পাপড়ি রহমান অনেক আলোচিত তার ‘বয়ন’ উপন্যাস নিয়ে। কোনো জনপদ বা জনগোষ্ঠীকে কাছ থেকে দেখে তাদের নিয়ে উপন্যাস নির্মাণের একটি ধারায় নিরলস তিনি লিখে যাচ্ছেন। পাপড়ি রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক পাপড়ি রহমানের সঙ্গে আলাপ করেছন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
পাপড়ি আপা কেমন আছেন, কেমন কাটছে দিনকাল?
পাপড়ি রহমান: আছি কোনোরকম। দিনকাল মোটেও ভালো কাটছে না। এমন খারাপ সময়ে কীভাবে ভালো থাকা যায়, বলো? চারপাশে কোভিড—১৯ এর মৃত্যু-ফাঁদ, যে কোনো মুহূর্তে সেই ফাঁদে ধরা খেতে পারি। নিজেকে কেমন জানি কয়েদী কয়েদী লাগছে। প্রায় ছয় মাস হতে চলল বন্দী জীবনযাপন করছি। স্বাভাবিক জীবন থেকে বহু দূরে আছি। কবে ফিরতে পারব সেই আগের জীবনে জানিনা। আদৌ ফিরতে পারব কিনা সে ভরসাও পাই না।
নতুন কী লিখছেন?
পাপড়ি রহমান: করোনাকালের প্রথম দুই/তিনমাস প্রায় কিছুই লিখতে-পড়তে পারি নাই। খুব অস্থির সময় কেটেছে। পরে যখন আবার ‘ফরমাইশি লেখার’ চাপ বাড়তে থাকল, তখন খুব কষ্ট করে লেখার টেবিলে ফিরেছি। আর জানোই তো, একজন লেখকের জন্য পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কম্ম লেখার টেবিলে গিয়ে লিখতে বসা।
আর চারদিকে এত সেনসেটিভ ইস্যু উপেক্ষা করে লেখালেখি করা আরও কষ্টকর বইকি!
নতুন লিখছি দুইটা ধারাবাহিক গদ্য। একটা আমার কৈশোরিক স্মৃতিগদ্য ‘সুরমাসায়র’। এটা যাচ্ছে ‘সাহিত্য ক্যাফেতে’।
আরেকটা আমার লেখক হয়ে উঠবার জার্নাল বা জার্নি বলতে পার, যাচ্ছে ‘পরস্পরের’ ওয়েব পোর্টালে। এটার নাম ‘আমার একলা পথের সাথি’।
এগুলি ছাড়াও আছে ‘ফরমাইশি গল্প’ লেখবার চাপ। আছে বুক রিভিউ করার তাগাদা। এসবই। এসবই লিখছি টুকটুক করে।
আপনি তো খুব বেশি বয়স হওয়ার আগেই আত্মজীবনী ‘মায়াপারাবার’ লিখেছেন, এখন আবার ‘আমার একলা পথের সাথি’ লিখছেন?
পাপড়ি রহমান: হ্যাঁ লিখছি।
বেশি বয়স হলে বা বুড়ি থুত্থুড়ি হলে ‘আত্মজীবনী’ লিখতে হয় বা হবে এই ট্যাবুটা ভাঙা দরকার। বা অনেকেই বলেন, যখন একজন লেখকের লেখার আর কিছু থাকে না, তখন সে আত্মজীবনী লিখতে শুরু করে। আমার ক্ষেত্রে ব্যপারটা একেবারেই সেরকম নয়। বরং একদম উলটো।
আমি মনে করি, আত্মজীবনী বা এইরকম কিছু লিখতে চাইলে আগেভাগেই লিখে ফেলা উচিত। জানোই তো ‘স্মৃতি সততই প্রতারক’!
আর আমি চার্বাক দর্শনে বিশ্বাসী। যা অবশ্য ওমর খৈয়ামও একইভাবে বলে গিয়েছেন-
Today is thine to spend, but not tomorrow;
Counting on morrows breedeth bankrupt sorrow:
O squander not this breath that Heaven hath lent thee;
Make not too sure another breath to borrow.
[Omar Khayyam]
আমিও বর্তমানের মানুষ। আগামীকাল কী ঘটবে সেটা তো আমি জানিনা। আমি তো জানি না আগামীকাল আমি বেঁচে থাকব কি থাকব না? ফলত এইসব ভাবনা থেকেই নিজের কথা লিখতে শুরু করা।
তাছাড়া প্রতিটা মানুষের জীবনেই আছে নানান স্তর। যা অনেকটা প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলোর-খেলা দেখবার মতন। সবই কি আর লিখে শেষ করা যাবে? যায়? সবকিছু লিখে কখনই শেষ করা যায় না, যাবে না। নতুন নতুন গান-গল্প-কবিতা এসে পুনরায় জীবনপাত্র পূর্ণ করে দিয়ে যাবে।
ওই যে রবীঠাকুরের একটা গান আছে না?
আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া
মাধুরী করেছে দান
তুমি জানো নাই, তুমি জানো নাই, তুমি জানো না-ই
তার মূল্যের পরিমাণ…
‘মায়াপারাবার’ [২০১৬, নান্দনিক] ছিল আমার বালিকাবেলা-যাপন-চিত্র। এইটা লিখেছিলাম--- আমার আম্মা-চাচিমা-ফুপুরা এখনও বেঁচে আছেন। আমি যে ঘটনাগুলি প্রায় ভুলে যাচ্ছিলাম বা আবছা-আবছা মনে ছিল, সেগুলির সূত্র খুব সহজেই খুঁজে পেয়েছি আম্মা-চাচিমা-ফুপুদের কল্যাণে।
এখন আবার ‘সুরমাসায়র’ লিখছি। এটাও আমার বর্ণাঢ্য কৈশোরকালের স্মৃতিকথা। আমার ক্লাসমেটদের কাছ থেকে ভুলে যাওয়া নানা তথ্য সহজেই সংগ্রহ করতে পারছি। অনেকটা ভুলে যাওয়া পুরাতন কোনো গানের লিরিক নতুন করে মনে করিয়ে দেবার মতো।
আর ‘আমার একলা পথের সাথি’ লিখছি মূলত নারী লিখিয়েদের জন্য। বা যে মেয়েটি লেখক হবার সদ্য-স্বপ্ন দেখছে তার জন্য। যারা ‘সিরিয়াসলি সাহিত্য’ করতে চায়, তাদের কাছে আমি আমার সেই কষ্টকর, অমসৃণ ও দীর্ঘ জার্নির কথা অকপটে বলতে চাই। এতে করে সামান্য হলেও তারা যেন ভরসা পায়। যেন তারা বহু দিকের বহু পতন ও বহু রাজনীতি দেখে ঘাবড়ে না যায়। তারা যেন জানতে পারে, উদ্যম ও অধ্যবসায় থাকলে একদিন ‘ভালো লেখার’ সেই সুউচ্চ চূড়াটা ছুঁয়ে ফেলা যায়। এ ছাড়া আরেকটা বিষয়ও আছে, লেখালেখির-জীবনে যাদের কাছে আমার অনেক ঋণ জমে আছে, এই লেখক হবার জার্নালে আমি তাদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা জানিয়ে রাখতে চাই। কিংবা যারা আমাকে খামাখাই বারবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল, যাতে আমি আর উঠে দাঁড়াতে না-পারি। হোঁচট খেতে খেতে যেন লেখাটাই একদিন ছেড়ে দিই সেসব নোংরা রাজনীতির কথাও বলে যেতে চাই।
ওই যে আগেই বলেছি... আজই জীবন। আগামীকাল বলে কিছু নাই। আমার কাছে আগামীকাল মানে থইথই-অন্ধকার।
আপনার বয়ন (২০০৮) আর পালাটিয়া (২০১১) নিয়ে আমি রিভিউ লিখেছিলাম। কথাও হয়েছে আপনার সঙ্গে। আপনি বলছিলেন, একটা উপন্যাস লিখতে আপনার তিন বছর সময় লেগে যায়। এবং আপনি এসব জায়গায় গিয়েছেনও। এই যে কায়িক শ্রম, উপনাস লেখার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিটা আপনি বেছে নিলেন কেন?
পাপড়ি রহমান: হ্যাঁ বলেছিলাম। আর সেসব কথা সত্যও বটে।
প্রথমত আমি সবকিছুর জন্যই কঠোর পরিশ্রম করতে চাই। কারণ আমি জানি-
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম-
সে করে না বঞ্ছনা…
এই মোটো ছাড়া আরও নানা কারণ এতে যুক্ত রয়েছে। যেমন ধর, আমি ‘তাজমহলের’ বর্ণনা লিখব তাজমহল দেখে এলে আমি যে চিত্র আঁকতে পারব, তা কিন্তু তাজমহলের কোনো থিউরি থেকে আঁকা সম্ভব নয়।
আর উপন্যাস আমার কাছে বড়ই সাধনার বিষয়। শুধু উপন্যাসই বা বলছি কেন? লেখালেখির কাজটাই আরাধনা না থাকলে খুব বেশি এগোতে পারা যায় না। যাবে না।
আমি উপন্যাস লেখার নামে ‘ফাজলামো’ করতে চাই না। রামসামযদুমধু এক করে গোঁজামিল দিতে চাই না। আবার শুধু নারী-পুরুষের মিলন-বিরহ, প্রেম-পরকীয়াকেই উপজীব্য করতে চাইনা। বা নারীদের সেই চিরকালের হাহাকার-কান্না-দীর্ঘশ্বাসও পাঠকের কাছে ডেলিভারি দিতে চাই-না। দেখবে, এইখানের বেশিরভাগ উপন্যাসে এইগুলাই থাকে। স্বামী ধোঁকা দিচ্ছে বা স্ত্রী দিচ্ছে স্বামীকে, প্রেমের জন্য আর্তি, শুধুমাত্র দেহজ কামনা-বাসনা, এমনকি খুনখারাবি পর্যন্ত! কেন এসব হরহামেশাই আনতে হবে নিজের লেখনীতে? আমার তো মনে হয়, অন্যের প্রেম ছাড়াও কিন্তু নিজের জীবন চালানো যায়।
ইদানীং দেখছি ইতিহাসের মমি ঘেঁটে উপন্যাস লিখলে চারপাশ থেকে বেশ বাহবা জোটে। আমি সেরকম উপন্যাসও লিখতে চাইনা।
ইতিহাস তো ইতিহাসের পাতাতেই রয়েছে। সেই পাতাগুলি কেটে এনে নিজের গ্রন্থকে মুড়ে দেবার কোনো মানে হয় না। আমি কেন সম্রাট বাবর বা অশোক বা ইলতুতমিশের ইতিহাস ঘেঁটে উপন্যাস লিখতে যাব? তাদের নিয়ে জানতে হলে তো ইতিহাসের বই-ই আছে। আমি নতুন কিছু লিখব। নতুন নতুন চরিত্র, নতুন স্থান আর একেবারে আনকোরা ঘটনা, লিখব আমার নিজের দেশ নিয়ে, নিজের জাতি নিয়ে। ইতিহাস নিয়ে যদি লিখতেই হয়, আমি লিখব আমার নিজ জাতির ইতিহাস। লিখব নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে। আমি লিখব আমার সময়কে---যাতে এক শ বছর পরে কেউ পড়লে জানতে পারে আমাদের সময়টা কেমন ছিল?
একটা ক্ল্যাসিক উপন্যাসে অবশ্যই ভৌগলিক পরিবেশ সুস্পষ্ট করে থাকা জরুরি। জরুরি চরিত্রগুলির সঠিক রূপায়ণ ও সমাপ্তি। আর তাতে লেখকের নিজস্ব চিন্তাজাত কিছু দর্শনও থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। আবার এই দর্শন চরিত্রগুলির মাঝ দিয়েই প্রকাশিত হওয়া দরকার। যাত্রাপালার বিবেকের মতো লেখক যেন নিজের দর্শন জানাতে নিজেই মাঝেমাঝেই হাজির হয়ে না যান। কেবল ইমাজিনেশন দিয়ে কতদূর আগানো যায়, বল? কতদূর আগানো যাবে?
তুমি যখন একটা নদীর বর্ণনা দেবে, নদী না দেখলে তা কী করে দেয়া সম্ভব? তুমি ঢেউ দেখোনি, ঢেউয়ের শব্দই শোনো নাই, তাহলে সেসব লিখবে কীভাবে?
আমি মনে করি ৫০% প্র্যাকটিক্যাল আর ৫০% থিউরিটিক্যাল দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব।
‘বয়ন’ [২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স] যখন লিখেছি আমি মুগরাকুলের তাঁতিদের জীবনাচার ভালো করে দেখে এসেছি। দেখেছি তাদের জামদানি শাড়ির বুনন কৌশল। কীভাবে তারা শাড়িতে বুটা তোলে নকশা ফুটিয়ে ওঠায়? দেখে এসেছি বলেই না সেসব হুবহু লিখতে পেরেছি। নইলে পুরো বিষয়টাই হয়তো অন্ধের হাতি দর্শনের মতো হয়ে যেত।
অনেককেই দেখি, ইমাজিনেশন ইমাজিনেশন করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। যে কোনো লেখাতেই ইমাজিনেশন থাকে। থাকবেই। কিন্তু তার সঙ্গে নিজস্ব অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে তা ক্ল্যাসিক হয়ে উঠতে পারে। ক্ল্যাসিক না হলেও ‘হয়ে ওঠার’ সম্ভাবনাটা অন্তত থাকে।
আপনার আরো কিছু রিভিউ আসলে আমি করেছি। এর মধ্যে নির্বাচিত ছোট গল্পের রিভিউও করেছি। সেখানে আমি বলেছি উত্তর উপনিবেশিক লেখকদের একটা ধারা আছে আপনার মধ্যে। এই ধারাটা আফ্রিকা বা লাতিন সাহিত্যেও আছে বলেছি। শহর বা নিজের আশপাশ ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়া, সেখানে বিভিন্ন 'ঐতিহ্যকে' তুলে ধরার সাহিত্যকে আমি এভাবে দেখাতে চেয়েছি। এটা আপনার মধ্যে কীভাবে এল?
পাপড়ি রহমান: আমার একেবারে প্রথম উপন্যাস ‘পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ’ ছাড়া তুমি আমার প্রায় সবকটি উপন্যাস ও নির্বাচিত গল্পবইয়ের রিভিউ করেছিলে। তুমি যেসব বিষয় আমার লেখা থেকে ফাইন্ড-আউট করেছ, সেসবেরও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কার্যকারণ রয়েছে।
নব্বইয়ের শুরুর দিকে যখন আমি মাস্টার্স শেষ করে সিরিয়াসলি লিখব বলেই সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন কিন্তু আমার খুব ভালো করে লাতিন, আফ্রিকান বা ক্যারিবিয়ান সাহিত্য পড়া হয় নাই। মার্কেজ বা অ্যাচেবে তেমন পড়া হয় নাই। কিংবা বোর্হেস, টনি মরিসন বা নাডিন গর্ডিমার।
আমার বালিকাবেলার কিছুটা সময় গ্রামে কেটেছে। ফলে গ্রামের প্রতি আমার ভালোবাসা কিন্তু নিঁখাদ। এইখানে মেকি কিছু নাই। আর আমি আমাদের লোক-ঐতিহ্যের প্রতি বরাবরই দূর্বল। এটা হয়েছিল ওই বালিকাবেলার ‘বারুণীর মেলার’ হাতি-ঘোড়া-পুতুল, বিন্নীরখই-মুড়কি-মুড়ালি ইত্যাদির প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ থেকে। আর আমাদের বাড়ির মানুষজনের এই গ্রাম-ঐতিহ্যের প্রতি বেশ আহ্লাদ ও আগ্রহ ছিল। আমার দিদি আমাকে মাটির পুতুল কিনে দিত। মাটির হাতি-ঘোড়াও দিত। কাঁচের চূড়ি। আর আমার দাদা প্রফুল্ল চিত্তেই সাজ-বাতাসা-কদমা-জিলাপি পোটলা ভরে কিনে আনত। আমার ফুপুদের দেখতাম ‘পাটের শিকা’র প্রতি আগ্রহ। আমার দাদার এক চাচাতো বোন---ফচা দিদিকে দেখতাম তালগাছের পাতা ছেঁটেছুটে তালপাখা বানাচ্ছে। তালগাছের কাণ্ডের আঁশ দিয়ে অত্যন্ত নান্দনিক ফুলদানি বানাতে দেখেছি তাকে। বাঁশের নানান তৈজসও সে বানাতে পারত। যেহেতু আমার আম্মা কিছুটা শহুরে মানুষ ছিল, আম্মার কুরুশ কাঁটা বা উল বোনার চাইতে আমার ফচা দিদির সুতা আর কাঠি দিয়ে মাছ ধরার জাল বোনা দেখতে ভালো লাগত। সেই জাল ছড়িয়ে আমার চাচারা নিজেদের পুকুরের এন্তার মাছ ডাঙায় তুলে আনত।
আম্মার লেদারের স্যুটকেসের চাইতে গেরস্থবাড়ির [যেসব বাড়িতে যাওয়া আমাদের জন্য নিষেধ ছিল] বউদের বড় বড় রঙচঙে-ফুল-আঁকা টিনেরতোরঙ্গ আমাকে অধিক আকর্ষণ করত। এসব হয়তো হয়েছিল আমি যে জীবনের ভেতরে থেকে বড় হচ্ছিলাম, তা আমার কাছে নিতান্তই একঘেয়ে ছিল। আমি অন্যদের ওই মাটি ছানাছানি করা জীবনের প্রতি প্রলুব্ধ ছিলাম।
একটা কথা কী জানো, যে যা-ই করবে বা যা-ই লিখবে, সেসবের প্রতি সত্যিকার দরদ না থাকলে কিছুই সফলতা পাবে না। সফলতা আসবে না। আর মেকি বিষয়টা খুব সহজেই ধরা যায়। বুঝাও যায়। কোনটা মেকি তা পাঠক ঠিক ঠিকই ধরে ফেলে, কারণ সত্য হলো পাঠক লেখকের চাইতে বরাবরই বুদ্ধিমান।
আমার ছোটফুপু ও দিদিরও লোক-ঐতিহ্য নিয়ে ভালোরকম মাতামাতি ছিল। এই দুজনকেই নানা সময়ে নানা কিছুর সঙ্গে সেঁটে থাকতে দেখেছি। এমনকি চুড়ির ঝাঁকা মাথায় নিয়ে আসা সেই ব্ল্যাক-ডায়মন্ড টাইপ বেদেনিদের, যাদের কোমরের খাঁজ ছিল ঠিক খাপখোলা তলওয়ারের মতো, তাদের সঙ্গেও আমার দিদি-ফুপুর গাঢ় মহব্বত ছিল। যা আমাকে চিরকালই আকৃষ্ট করেছে।
আমি দিদির সঙ্গে সঙ্গে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, শাপলা-শালুক চিনেছি। চিনেছি ঢ্যাপের খই। পুকুরের জলে ভেসে থাকা গাঙকলা আর কামরাঙাফুলের রঙ। শিখেছি শিউলিফুলের শুকনা-বোঁটা গরম জলে ফেলে কীভাবে ভেজিটেবল-ডাই বানানো যায়।
আমি এসব চিরকালই ভালোবেসেছি বলেই হয়তো আমার লেখায় সেসবই ঘুরেফিরে এসেছে।
তাছাড়া আমি নিজেও চেয়েছি আমার শেকড়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকতে।
যার ফলে ‘আন্না কারেনিনার’ চাইতে আমাকে ময়মনসিংহ গীতিকার সেই ‘কাজলরেখা’ বেশি টেনেছে। বা ‘লারার’ চাইতে মহুয়া বা দেওয়ানা মদিনার পালা।
আপনার লেখায় শুরুর দিকে বোধহয় সেলিম আল দীন আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রভাব আছে। বিশেষ করে আপনি একটা গাছের সঙ্গে বা ফুলের সঙ্গে একটা নারীকে এমনভাবে উপন্যাসে নিয়ে আসেন, যেগুলা সেলিম আল দীনের লেখায় আমি দেখেছি।
পাপড়ি রহমান: আমি ঠিক জানি না এ রকম কোনো প্রভাব সত্যি আছে কিনা? এটা আমার পাঠকরাই ভালো বলতে পারবেন। আমি অবশ্য শুরু থেকেই ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, মানিক, জগদীশ গুপ্ত আর বিভূতির নিবিড়-পাঠক ছিলাম। পরবর্তীতে হাসান আজিজুল হক , আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, নবারুণ ভট্টাচার্য্ আর সুধীর চক্রবর্তী--- এরা আমাকে একেবারে গ্রাস করে ফেলল। এদের সবার প্রায় বই-ই আমি খুব ভালো করে পড়েছি বা পড়তে চেয়েছি। তবে এদের তুলনায় আমি সেলিম আল দীন সামান্য কম পড়েছি। ওনাকে পড়ার চাইতে উনার নাটকগুলি আমি বেশি দেখেছি।
ওনাদের কিছু প্রভাব যদি থেকেই থাকে, সেসবও হয়তো আমি সচেতনভাবে করিনি বা করছি না। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃতি ছাড়া মানুষের আর কিছুতেই উদ্ধার নাই। মানুষকে বারবারই যেতে হয়, ফিরতে হয়, হবে প্রকৃতির কাছেই। এমনকি তার শেষ আশ্রয়ের জন্যও।
আর শুধু উপন্যাসে নয়, এই কাজগুলি আমি আমার গল্পেও প্রচুর করি বা করেছি। এগুলিকে এক অর্থে জীবনের কঠিন রূঢ়তা থেকে পলায়নও বলতে পার। যা আমি পাঠককে সরাসরি দেখাতে চাইছি না, কিন্তু না দেখালেও স্বস্তি পাচ্ছি না। এইরকম ক্রিটিক্যাল বিষয়গুলি সেইসব আমি কোনো বৃক্ষ বা ফুলের মাধ্যমে পাঠকের সন্মুখে হাজির করছি।
আমার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’তেও [২০১৯, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স] সেটা আমি করেছি। আদতে আমি পালিয়েছি। ‘রেফুল’ নামের এক চরিত্র, যার এক বছরের ছোট বোনটা আঁতুড়েই মারা যাওয়াতে রেফুলের মা তাকেই দোষারোপ করে। বলে যে, রেফুলের জন্যই তার বাচ্চাটা মারা গিয়েছিল। অথচ তখন রেফুলের বয়স মাত্র এক বছর! এক বছরের একটা শিশু কী করে তার বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে পার? ভেব না, এসব শুধু আমার ইমাজিনেশন। এগুলা আমাদের সমাজে আমি বাস্তবেই দেখেছি। এক্ষণে আমার কী করণীয়? আমি রেফুলের ছোটবোনটার নাম দিলাম ‘নিমফুল’। মায়ের দেয়া মিথ্যা গঞ্জনা থেকে বাঁচাতে, স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচাতে রেফুলকে সারা উপন্যাসেই আমি একটা ‘নিমগাছের’ পাশে রাখলাম। শ্বেত-শুভ্র ‘নিমফুলের’ সুবাসে রেফুলের অন্তহীন বেদনাকে নিমজ্জিত করে দিলাম। এ ছাড়া আমি আর কিবা করতে পারতাম? রেফুলকে দিয়ে তো আমি তার মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াতে পারতাম না?
বা আমার গল্প ‘নারী ও নাশপাতি বিভ্রাটেও’ আমি সেই প্রতারিত নারীকে বৃক্ষই বানিয়ে দিয়েছি। বা ‘জলঘাস ও মেঘের সংহরণ’ গল্পেও।
মানুষের যত অন্ধকার আর অসহায়ত্ব সবই প্রকৃতির কাছেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। প্রকৃতিই সমস্ত দায়ভার সামলাক না এ ছাড়া একজন অতি সেনসেটিভ লেখক আর কিইবা করতে পারে? কিইবা করার থাকে তার?
আপনার লেখায় 'ফেমিনিন' একটা ব্যাপার আছে। এটা নারীবাদ বলে মনে হয়নি। মেয়েলি বলতে যা বুঝায় সেটা মনে হয়েছে। নারী বা নারীস্বভাব বিষয় এভাবে দেখাটা বাংলা সাহিত্যে কমই আছে। নারীপ্রধান উপন্যাস কি সচেতনভাবেই তৈরি করেন?
পাপড়ি রহমান: এইটা তোমার একটা জটিল প্রশ্ন! ভাবছি ‘নিন্দার কাঁটা‘ গায়ে না বিঁধিয়েও কীভাবে এই প্রশ্নের জবাব দেয়া যায়?
আমি যেহেতু নারী, সেহেতু ফেমিনিন ব্যাপারটা থাকতেই পারে। কিন্তু ‘মেয়েলি’ এই বিষয়টাতে মনে হয় সামান্য ঘাপলা আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে। আমার প্রথম গল্পের বই ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ প্রথম আলোর ‘সেরা ১০ তরুণের নির্বাচনে’ নির্বাচিত হয়েছিল। সেখানে কবি কামরুল হাসান আলোচনায় বলেছিলেন---পাপড়ির লেখায় কোনো মেয়েলীপনা নেই!
তার মানে এই ‘মেয়েলি’ ব্যাপারটাকেই হয়তো নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়!
এখন এই ‘মেয়েলি’ শব্দটাকেই তুচ্ছাতিতুচ্ছ রূপেই ব্যবহার করা হয় হয়তো। অবশ্য নারীদের বিষয়ে যত খারাপ শব্দ বা গালি ব্যবহার করা হয়, এর বেশিরভাগই পুরুষ কর্তৃক সৃষ্ট! ‘মেয়েলি’ বলতে তারা যে কী বুঝায় ঈশ্বরই তা জানেন।
তুমি হয়তো এইটা নেতিবাচক অর্থে বলো নাই। বলতে কি চেয়েছ--- নারী ন্যারেটর? বা নারীর পয়েন্ট অব ভিউ? হ্যাঁ, সেটা থাকতেই পারে। আমি একজন নারীর দৃস্টিভঙ্গি থেকেই লিখতে চাই। পুরুষদের ভাবভঙ্গী নকল করে বা তাদের দৃস্টিভঙ্গি থেকে লিখতে চাই না।
আর নারীবাদ নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু ধ্যানধারণা আছে। যেমন আমি নারীবাদ মানে পুরুষের ওপর প্রবল আধিপত্য বিস্তার বা অ্যান্টি-মেল বুঝি না। কারণ আমি জানি মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীন। ফলত ব্যারিয়ার দিয়ে কিছুই আটকে রাখা যায় না, যাবে না। নারীবাদ বলতে আমি বুঝি---একটা রাজ্যের তুমি/আমি সমান ভাগীদার। আমি নারীবাদ মানে পলিগ্যামি বা অ্যাডাল্ট্রি বা ওপেন স্মোকিং বুঝিনা। কেউ চাইলে স্মোক করতেই পারে, সেজন্য তাকে নারীবাদের তকমা নিতে হবে কেন? কেউ চাইলে ড্রিঙ্ক করতেই পারে এতে এত উচ্চকিত হবার কিছু নাই। ‘অশ্লীল’ পোষাক পরলেই কেউ নারীবাদী হতে পারে না। আমার কাছে নারীবাদ মানে আমার ভেতরের স্ট্রেন্থ। আমার ভেতরের আলোকিত চেতনা, যাতে তুমি আমাকে হেয় না করে আমাকে তোমার সমান ভাবো। ভাবো, তোমার পাশের চেয়ারটিতে বসার জন্য আমিও উপযুক্ত। ভাবো, তোমার মতো যে কোনো কাজের জন্য আমিও সমান যোগ্য।
আমাকে ‘নারীবাদী’ না বলে বরং ‘মানববাদী’ বললেই যথার্থ হয়।
আর হ্যাঁ, আমি উপন্যাসে মোটামুটি নিউট্রাল একটা ভিউ থেকেই চরিত্র সৃষ্টি করি। যাতে নারী-পুরুষ সমান গুরুত্ব পায়। আমার কোনো উপন্যাসই ‘নারীপ্রধান’ নয়। সেটা ‘পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ ‘ [ ২০০৪, মাওলা ব্রাদার্স], ‘বয়ন’[ ২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স], ‘পালাটিয়া’[২০১১, মাওলা ব্রাদার্স] এই তিন উপন্যাসেই আমি নারী-পুরুষ চরিত্রে সমতা রাখার চেষ্টা করেছি।
শুধু ‘নদীধারা আবাসিক এলাকায়’ [২০১৯, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স] আমাকে নারী চরিত্রদের প্রতি অত্যধিক মনোযোগী হতে হয়েছে। কারণ আমি যে কম্যুউনিটি নিয়ে উপন্যাসটা লিখেছি তাতে নারীদের প্রধান না-করে উপায়ও ছিল না। উপন্যাসের থিমটাই ছিল নারীকেন্দ্রিক। আমি ফিল্ডওর্য়াক করে যেমন দেখেছি, তেমনই লিখতে চেয়েছি। আমার অন্যসব উপন্যাসের মতো এটাও অচেনা এক জনপদের গল্প।
এখন তো লেখা প্রকাশ করার জন্য অনলাইনে অনেকগুলো মাধ্যম আছে। আগে যখন সেগুলো ছিল না, লেখা প্রকাশ নিয়ে আপনাকে কী কী স্ট্রাগলে পড়তে হয়েছিল?
পাপড়ি রহমান: এটা একটা ভালো প্রশ্ন। একথা তো সত্য যে, এখন অনেক মাধ্যম আছে। আর কিছু না থাকুক নিজের একটা পেইজ বা ফেইসবুক প্রোফাইল অন্তত আছে। আমি যদি কোথাও লেখা না-ও দেই, শুধু নিজের টাইমলাইনে দিলেও বেশ কিছু লোক তা পড়তে পারছে।
আমি বরাবরই একটু ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের মানুষ, যেজন্য কোনো সম্পাদকের টেবিলে গিয়ে লেখা ছাপার জন্য ধর্ণা দেইনি। এখন অবশ্য প্রেক্ষাপট ভিন্ন ‘ফরমাইশি লেখার’ চাপে টেবিল থেকে মাথাই তুলতে পারি না। তবে ওই সময় আমি আমার বেশিরভাগ লেখা ডাকযোগেই পাঠাতাম। কুরিয়ার সার্ভিস আসার পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে। তখন যেটা ছিল সেটা ‘অপেক্ষার যন্ত্রণা’। কখন লেখা ছাপা হবে এই নিয়ে ছটফটানিতে ভোগা।
সম্পাদকদের ‘কূটচালে’ আমি কমই পড়েছি। কারণ যে-ই একটু ভুজুংভাজাং করেছে বা আমাকে অসম্মানিত করার চেষ্টা করেছে আমি সেখানে কোনোদিনই আর লেখা পাঠাইনি।
এসবের বাইরেও আমি সবসময়ই চুজি এবং সিলেক্টিভ। মানসম্মত পত্রিকা ছাড়া লেখা দেইনি বা এখনও দেই না।
তবে নারী লেখকদের আরেকটু অন্যরকম স্ট্রাগলের মাঝ দিয়ে বোধহয় যেতে হয়। যদিও এখন অজস্র ওয়েবজিনের জোয়ারের কাল। কিন্তু তা-ও অবস্থা তেমন বদলেছে বলে মনে হয় না। কারণ এখনও কিন্তু বেশিরভাগ সম্পাদকই ‘পুরুষ’! তবে ভরসার কথা, এখন কাউকেই আর তেমন কোনো সম্পাদক দ্বারা লেখা ছাপার আশায় বসে না থাকলেও চলে। আমাদের কালের সম্পাদকদের মতো তেমন কোনো সম্পাদকও আমার নজরে পড়ে নাই, যার পত্রিকায় লিখতে পারলে বিমল আনন্দ পাওয়া যেতে পারে।
আর আমার লেখক হয়ে ওঠার স্ট্রাগলের কথাই অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘পরস্পরে’ আমার জার্নাল ‘আমার একলা চলার সাথিতে’ বলে চলেছি।
সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে কতটা ভাবেন আপনি, নিজেকে কি বঞ্চিত মনে হয় পুরস্কার পাওয়া থেকে?
পাপড়ি রহমান: আমার উপন্যাস ‘বয়ন’ লেখার আগ পর্যন্ত পুরস্কার নিয়ে ভেবেছি। এখন একদম ভাবি না। কারণ আমি জানি পুরস্কার পাওয়ার পথঘাট আমি ভালো চিনি না বা এখন চিনতেও চাই না। আর এখন বা তখনও বেশিরভাগ সাহিত্য পুরস্কারই এক ধরণের ‘ সাহিত্য-রাজনীতি’! সেই সঙ্গে ‘গোষ্ঠী প্রীতি’। একদম ‘ফেয়ার পুরস্কার’ খুব কমই আছে। তুমি তো জানো, আমি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লেখক নই। আমার কোনো দল নাই বা আমি কোনো দলে যুক্তও নই।
কলকাতা থেকে ‘ঐহিক সম্মাননা’ [২০১৭] পেয়ে অত্যন্ত অবাক হয়েছিলাম। সেই সঙ্গে বেদনাক্রান্তও খানিকটা ছিলাম নিজের দেশের আগে একটা প্রতিবেশী দেশ আমাকে আমার লেখালেখির জন্য সম্মাননা জানাল বলে।
এবারে বাংলা একাডেমি পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ পুরস্কার’ [২০২০] পেয়েও আমি অবাক হয়েছি। কেন এবং কীভাবে পেলাম এটাও আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে।
আর কোনো ‘পুরস্কার’ যদি সত্যিই হয় উত্তম-লেখা বিচারের মানদণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে আমি নিজেকে ‘পুরস্কার রাজনীতির শিকার’ বলে মনে করি। বঞ্ছিত ঠিক নয়।
বই বিক্রি দিয়ে আলোচনা শেষ করতে চাই আপাতত। অনেক বই বিক্রি হয় এমন লেখকদের আপনি কীভাবে দেখেন? তাদের সঙ্গে কম বই বিক্রি হওয়া সাহিত্যের পার্থক্য মূল্যায়ণ করেন কীভাবে?
পাপড়ি রহমান: এটা আদতে নিরূপণ করা একটু কঠিনই। মিডিয়ার কল্যাণে অনেক ট্র্যাশ বইও প্রমোট হয়ে যায়। এবং কিছু ভালো বই চলে যায় আড়ালে। আবার অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ব্যবসার খাতিরে প্রকাশকও ট্র্যাশ বইয়ের প্রচার-প্রসার ঘটান। লেখক নিজেও এতে যুক্ত থাকেন।
যেমন ধর, শহীদুল জহিরের বই বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বই আগে তেমন হয়তো বিক্রি হতো না। এত বছর পরে উনাদের বইয়ের বিক্রির অবস্থা আমার কাছে তো ভালোই মনে হয় । তার মানে সিরিয়াস বইয়েরও এখন অনেক পাঠক আছে। তাছাড়া এখানে অন্তর্জালেরও কিছুটা ভূমিকা রয়েছে। আগে আমি পত্রিকা দেখে বইমেলার ভালো বই সিলেক্ট করে কিনতাম। এখন ফেসবুক থেকে সিলেক্ট করি, কার কার বই আমি কিনব বা কিনব না? আমার মতো অনেকেই নিশ্চয়ই তা করেন। এতে করে পত্রিকাওয়ালা বা টিভিওয়ালাদের স্বজন প্রীতির প্রজেক্টে সামান্য হলেও ভাটা নামার কথা। তারা যা খাওয়ানোর চেষ্টা করছে পাঠক কিন্তু এখন আর সেসব অন্ধের মতো খাচ্ছেন না। বা তাদের দেখানো পথেও আর আগের মতো হাঁটছেন না।
ফলত বই বেশি বিক্রি দিয়ে ভালো লেখক নির্বাচন করা যেমন কঠিন, কম বই বিক্রি দিয়েও সেটা কঠিনই। আর হজুগে বাঙালি কিছু একটা শুনল তো দৌড়াতে থাকে সেদিকেই। এ ধরণের বেশিরভাগ পাঠকের নিজস্ব বিবেচনাবোধ একেবারেই নাই। যেমন তুমি কিন্তু চাইলেও আমাকে আমার রুচির বাইরের কোনো বই পড়াতে পারবে না। কিন্তু অন্যের বেলায় হয়তো সেটা পারবে।
তবে এর আগেও দেখেছি ট্র্যাশ বইয়ের প্রতিই আমপাঠকের ঝোঁক একটু বেশিই থাকে। কেইবা বা এত কষ্ট করে আমাদের কঠিন কঠিন বাক্য, দর্শন-ধোঁয়াশায় কুজ্ঝটিকা-কুহেলী জীবনের সঠিক চিত্র পড়তে যাবে?
আমপাঠকের হালকা-পলকা পাঠই বেশি মনে লাগার কথা। ভারী কথাবার্তা পড়ার মতো, বা গভীর মননিবেশের সময় কই তাদের? কারণ তাদের হাতের ‘রাক্ষুসী’ স্মার্টফোনটি তো টিং টিং করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েই চলেছে। সেদিকে মন না-দিয়ে ক্ল্যাসিক বইয়ের পাতা উল্টাবার টাইম কই তাদের?
আর মনকে পুরোপুরি নির্ভার রাখতে হলে তো ট্র্যাশই উত্তম। হালকার ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেলে মনটাও ফুরফুরে রাখা যায়। ‘নদীধারা আবাসিক এলাকার’ বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী নানা পেশার নারীদের নিত্য হাহাকার , নিত্যবঞ্চনা আর প্রতিশোধের মৃত্যু দেখার চাইতে, শোনার চাইতে কোনো মেয়ের সঙ্গে কয় রাত কাটানো গেল বা ছিঁচকাঁদুনে মেয়েদের নানান নখরার কাহিনী, বা পুরুষের পরকীয়াজনিত উদ্দামতা, স্ত্রীজনিত অবসাদই কি আমাদের আমপাঠকের জন্য উত্তম নয়?
