জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিতে বসবে প্রশাসক

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০৭:০৯ এএম

পুঁজিবাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির ‘জেড ক্যাটাগরি’র কোম্পানিতে প্রশাসক বসানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এ ছাড়া জেড ক্যাটাগরির যেসব কোম্পানির মুনাফায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব কোম্পানিকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে এসইসির। দুর্বল কোম্পানিকে মুনাফার ধারায় ফেরাতে ও এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন সহজ করতে এমন উদ্যোগ নিচ্ছে এসইসি। কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

উৎপাদন বন্ধ, লোকসান, অনিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ও লভ্যাংশ প্রদানে অক্ষম দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো জেড ক্যাটাগরিতে স্থান পায়। এ খাতের কোম্পানির শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তিতে নয় কার্যদিবস সময় লাগে, যেখানে অন্যান্য ক্যাটাগরির শেয়ার তিন দিনে নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া জেড ক্যাটাগরির শেয়ারে মার্জিন ঋণসুবিধা পাওয়া যায় না। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) জেড ক্যাটাগরিভুক্ত ৫৩টি কোম্পানি রয়েছে।

এ বিষয়ে এসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোকে মুনাফার ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। এসব কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এর অংশ হিসেবে এসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে। যেসব কোম্পানির মুনাফার সম্ভাবনা থাকবে, সেগুলোকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হতে পারে। কিছু কোম্পানিকে মুনাফায় ফিরিয়ে আনতে নার্সিংয়ের প্রয়োজন হলে তা করা হবে। আবার যদি দেখা যায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোম্পানিকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে, তাহলে সেসব কোম্পানিতে প্রয়োজনে প্রশাসক বসানো হবে।

জেড ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি বস্ত্র খাতের কোম্পানি রয়েছে। লোকসানি, লভ্যাংশ দিতে না পারা, উৎপাদন বন্ধসহ বিভিন্ন কারণে বস্ত্র খাতের ১৪ কোম্পানি এই ক্যাটাগরিতে রয়েছে। দুটি বেসরকারি ব্যাংক ছাড়াও পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের কোম্পানিও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি রয়েছে চারটি। ২০১৯ সালে বড় অঙ্কের লোকসানের কারণে বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশও জেড ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানি অনেক বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে লেনদেন হলেও শেয়ারহোল্ডাররা কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছেন না। এই ক্যাটাগরির অন্তত ১০টি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো এক দশকেও শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে জেড ক্যাটাগরির দুর্বল কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তি শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

এসইসি সূত্রে জানা গেছে, জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোকে তিন স্তরে ভাগ করে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে এসইসি। এর মধ্যে যেসব কোম্পানির লোকসান কম কিন্তু পুঞ্জীভূত আয় অথবা তারল্য প্রবাহ বেশি, সেসব কোম্পানিকে এসইসি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিছু আইনের পরিপালন থেকে সেসব কোম্পানিকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। দ্বিতীয় স্টেজে এই ক্যাটাগরির যেসব কোম্পানি মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে অর্থাৎ মুনাফায় ফিরতে চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব কোম্পানিকে এসইসি নার্সিং করবে, যাতে তারা মুনাফায় ফিরতে পারে।

কমিশন মনে করছে কিছু কোম্পানি রয়েছে যেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ কিংবা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল করে রেখেছে, সেগুলোকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে। সে ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ পুনর্গঠন করা হতে পারে। এসব কোম্পানিতে পর্যবেক্ষক বসানো হতে পারে। প্রয়োজনে প্রশাসকও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। সিকিউরিটিজ আইনেই কমিশনকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ও রুলস সমন্বয়ে নতুন যে আইন তৈরি করতে যাচ্ছে সেখানে এসইসি তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানিতে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দিতে পারে। ওই নিরীক্ষকের সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, পর্যবেক্ষক কিংবা প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে।

মার্চেন্ট ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোতে বিশেষ নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কোম্পানি টাকার অপব্যবহার করেছে কি না, তা বের করা সম্ভব। যদি কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। আর যদি অপব্যবহার না হয়ে থাকে এবং ব্যবসায়িক অথবা অর্থনৈতিক কারণে লোকসান হলে সেসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা জেনে এসইসি একটি প্যানেল গঠন করে তাদের সহায়তা করতে পারে।

জানা গেছে, দীর্ঘ সময় উৎপাদনে না থাকায় মডার্ন ডায়িং অ্যান্ড স্ক্রিন প্রিন্ট লিমিটেড ও রহিমা ফুড করপোরেশনকে তালিকাচ্যুত করে ডিএসই। পরে উৎপাদন বন্ধ থাকা আরও বেশ কিছু কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতির উদ্যোগ নেয় ডিএসই। যদিও তালিকাচ্যুতির ফলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কোনো শাস্তি না হলেও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তালিকাচ্যুতির বিষয়ে ডিএসইর উদ্যোগ আটকে দেয় এসইসি। আর নতুন কমিশন এসে দুর্বল মৌলভিত্তির এসব কোম্পানিকে কীভাবে মুনাফার ধারায় ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত