একজন করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগীর দেহে সাধারণত জ্বর, শীত শীত অনুভূত হওয়া, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাংসপেশি-মাথা-গলা ব্যথা, ঘ্রাণ ও স্বাদের অনুভূতি লোপের মতো তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদি উপসর্গ দেখা গেলেও মানবদেহে করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো চলছে নিরন্তর গবেষণা। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এ যাবৎ শতভাগ নিশ্চিত হতে পারেননি, তবু ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, কোরিয়া ইত্যাদি দেশে বেশ কয়েকটি জরিপে করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। মানবদেহে করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে শারীরিক ও মানসিক দুভাবে ভাগ করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রভাব
করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গগুলো সাধারণত দুটি কারণে প্রকট হয় বলে মনে করা হয়, একটি হলো শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত কমে যাওয়া এবং অপরটি হলো সাইটোকাইন স্টর্ম। করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের জন্যও এই কারণ দুটিকে দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুসফুসের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, বৃক্ক, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতিও করোনার জটিলতার শিকার হতে পারে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব ব্যক্তি মৃদু সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের চেয়ে মাঝারি ও তীব্র সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভোগার সম্ভাবনা বেশি। করোনাভাইরাস ফুসফুসে ভাইরাল নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে, যা প্রাথমিকভাবে প্রশমিত করা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ফুসফুসে পালমোনারি ফাইব্রোসিসের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে রোগী স্থায়ী ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, কাশি, ক্লান্তিবোধ, সক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদিতে ভুগতে পারেন। গত মার্চ মাসে চীনে এক জরিপের ফলাফলে দেখা গিয়েছে, সেরে ওঠা ৭০ জন করোনা রোগীর মধ্যে ৬৬ জনেরই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও ফুসফুসে নানাবিধ সমস্যা রয়ে গিয়েছে। গুরুতর অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার ছয় সপ্তাহ পরও ইংল্যান্ডে কভিড-১৯-এ আক্রান্তদের ফুসফুস স্ক্যান করে দেখা গিয়েছে যে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রোগীর ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে।
ফুসফুসের পরপরই দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির শঙ্কাযুক্ত অঙ্গ হচ্ছে মস্তিষ্ক। একিউট হেমোরেজিক নেক্রোটাইজিং এনসেফালোপ্যাথি, মেনিনজাইটিস কিংবা স্ট্রোকের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক। এসব জটিলতার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে রোগীর খিঁচুনি, স্মৃতিভ্রষ্টতা, প্যারালাইসিস ইত্যাদি অসুবিধাও হতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘসময় ধরে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম থাকলে মস্তিষ্কেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা পরে রোগীর বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চতর স্নায়বিক কার্যকলাপে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণে বৃক্ক ও হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদেও তা বিরূপ শারীরিক প্রভাব ফেলে। কারণ বৃক্ক ও হৃৎপিণ্ড শরীরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অঙ্গ, যা বিকল হয়ে গেলে শরীর ফুলে যাওয়া ও শরীরে বর্জ্যপদার্থ জমতে থাকার মতো অসুবিধা তৈরি হয়। এ থেকে উত্তরণের জন্য ডায়ালাইসিস কিংবা আক্রান্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব
করোনা আক্রান্তকালীন ভীতি এবং মানসিক ট্রমা ও চাপ থেকে পরে দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদ, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, এমনকি পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারের মতো দীর্ঘকালীন প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারেন করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি। অর্থাৎ শারীরিক প্রভাবের পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক মানসিক প্রভাবেও ভুগতে পারেন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি।
