মতান্ধতাকে যদি বলি দেওয়া যায়

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০৭:৩৮ এএম

পশু কোরবানি মুসলমানদের জন্য আল্লাহর আদেশ। কোরবানির মহত্ত্ব এর অন্তর্নিহিত দর্শনে। অন্তত বছরান্তে একবার মনের দরজায় বিবেকের আঘাত পড়ে এর মাধ্যমে। অন্যায়, দুর্নীতি আর দুর্বিনীত আচরণ করা জরাগ্রস্ত মুসলমান যাতে শপথ নিতে পারে, পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে তার বিবেকের সুপ্রবৃত্তি যেন জেগে ওঠে। যাতে শপথ নিতে পারে ‘আজ থেকে কুপ্রবৃত্তিকে কবর দিয়ে সততা ও মানবিকতার পথে হাঁটতে পারি’। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গিরা ইসলামের মানবিকতার শিক্ষাকে গ্রহণ করে না। অন্যদিকে কিছুসংখ্যক ধর্মবণিক, ইসলামি লেবাসধারী খুনে মানসিকার মানুষ মানুষকে ধর্মীয় দর্শনের অপব্যাখ্যা করে অন্ধ বানিয়ে দিচ্ছে। এদের জঙ্গি বানিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করে চরম অধর্মের কাজ করে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে জঙ্গিরা বারবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে। কিন্তু এ দেশের মানুষের দীর্ঘকালীন অসাম্প্রদায়িক চরিত্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এদের অবস্থান এবং কার্যক্রম হয়ে পড়েছে অনেকটা দুর্বল। ঈদের আগে থেকে আবার প্রচারমাধ্যম জানাচ্ছিল নব্য গজায়মান জঙ্গিরা পুলিশের ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে এক শ্রেণির সরল মানুষকে জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে। এই সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একচোখা গণ্ডারের মতো অন্ধ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে। ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজ ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিস্টান, হিন্দু, ইসলাম সব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান দেখা গিয়েছে, যাচ্ছেও। বিশ্ব জুড়ে এ সময় ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।

জঙ্গিদের অপকর্মের লক্ষ্য অভিন্ন থাকে বলেই দেখেছি আইএস জঙ্গিদের উন্মত্ততায় প্রাচীন এশেরীয় সভ্যতার প্রত্ননিদর্শন ধ্বংস আর বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির মানুষদের হত্যা করার মধ্যে কোনো ফারাক নেই। দুই ক্ষেত্রেই অপব্যাখ্যা দিয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে আর মানবতাকে করা হয়েছে অপমানিত। পবিত্র বোখারি শরিফে ‘কিতাবুল ইলম’ পর্বে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের আলামতগুলোর একটি হলো, জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে এবং মূর্খতা জেঁকে বসবে।

আমরা কি এখন এই আলামতই দেখছি? যেখানে ইসলামে জ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানে জঙ্গি পরিচয়ধারীরা সংস্কৃতি লালন করার বদলে কীভাবে সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বদ্ধ উন্মাদের মতো ধ্বংস করছে আর বিশ্ববাসীর কাছে প্রগতিবাদী ধর্ম ইসলামকে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে, তা দেখে শঙ্কিত হতে হয়। কে বিশ্বাসী আর কে বিশ্বাসী নয় এবং কে নাস্তিক আর কে আস্তিক এই বিচারের দায়িত্ব কি মহান আল্লাহ মানবের কাছে দিয়েছেন? আমার চোখে যে নিকৃষ্ট, আল্ল­াহর দৃষ্টিতে সে নিকৃষ্ট নাও হতে পারে! একজন নাস্তিকের দণ্ড দেওয়ার আমি কে? কাউকে হত্যা করার অধিকার কি আমার আছে? যদি ধর্মই মানি তবে মানতে হবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে অপরাধী হলে তার শাস্তি বিধানের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ। অথচ জঙ্গিরা মানুষ হত্যা করে মনে করছে হয়তো একটি মহৎ দায়িত্ব পালন করল। মানবতার বিচারে এবং ধর্মের দৃষ্টিতে তারা যে ভয়াবহ পাপের কাজ করে ফেলল, তা বুঝতেই পারল না। আমাদের দেশে লেবাসে ও বর্ণিত আদর্শে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির ইসলামের নাম নিয়েই রাজনীতি করে আসছিল। কিন্তু এই দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য চরম ইসলামবিরোধী কাজ কি অবলীলায় করেনি? মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা তাদের আদর্শিক কারণে পাকিস্তানপন্থি হতেই পারে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নাও নিতে পারে। তাই বলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যায় অংশ নেবে? নারী ধর্ষণে সহযোগী হবে? নিরীহ নিরপরাধ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? ইসলামের দৃষ্টিতে তো এসব আচরণ ঘোরতর পাপের কাজ। ইসলামি ছাত্র শিবির যখন সবল ছিল, তখন প্রতিপক্ষ ছাত্রবন্ধুকে হত্যা করত, পায়ের রগ কেটে দিত, এর কি কোনো অনুমোদন পেয়েছিল ইসলামে? কবছর আগেও আন্দোলনের নামে বিএনপির বন্ধু হয়ে যেভাবে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পেট্রলবোমায় পুড়িয়েছে, এর অনুমোদন কোথায় ইসলাম ধর্মে? এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে, তবে শিবিরের আস্তানায় সে সময় পেট্রলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া গিয়েছিল কেন? কেন সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া গিয়েছিল? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু। এসব বিচারে ইসলামি স্টেটস নামধারী জঙ্গি থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামী আর এ দেশীয় জঙ্গি সবাই এক সূত্রে বাঁধা। কেবল যুদ্ধের ময়দানে, যুদ্ধের প্রয়োজন ছাড়া নির্বিচারে মানুষ হত্যার অনুমোদন কি ইসলামে রয়েছে?

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস আমার অন্যতম চর্চার বিষয়। চার দশক ধরে চেষ্টা করেছি বিশ্বসভ্যতাবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করতে। এ-সংক্রান্ত আমার লেখা বিভিন্ন বই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা পড়ে থাকেন। কথাটি বলতে হলো এজন্য যে, বিশ্বসভ্যতার নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমি জড়িয়ে আছি। পাশাপাশি আমি ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র। পূর্বপুরুষদের গড়া সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব প্রজন্মকে প্রাণিত করে। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে এসব প্রেরণার প্রয়োজন অনেক বেশি। এ কারণেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্ন আইন রয়েছে। তাতে অতি যত্নে ও সতর্কতায় প্রত্নসম্পদ রক্ষা করতে হয়। সে জাতিই সাংস্কৃতিক মননশীলতায় উজ্জ্বল যারা নিজ দেশের এবং অপরের প্রত্ন-ঐতিহ্য সংরক্ষণে দায়িত্বশীল থাকে। অথচ বেশ কয়েক বছর আগে ইসলামি স্টেটস নামের সংগঠনের কিছুসংখ্যক জঙ্গি হাজার হাজার বছর ধরে অতি যত্নে সংরক্ষণ করা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় অবস্থিত এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান প্রত্ননিদর্শন ধর্মের অপব্যাখ্যায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আর এ ধারার কাজ করে একুশ শতকের আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে ইসলামকে অসংস্কৃত সংকীর্ণ ধর্ম হিসেবে পরিচিত করাচ্ছে। অথচ ইসলাম হচ্ছে একটি প্রগতিবাদী ধর্ম। হাজার হাজার বছর আগের শিল্পকলা ইসলামবিরোধী কী করে হলো, সে প্রশ্ন এদের কে জিজ্ঞেস করবে!

ইন্টারনেটের সুবিধায় বর্বর জঙ্গিদের মসুল জাদুঘরে রাখা এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো নির্দয়ভাবে হাতুড়ি চালিয়ে ভেঙে ফেলতে দেখেছিলাম টেলিভিশনের পর্দায়। চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল হাতুড়ির প্রতিটি ঘা আমার বুকের একটি করে পাঁজর ভেঙে ফেলছে। সেই মধ্যযুগে আব্বাসীয় শাসনপর্বে বাগদাদ ছিল ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি। এখানে আক্রমণ করেছিল মঙ্গোলীয় বর্বর নেতা হালাকু খান। পুড়িয়ে দিয়েছিল বাগদাদের জাদুঘর আর লাইব্রেরি। এখনো ঘৃণাভরে সেই বর্বরতার কথা স্মরণ করে পৃথিবীর সংস্কৃতি-সচেতন মানুষ। এই আধুনিক যুগে এসেও ইসলামি রাজ্য গড়ার কথা বলে ইসলামের উদারতা ও গরিমাকে বিশ্ববাসীর কাছে কলঙ্কিতভাবে উপস্থাপন করছে কিছুসংখ্যক ধর্মান্ধ মানুষ। এজন্যই বোধ হয় বলে ধার্মিক মানুষ সব সময় মানবিকতার পক্ষে আর মানবতা ও ধর্মের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ধর্মান্ধ মানুষ। কারণ এদের দিয়ে যেকোনো অপকর্ম করানো যায়।

২০০১-এর কথা কি আমরা ভুলতে পেরেছি। আফগানিস্তানের তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের ফরমান মতো বামিয়ান উপত্যকায় অনিন্দ্য সুন্দর বৌদ্ধ ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তালেবান জঙ্গিরা। ২০০৮ সালের কথা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বরাবর মূল সড়কের সড়ক দ্বীপে লালন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। সে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে মৌলবাদীরা। এ দেশের মৌলবাদী ইসলামি নেতারা কতটা গভীরভাবে নিজ ধর্মকে বোঝেন জানি না, তবে তারা যে অসংখ্য ধার্মিক মুসলমানকে ধর্মান্ধ বানিয়ে ইসলামের কমনীয় রূপে কালিমা লেপন করছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি তারা প্রকৃত ধর্মশিক্ষা না পেয়ে তালবে এলেমদের উসকে দেন জিহাদি বা জঙ্গি তৎপরতায়, তবে তাকে মূর্খের অপরাধ বলে বিবেচনা করব। আর যদি বাংলার সেন আমলের ব্রাহ্মণ শাসকের মতো ধর্মের সৌন্দর্যকে কালো কাপড়ে ঢেকে নিজেদের ইচ্ছাধীন ব্যাখ্যায় ধর্মের নামে মানুষকে অমানবিক হতে উসকে দেন, তবে তো তারা ভয়ংকর জ্ঞানপাপী। তাদের হাতে সভ্যতা ক্ষতবিক্ষত হতে বাধ্য। তাই ঐতিহাসিকভাবে অসাম্প্রদায়িক জীবন কাঠামোয় বেড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে জীবন্ত এ দেশের মানুষ আহত দৃষ্টিতে বিমানবন্দরের সড়ক দ্বীপে যখন লালন ভাস্কর্য ভাঙতে দেখল, তখন নিশ্চয় লজ্জায় মুখ লুকাতে চেয়েছিল।

গভীরভাবে ইসলাম ও ইতিহাস না বুঝতে পারায় সম্ভবত অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী লালনকে এ যুগের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষরা চিনতে পারলেন না। যে মরমি সাধক লালন আল্লাহর সঙ্গে নিজের হৃদয় এক করে দিতে চেয়েছিলেন, তাকে প্রতীক হিসেবে ধারণ করে আমরা প্রতিদিন শুদ্ধ হতে পারতাম। এর বদলে কিছুসংখ্যক অশিক্ষিত, অসংস্কৃত, অমার্জিত মানুষ বোকা ছাত্রদের উসকে দিয়ে লালন ভাস্কর্যকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চাইল। ভাস্কর্য তো সৌন্দর্যের প্রতিরূপ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতিরূপ। এসব কোনো পূজনীয় মূর্তি নয়। এর প্রতিহিংসা প্রকাশ করতে পারে একমাত্র অন্ধকারের জীবরা। তাই আমাদের মনে হয় ধর্মের মানবিক শিক্ষা সবার সামনে এনে ছড়ানো বিভ্রান্তির পশুত্বকে যদি বলি দেওয়া যেত, তবে নিশ্চয় বিভ্রান্ত মানুষ অন্ধত্বমুক্ত হয়ে মানবিক মানুষ হতে পারত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত