজন রোগীর জন্য সব মিলিয়ে ৫০-৮০ বার তার কাছে যেতে হতো। আর এই পুরো সময়টায় পরে থাকতে হতো পিপিই। মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা এই উপকরণ ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হতো। হাসপাতালের সিওও নিকোল ডলিসন বলেন, জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ১০০০ এরও বেশি রোগী এসেছে। অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে গেছেন। তবুও যারা রয়ে গেছেন তাদের তুলনায় পিপিই’র সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। ১ এপ্রিল শহরটি লকডাউন হয়ে গেলে হাসপাতালে সার্জারি এবং ইমার্জেন্সি রুম সার্ভিস বন্ধ করে দিয়ে কভিড-১৯ এর সেবার ব্যবস্থা করা হয়। এতে কয়েকগুণ হারে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এন-৯৫ মাস্কসহ প্লাস্টিক গাউন আর বুট জুতার ব্যবহার। অন্যান্য সবকিছুর ব্যবহারও বৃদ্ধি পেতে থাকে।’ এই হাসপাতাল থেকে ইতিমধ্যে প্রচুর পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়েছে। ডলিসনের মতে, সব হাসপাতালে যখন আবার আগের মতো সেবা দেওয়া শুরু হবে তখন এই সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য হাসপাতালের মতো জর্জ ওয়াশিংটন হাসপাতালও কর্মীদের এবং রোগীদের সুরক্ষায় প্রচুর পরিমাণে পিপিই ব্যবহার করে। কিন্তু এই সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত এন-৯৫ মাস্ক, গ্লাভস, গাউন এখন নন-রিসাইকেবল প্লাস্টিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেগুলো ব্যবহার শেষে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় পরিবেশের জন্য ক্ষতি।
কভিড-১৯ মহামারীতে যদি ভালো কোনো খবর এসে থাকে তবে সেটি হচ্ছে প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ধুলোবালি, কলকারখানার ধোঁয়া কমে আসায় কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ কমে এসেছে বহুলাংশে। পানিতে বোটিং ট্রাফিক কম হওয়ায় পানি পরিষ্কার রয়েছে মিয়ামির মতো শহরে। অনেকেই এটিকে অর্থনীতি আরও টেকসই হওয়ার লক্ষণ বলছেন, আবার অন্যদিকে অনেকে ভাবছেন মহামারী পরবর্তী সময়ে দূষণের মাত্রা নিয়ে। তবে ভালো মন্দের বিচার আর যেভাবেই হোক না কেন, পরিবেশে প্লাস্টিক দূষণ ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে গেছে। ‘পিপিই, খাবার প্যাকেজিং এর জন্য আলাদা ব্যাগ, পানির বোতলের ব্যবহার বেড়েছে অনেকাংশে’, বলছিলেন রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের সদস্য র্যাচেল মেইডেল। হাসপাতালগুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে তো হচ্ছেই, ভাইরাস ঠেকাতে সাধারণ মানুষও প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। মাস্ক এবং গ্লাভসের ব্যবহার, অনলাইনে অর্ডার করলে সেগুলোর প্যাকিং এর জন্য প্লাস্টিক ব্যাগ, খাবারের জন্য পলিস্টেরিন কন্টেইনারের ব্যবহার হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। যখন এই সব জিনিস ফেলে দেওয়া হয় তখন এগুলো একত্রে পড়ে থাকছে মাটিতে অথবা পানিতে। প্রকৃতির ইকো সিস্টেমের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এগুলো নীরব কেমিক্যাল হয়ে পৃথিবীতে থাকবে আর ক্ষতি করবে মানুষ এবং বন্য ও সামুদ্রিক প্রাণীদের। প্লাস্টিক নমনীয় পলিমার দিয়ে তৈরি, যেগুলো আবার ফসিল ফুয়েল দিয়ে বানানো হয়, নষ্ট হতে সময় লাগে ১০০ বছরেরও বেশি। অথচ এ মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনের জীবনে এই প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে এখন প্রায় ৫৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজার গড়ে উঠেছে প্লাস্টিকের। যেখানে প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন উপাদান সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, সেখানে এই মহামারীতে ব্যবহার করা অতিরিক্ত প্লাস্টিক কি পরিবেশের জন্য অনিরাপদ এবং ধ্বংসাত্বক হয়ে উঠবে না?
সুরক্ষা ও বর্জ্য
শিকাগোর অ্যাডভোকেট লুথেরান জেনারেল হাসপাতালে ইমার্জেন্সি রুমে কভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসা দেন ফিলিপ স্কিবা। তিনি যথাযথ সুরক্ষাবিধি মেনে চলেন। স্কিবা এক জোড়া গ্লাভস, একটি এন-৯৫ মাস্ক এবং মাস্কের ওপরেও একটি ফেস শিল্ড পরেন। রোগী দেখা শেষে গ্লাভস এবং অ্যাপ্রনটি একটি লাল রঙের আবর্জনার ব্যাগে রাখেন এবং ফেস শিল্ডটি পরিষ্কার করে নেন। তিনি এটি পরেন চোখের সুরক্ষায় এবং মাস্ক যেন ২য় বার ব্যবহার করা যায় সেজন্য। এভাবে তিনি দিনে ১৫/২০ জন রোগী দেখতে পারেন। তবে এভাবে রোগী দেখতে হলে অবশ্যই অনেক বেশি সচেতন থাকতে হবে বলে জানান স্কিবা। রোগীরা সাধারণত হাসপাতালে আসে খুব সাধারণ মাস্ক পরে। তাই তাকে অনেক বেশি সাবধান থাকতে হয় যেন কোনোভাবেই তার মাধ্যমে রোগ অন্যজনের মধ্যে না ছড়ায়। এ জন্য তিনি অনেকগুলো প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট সঙ্গে রেখেছেন। স্কিবার মতে, ‘প্রতি রোগীর জন্য চিকিৎসকদের আলাদা আলাদা গাউন এবং গ্লাভস পরার অভ্যাস রাখা উচিত নয়। এতে অবশ্যই বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়ে।’ তবে শুধু পিপিই যে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট হিসেবে বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়াচ্ছে তা নয়। ডলিসন বলেন, হাসপাতালে কভিড-১৯ রোগী দেখার জন্য আরও অনেক জিনিসের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে স্টেথেসকোপও আছে। সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পর পরই সেটি ফেলে দেওয়া হয়। এমনকি ভেন্টিলেটরও।
আক্রান্ত রোগী আমেরিকাতে অনেক বেশি। আর সেখানে প্রচুর পরিমাণে মেডিকেলের বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। আর এগুলো থেকে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে মানুষ। বর্জ্য নিয়ে কাজ করা অন্যতম বড় কোম্পানি স্টেরিসাইকেল জানিয়েছে, ইতিমধ্যে তারা বিপুলসংখ্যক বর্জ্য সংগ্রহ করেছে। তবে তারা এখনো জানে না এর পরিমান আরও কত বেশি। দ্য ন্যাশনাল ওয়েস্ট অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কাজ করছে ৭০০টিরও বেশি ফার্ম। তারা সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসা বর্জ্য পরিচালনার আশপাশের নিয়ম শিথিল করার জন্য বলেছে। তবে শুধু আমেরিকাতেই যে বর্জ্যরে পাহাড় জমছে তা নয়। চীনের উহানে যেখানে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছিল সেখানে প্রতিদিন ২৭০ টন মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। যেখানে মহামারীর আগে এই পরিমান ছিল প্রতিদিন ৪৪ টন। উহানসহ আরও ২৭টি শহর এই মেডিকেল বর্জ্য সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে এখন। আমেরিকায় শুধু এপ্রিল মাসেই মাস্কের ব্যবহার ১৭ থেকে বেড়ে ৬৩ শতাংশে পৌঁছায়। প্রতিরক্ষার জন্য গ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারকে জরুরি বলা হলেও এগুলো সবই প্লাস্টিকের তৈরি। অথবা এগুলোর বাইরের আবরণ জড়ানো থাকে প্লাস্টিক দিয়েই। আবার মধ্য মার্চ থেকেই আমেরিকায় অনলাইনে অর্ডারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ৫২ শতাংশেরও বেশি আমেরিকান এখন সব অর্ডার করেন অনলাইনে। গত দুবছরের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণ। যেহেতু গ্রাহকের দুয়ারে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ রেখে আসা যায় না তাই পেপার আর প্লাস্টিক ব্যাগই ভরসা।
পরিবেশে প্লাস্টিক
প্রতিটি একক ব্যবহারের প্লাস্টিক, এমনকি সেটি যদি জীবন রক্ষাকারীও হয়, বারবার ব্যবহারও করা হয়, তবু সেটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ছয় দশকে, বিশ্বজুড়ে ৬.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক অর্থাৎ ১৯ ট্রিলিয়ন পাউন্ড প্লাস্টিক তৈরি হয়েছে এবং ৬.৩ বিলিয়ন প্লাস্টিক অপচয় হয়েছে। এই অপচয়কৃত প্লাস্টিকের মাত্র ৯ শতাংশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়েছে, ১২ শতাংশকে শক্তির জন্য পুড়িয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। বাকিটা গিয়েছে ময়লার ভাগাড়ে, সেগুলো থেকে টক্সিক কেমিক্যাল নির্গত হয়েছে, সেই কেমিক্যাল মিশেছে পানিতে অথবা রয়েছে প্রকৃতিতেই, তাতে বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং মারা পড়ছে পশুপাখি এবং সামুদ্রিক প্রাণীরা। গ্লাভস দেখতে অনেকটা জেলিফিসের মতো। পানিতে এগুলোর মধ্যে জীবাণু জন্ম নিতে খুব বেশি সময় লাগে না। আবার সত্যিকারের খাবারের মতো গন্ধও আসতে থাকে সেটি থেকে। খাবার ভেবে এগুলো মুখে নিতে পারে সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ এমনকি সামুদ্রিক যেকোনো বড় প্রাণীও। ‘আরও একটি সমস্যা আছে যেটি সচরাচর সবাই বুঝে উঠতে পারে না। পরিবেশে থাকতে থাকতে প্লাস্টিকগুলো ভাঙতে ভাঙতে এক সময় হাফ মিলিমিটার বা তার চেয়েও ছোট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। মানুষ এবং প্রাণীদের ক্ষতি এরা খুব সহজেই করতে পারে। এগুলো খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। স্থির অবস্থায় থেকে এগুলো শুধু ছোট থেকে ছোট প্লাস্টিকে পরিণত হয়। আকারে যত ছোট হবে, পরিবেশে তত বেশি এগুলো প্রভাব ফেলবে।’ বলছিলেন ইলিনয়েস সাসটেইনেবল টেকনোলজি সেন্টারের সিনিয়র কেমিস্ট জন স্কট। আপাতদৃষ্টিতে শুনে হয়তো বড় কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্তু ক্ষতির এটি কেবল শুরু। মাছ এবং পাখির মতো প্রাণীরা এসব অপচনীয় প্লাস্টিক খাবে, তারা ক্ষুধার্ত হবে কিন্তু খেতে পারবে না, ভুগবে পুষ্টির অভাবে। মানুষও খাবার, পানীয়, শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে হাজার হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করাবে নিজেদের শরীরে। যদিও এ সংখ্যা নেহায়েত এখন কম নয়। শুধু এগুলোই নয়, সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার কারণেও মানুষের স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে কেননা সেই মাছগুলোর শরীরে ইতিমধ্যে প্লাস্টিক রয়েছে। স্কট বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে প্লাস্টিক দূষণ অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। ধরা যাক, কোনো একটি বিচ যদি প্লাস্টিকে পূর্ণ হয়ে থাকে, তবে সেখানে কেউ যাবে না। অবশ্যই সে এলাকার জন্য এটি ক্ষতি। যদি মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে যায় তখন স্পোর্ট ফিশিংও বন্ধ হয়ে যাবে।’
বিকল্প কী?
প্রথম প্লাস্টিক উদ্ভাবন করা হয় ১৮৬৯ সালে। কিন্তু ব্যাপক আকারে বানানো হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর, যখন মিলিটারির ব্যবহারের জন্য নাইলনের প্রচলন শুরু হয়। তখন প্লাস্টিক তৈরি হলেও এগুলো আবার অন্য কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন ব্যবহার শেষে তা পড়ে থাকে পরিবেশে, ক্ষতি হয় মানব ও প্রাণী সমাজের। এই মহামারীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং বর্জ্যরে পরিমাণ বেড়ে গেছে কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কেবল প্লাস্টিকের সামগ্রী থেকেই তৈরি হয়। প্লাস্টিক তৈরিকে অর্থনীতির জন্য উপকারী মনে করা হলেও এগুলো থেকে নিঃসৃত ফসিল ফুয়েল ক্ষতি করছে পরিবেশের। বায়োপ্লাস্টিক হয়তো গাছের জন্য উপকারী হতে পারে কিন্তু বেশি পরিমান বায়োপ্লাস্টিক আবার জমির জন্য ক্ষতিকর।
প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে কাজ করে জুডিথ অ্যাংকের প্রতিষ্ঠান। যে সব সমস্যার সহজে সমাধান হয় না তারা সেগুলো নিয়ে কাজ করেন। তার মতে, প্লাস্টিক দূষণ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার চেষ্টা করলে অর্থনৈতিক ব্যাঘাত এক সময় না এক সময় ঘটবেই। আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছি যেটি খুব সহজে দূর হবে না। একজন প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে দিলেও আমরা আগের মতো স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে যাব, তাও নয়। যতটুকু সম্ভব সাধারণ জ্ঞান এখন আমাদের কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি জিনিসের ব্যবহার বুঝে করতে হবে। প্লাস্টিক ছাড়া মহামারী দমন এখন সম্ভব নয়, আবার এই প্লাস্টিক দিয়ে পরিবেশকেও আমরা ক্ষতির মুখে ফেলতে পারি না।’
