করোনাকালের পাঁচ মাস

শেষ মাসে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২০, ০৪:৩৭ এএম

দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর পাঁচ মাস অতিক্রম করে ষষ্ঠ মাসে পড়েছে। গতকাল বুধবার ছিল দেশে করোনা শনাক্তের ১৫১তম দিন। তার আগের দিন মঙ্গলবার ছিল পঞ্চম মাসের শেষ দিন। এই পাঁচ মাসে দেশে আড়াই লাখের কাছাকাছি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রোগী ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে   গেছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৩ হাজার ২০০-এর বেশি রোগী। চতুর্থ মাস পর্যন্ত পরীক্ষা ও নতুন রোগী শনাক্ত ক্রমান্বয়ে বাড়লেও পঞ্চম মাসে তার ছন্দপতন হয়েছে। এ মাসে আগের মাস থেকে পরীক্ষা কমেছে লক্ষাধিক। ফলে নতুন রোগী শনাক্তও এ মাসে কিছুটা কমেছে। তবে এ মাসে নতুন রোগী শনাক্তের হার বা সংক্রমণের হার ছিল সর্বোচ্চ। পরীক্ষা বিবেচনায় প্রায় ২৩ শতাংশ হারে এ মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া সব মাস মিলে রোগী শনাক্তের গড় হারও বেড়ে ২০ দশমিক ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। যেখানে চতুর্থ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত রোগী শনাক্তের গড় হার ছিল ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে শেষ মাসে মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাস থেকে কিছুটা কমেছে। যদিও নতুন রোগী শনাক্ত যেভাবে কমেছে, সেভাবে মৃত্যু কমেনি, বরং বেড়েছে। ফলে দেশে করোনায় গড় মৃত্যুহারও বেড়েছে। চতুর্থ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত মৃত্যুহার ছিল ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। পঞ্চম মাসের শেষ দিনে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশে।

পাঁচ মাসের পরিসংখ্যান : গত পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথম মাসে (৮ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল) মোট ৩ হাজার ৬১০টি পরীক্ষায় ১২৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ওই সময় মৃত্যুবরণ করেছেন ১২ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন। এ ছাড়া আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছিল ৪৪৩ জনকে ও কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে ৬৬ হাজার ৮১০ জনকে। একইভাবে দ্বিতীয় মাসে (৭ এপ্রিল থেকে ৬ মে) পরীক্ষা ৯৬ হাজার ৩৬টি, শনাক্ত ১১ হাজার ৫৯৬ জন, মৃত্যু ১৭৪ জন, সুস্থ ১ হাজার ৭৪৭ জন, আইসোলেশন ২ হাজার ৬৭৮ জন এবং কোয়ারেন্টাইন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯০ জন। তৃতীয় মাসে (৭ মে থেকে ৫ জুন) পরীক্ষা ২ লাখ ৭২ হাজার ৭১৯টি, শনাক্ত ৪৮ হাজার ৬৭২ জন, মৃত্যু ৬২৫ জন, সুস্থ ১১ হাজার ২৪ জন, আইসোলেশন ৭ হাজার ৬৭২ জন এবং কোয়ারেন্টাইন ৯৫ হাজার ৭৩৩ জন। চতুর্থ মাসে (৬ জুন থেকে ৫ জুলাই) পরীক্ষা ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৭টি, শনাক্ত ১ লাখ ২ হাজার ২৬ জন, মৃত্যু ১ হাজার ২৪১ জন, সুস্থ ৫৯ হাজার ৮২১ জন, আইসোলেশন ২০ হাজার ৭৯ জন এবং কোয়ারেন্টাইন ৭৯ হাজার ৫৯৯ জন। পঞ্চম মাসে (৭ জুন থেকে ৪ জুলাই) পরীক্ষা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪টি, শনাক্ত ৮১ হাজার ৬০৩ জন, মৃত্যু ১ হাজার ১৮২ জন, সুস্থ ৬৭ হাজার ২৩৫ জন, আইসোলেশন ২১ হাজার ৭৭৫ জন, কোয়ারেন্টাইন ৬৪ হাজার ৮০০ জন।

পরীক্ষা কমেছে, শনাক্তের হার বেড়েছে : পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথম মাসে রোগী শনাক্তের হার ছিল গড়ে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ পরীক্ষায় ৩ জনের কিছু বেশি করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় মাসে তা বেড়ে ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ, তৃতীয় মাসে আরও বেড়ে ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, চতুর্থ মাসে ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং পঞ্চম বা শেষ মাসে সর্বোচ্চ ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে। প্রথম মাসে খুবই কম সংখ্যক পরীক্ষা হয়েছে। দ্বিতীয় মাস থেকে পরীক্ষা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। শতকরা হিসাবে প্রথম মাসের চেয়ে দ্বিতীয় মাসে প্রায় ২ হাজার ৫৬০ শতাংশ পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয় মাসে বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৮৩ শতাংশ এবং চতুর্থ মাসে বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। কিন্তু পঞ্চম মাসে এসে পরীক্ষা বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমে গেছে। আগের মাস থেকে এ মাসে ২৫ শতাংশ পরীক্ষা কম হয়েছে।

মৃত্যু কমেছে : পঞ্চম মাসে দেশে করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন মোট ১ হাজার ১৮২ জন। চতুর্থ মাসে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১ হাজার ২৪১ জন। প্রথম চার মাসে ক্রমান্বয়ে মৃত্যু বাড়লেও পঞ্চম মাসে মৃত্যু কিছুটা কমেছে। চতুর্থ মাসে তৃতীয় মাসের প্রায় দ্বিগুণ মৃত্যু হলেও পঞ্চম মাসে এসে আগের মাস থেকে ৫৯ জনের মৃত্যু কম হয়েছে। শতকরা হিসাবে পাঁচ মাসের মোট মৃত্যুর ৩৭ শতাংশ হয়েছে পঞ্চম মাসে, ৩৮ শতাংশ চতুর্থ মাসে, ১৯ শতাংশ তৃতীয় মাসে এবং বাকি ৬ শতাংশ হয়েছে প্রথম দুই মাসে। দেখা যাচ্ছে, ৭৫ শতাংশ মৃত্যুই হয়েছে শেষ দুই মাসে। তবে শেষ মাসে নতুন রোগী শনাক্ত যেভাবে কমেছে, সেভাবে মৃত্যু কমেনি, বরং বেড়েছে। এ হিসেবে চতুর্থ মাসের চেয়ে পঞ্চম মাসে প্রায় ২০০ মৃত্যু বেশি হয়েছে।

সুস্থতার হার বেড়েছে : পাঁচ মাসে দেশে শনাক্তকৃত মোট করোনা রোগীর ৫৭ শতাংশের বেশি ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে গেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ হাজারের বেশি রোগী সুস্থ হয়েছেন শেষ মাসে, যা মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া এ মাসে নতুন রোগী শনাক্তের বিপরীতে সুস্থতার হারও যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি। এ মাসে ৮১ হাজার নতুন রোগী শনাক্তের বিপরীতে সুস্থ হয়েছেন ৬৭ হাজার। শতকরা হিসাবে সুস্থতার সংখ্যা নতুন শনাক্ত রোগীর ৮২ শতাংশ। একই হিসাবে চতুর্থ মাসে নতুন রোগী শনাক্তের বিপরীতে সুস্থ হয়েছিলেন ৫৯ শতাংশ, তৃতীয় মাসে ২৩ শতাংশ, দ্বিতীয় মাসে ১৫ শতাংশ এবং প্রথম মাসে ২৭ শতাংশ।

আইসোলেশন বেড়েছে, কোয়ারেন্টাইন কমেছে : আইসোলেশনে নেওয়া রোগীর সংখ্যা প্রথম মাস থেকেই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত পাঁচ মাসে ৫২ হাজারের বেশি রোগীকে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজারের বেশি রোগীকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে পঞ্চম বা শেষ মাসে। চতুর্থ মাসে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার রোগীকে। মোট আইসোলেশনের প্রায় ৮০ শতাংশই হয়েছে শেষ দুই মাসে। অন্যদিকে কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা তৃতীয় মাস থেকেই ক্রমান্বয়ে কমছে। দ্বিতীয় মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৪ হাজার জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছিল। সেটা কমতে কমতে পঞ্চম মাসে ৬৪ হাজারে নেমেছে।

আরও ৩৩ মৃত্যু, ২৬৫৪ শনাক্ত : গতকাল বুধবার দেশে করোনা শনাক্তের ১৫১তম দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৩৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং ২ হাজার ৬৫৪ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এদিন নিয়মিত বুলেটিনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৪টি। পরীক্ষা করা হয়েছে ১১ হাজার ১৬০টি। এসব পরীক্ষায় নতুন করে ২ হাজার ৬৫৪ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এদিন শনাক্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন আরও ৩৩ জন এবং হাসপাতাল ও বাসা মিলিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৮৯০ জন।

বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গতকাল পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ১২ হাজার ৪১৬টি নমুনা পরীক্ষায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। গড় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ হাজার ২৬৭ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৫০ জন। শনাক্তদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩২ শতাংশ ও সুস্থতার হার ৫৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

ডা. নাসিমা জানান, ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে পুরুষ ২৫ ও নারী ৮ জন। সর্বোচ্চ ১৮ জন মারা গেছেন ঢাকা বিভাগে। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে ৯, রংপুরে ৩ এবং রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে ১ জন করে মৃত্যুবরণ করেছেন। হাসপাতালে মারা গেছেন ৩১ এবং বাড়িতে ২ জন। মৃতদের মধ্যে ৩১-৪০ বছরের ২, ৪১-৫০ বছরের ৪, ৫১-৬০ বছরের ৮ ও ষাটোর্ধ্ব বয়সী ১৯ জন। বুলেটিনে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ৭৫৮ জনকে এবং হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৮৪৭ জনকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত