করোনা পরিস্থিতিতে ৪ মাস পর খুলছে নিয়মিত আদালত

ক্ষতি পোষাতে অবকাশ ছুটি বাতিলের পরামর্শ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২০, ০৬:৫০ এএম

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে চার মাসেরও বেশি সময় নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধ থাকার পর ফের সরব হচ্ছে উচ্চ ও বিচারিক আদালত। বিরূপ এ সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তাদের মতে, এমনিতেই বছরের পর বছর মামলাজট আদালতের নিত্যসঙ্গী। একই সঙ্গে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রার্থীদের হতাশা ও দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। টানা চার মাস নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচার বিভাগের যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনাকালীন আদালত অঙ্গনে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালনের মতো বিষয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মামলার শুনানিতে ঘন ঘন মুলতবির আবেদন অগ্রাহ্য, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (অলটারনেটিভ ডিসপুট রেজুলেশন বা এডিআর) ওপর গুরুত্ব দেওয়া, উচ্চ ও অধস্তন আদালতের অবকাশ ছুটি বাতিল, দ্রুত বিচারক নিয়োগ, বিচারসংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতাসহ সমন্বিত পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ সম্ভব।

১৩২ দিন পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৫ আগস্ট থেকে দেশের সব বিচারিক আদালতে শুরু হয়েছে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম। এজন্য কঠোর স্বাস্থ্যবিধি পালনের নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভায় আগামী সপ্তাহ থেকে উচ্চ আদালতে শারীরিক উপস্থিতি ও ভার্চুয়াল দুভাবেই বিচারকাজ চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘ সময় বিচারকাজ বন্ধ ছিল। মামলার জট এমনিতেই আছে। আবার এই কয়েক মাসে আরও নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। এগুলোও শুনানির জন্য আদালতে আসবে। যে ক্ষতি হয়েছে এখন আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বা মধ্যস্থতা পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের এমন কিছু মামলা থাকে যা এ পদ্ধতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এর সুফলও মিলেছে। এর লাভটা হচ্ছে এ পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। আদালতের চাপও কমে আসবে, সুফলও মিলবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে মামলা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই শুনানি মুলতবির ঘন ঘন আবেদন হয়। এতে করে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় বেশি লাগে। আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া মুলতবির আবেদন অগ্রাহ্য করতে হবে। মামলা একবার চলতে থাকলে বিরতিহীনভাবে তা চালাতে হবে।’

এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করে তাহলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করতে পারেন এবং যে ক্ষতিটা হয়েছে তা কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। কেননা আমরা কিন্তু এখনো সংকটের মধ্যে আছি। এ পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগ যদি সঠিকভাবে না চলে তাহলে সেটি আমাদের কারও জন্য শুভ হবে না।’

সনাতন পদ্ধতির বিচারকাজ পরিবর্তনের সময় এসেছে উল্লেখ করে এ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘নিম্ন আদালতে কোনো কোনো ফৌজদারি মামলায় একই ঘটনায় একই ব্যাপারে ২৫ থেকে ৩০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়, যেটি অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় এবং এতে সময়ক্ষেপণ হয়। শুধু গুরুত্বপূর্ণ ও চাক্ষুষ সাক্ষীদের সাক্ষ্য নিয়েই মামলা নিষ্পত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে যারা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) তৈরি করেন তাদের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে যে অযথা মামলার সাক্ষীর সংখ্যা যেন না বাড়ে।’

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি সামলাতে অধস্তন আদালতে কিছু বিচারক নিয়োগ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও বিচারক বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিচারকরা তাদের দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি খুরশিদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এ চার মাসে পিছিয়ে পড়েছি। এটা শুধু আমাদের ক্ষতি নয়, পুরো পৃথিবীর ক্ষতি। তবে আশা করা যায় এটি থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে শুনেছি উচ্চ আদালতে যে ভ্যাকেশন (অবকাশকালীন ছুটি) সেগুলো থাকবে না। এ সময়েও মামলার কার্যক্রম চলবে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ এবং অবশ্যই যৌক্তিক। আমার মত হলো, আদালতের কর্মঘণ্টার একটি মিনিটও নষ্ট না করে সময়টুকু পুরোপুরি ব্যবহার করতে হবে। কোনো মামলায় আইনজীবীদের পারতপক্ষে সময়ের আবেদন না করাই ভালো। এ নিয়ে আইনজীবীদেরও তৎপর হতে হবে যাতে বিচারপ্রার্থীরা আইনি সেবাটুকুর নিশ্চয়তা পায়। এছাড়া আমরা চাইব বিচারকাজের সুবিধার্থে রাষ্ট্র যেন আরও বিচারক নিয়োগ দেয়।’

এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা নিশ্চয়ই নেবে। বিষয়টি অবশ্যই তাদের চিন্তাভাবনায় থাকবে। করোনায় শুধু বিচার বিভাগের নয়, সব ক্ষেত্রেই ক্ষতি হয়েছে এবং এটি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ অবশ্যই বিষয়টি ভেবে দেখবেন এবং এটি খুব একটা কঠিন কাজ হবে না বলে আমি মনে করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত