নেত্রকোনার মদন উপজেলার একটি হাওরে ট্রলার ডুবে কমপক্ষে ১৭ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ আছেন আরও একজন। গতকাল বুধবার দুপুরে গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের রাজালিকান্দা হাওরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনার পর যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তারা ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। ঈদ উপলক্ষে তারা সবাই হাওরে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুর ১টার দিকে মদনের উচিতপুর এলাকায় হাওর ভ্রমণে যান। তারা একটি ট্রলারে করে উচিতপুর থেকে গোবিন্দশ্রীর দিকে যাচ্ছিলেন। ট্রলারটিতে নানা বয়সের মাদ্রাসাশিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিবারের লোকজনসহ ৪৮ জন পর্যটক ছিলেন। পথে রাজালিকান্দা এলাকায় প্রচণ্ড ঢেউয়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। প্রথমে এলাকার বাসিন্দারা উদ্ধার তৎপরতা চালায়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা এসে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। পর্যটকবাহী ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাইয়ে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ছয় শিশু রয়েছে। নিহতরা হলেন মাহফুজুর রহমান (৪৫), শফিকুর রহমান (৪০), ইসা মিয়া (৪০), আজহারুল ইসলাম (৩৮), মাহমুদ মিয়া (১২), আসিফ (১৫), সামাআন (২০), রেজাউল করিম (১৬), মুজাহিদ মিয়া (১৭), হামিদুল ৩৫), সাইফুল ইসলাম রতন (৩০), জুবায়ের (২২), জহিরুল ইসলাম (৩৫), জাহিদ (২০), রাকিব (২০), লুবনা আক্তার (১০), জুলফা আক্তার (৭)। এছাড়া সাদ (২৬) নামে একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মদনের উচিতপুর ঘাটে ট্রলারচালক অতিরিক্ত বোঝাই করে ২০-২৫ জন ধারণক্ষমতার নৌকায় ৪৮ জনের মতো যাত্রী তুলে হাওরে যায়। এ সময় প্রবল বাতাস ও নড়াচড়া করার কারণে ট্রলারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায়। যাত্রীদের মধ্যে ৩০ জনের মতো সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বাকিরা ডুবে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় নেত্রকোনা ও মদন ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার খানে আলমের নেতৃত্বে ১৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়। গতকাল রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিখোঁজ একজনকে উদ্ধারে তৎপরতা চলছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দশ্রী পশ্চিমপাড়া গ্রামের মাহমুদুল হক মান্না দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওরা আসছিল বেড়াতে পানি দেখার জন্য। এখানটায় ঢেউ বেশি ছিল। ট্রলার ঘোরাতে গিয়ে নৌকা উল্টে যায়। এ দৃশ্য দেখে নিজ দায়িত্বে উদ্ধারের চেষ্টা করি। প্রথমে দুটি বাচ্চাকে মৃত উদ্ধার করি। সেই সঙ্গে ৩০ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে ফোন করে জানানো হলে পরে তারা এলে তাদের সঙ্গে গ্রামের অনেকে ডুবুরির কাজ করে ১০টি লাশ উদ্ধার করে।’
নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার খানে আলম বলেন, ‘আমরা দুপুর ১টার দিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। জানতে পারি ৪৮ জন লোক ময়মনসিংহের বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ছিল ট্রলারের যাত্রী। ৩০ জন ছাত্রী জীবিত উদ্ধার হলেও ১৮ জন নিখোঁজ থাকে। স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের দল ১৭টি লাশ উদ্ধার করে। একজন নিখোঁজ রয়েছে, তাকে উদ্ধারের জন্য ময়মনসিংহ থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসেছে।’
মদন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘আজকে (গতকাল) হাওরে বাতাস বেশি ছিল, সেই সঙ্গে পানিও উত্তাল ছিল। যতটুকু জানতে পেরেছি বেড়াতে ৪৮ যাত্রী এসেছিল। তারা বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা রয়েছে। আমরা দুর্ঘটনাটি তদন্ত করে দেখব।’
