একটি সংবেদনশীল মানবিক রাষ্ট্রের সন্ধানে

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০৭:৪০ এএম

১. প্রতি বছর অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে আমরা ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করি। মনে বড় আশা জাগে, প্রিয় জন্মভূমি একদিন আদিবাসীসহ সব নাগরিকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানবিক ও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ কথাটি প্রতিফলিত হবে সমাজে। যারা দুর্বল, পিছিয়ে পড়া, যারা দলিত, শোষিত ও বঞ্চিত, শ্রমজীবী মানুষ, অসহায় গরিব কৃষক, হরিজন, চা বাগানের শ্রমিক, আদিবাসী- তারা রাষ্ট্রের নজরে থাকবে সবার ওপরে। আজও এই আশায় চেয়ে থাকি। করোনা মহামারীর কারণে বিশ্ব এখন কঠিন এক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। অন্যান্য বছর আমরা সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৈচিত্র্য উৎসব, সংস্কৃতি-পরিবেশ মেলা, খেলাধুলা ইত্যাদি আয়োজন করতাম। এবার কভিড-এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কোনো উৎসব আয়োজন হবে না। কভিড-১৯ এর কারণে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। বিশেষ করে মানুষের সেবা করতে গিয়ে যেসব স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সরকারি ও বেসরকারি কমকর্তা, স্বেচ্ছাসেবী ও নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের অবদানও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ২৬তম আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালে রেজুলেশন ৪৯/২১৪ গ্রহণ করে ৯ আগস্টকে আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং দিবসটি পালনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে আহ্বান জানায়। তারপর থেকে গত ২৬ বছরে বৈশ্বিক পর্যায়ে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তন্মধ্যে ২০০০ সালে জাতিসংঘে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম গঠন, ২০০১ সাল থেকে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার নিয়োগ, ২০০৫-২০১৪ সালের সময়কালকে দ্বিতীয় আদিবাসী দশক হিসেবে পালন, ২০০৭ সালে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র গ্রহণ, ২০০৭ সালে আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কর্মব্যবস্থা প্রবর্তন, ২০১৪ সালে সাধারণ পরিষদের বিশ্ব আদিবাসী সম্মেলন আয়োজন এবং এ সম্মেলনে ঐতিহাসিক ‘আউটকাম ডকুমেন্ট’ গ্রহণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযাগ্য। ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা নয়’ বা ‘খবধাব ঘড় ঙহব ইবযরহফ’ স্লোগান নিয়ে যে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ২০৩০ এজেন্ডা জাতিসংঘ গ্রহণ করেছে, সেখানে আদিবাসীদের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। তাই করোনাকালেও আগামীতে এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগণ এবং আদিবাসী সংগঠনগুলো কীভাবে অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারে, তার উপায় খুঁজে বের করা জরুরি।

২. আদিবাসী দিবস উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো আদিবাসীদের জীবনধারা, মৌলিক মানবাধিকার, আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-আদিবাসী জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করে তোলা এবং আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করা। দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, বিগত দুই যুগেও আমাদের দেশে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সম্পাদনে সরকারগুলো আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসেনি।  জাতিসংঘের মতে, বিশ্বের ৯০টি দেশে প্রায় ৪০ কোটির অধিক আদিবাসী রয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০২০ সালের আদিবাসী দিবসের মূল সুর হলো, “ঈড়ারফ ১৯ ধহফ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব’ং জবংরষরবহপব.” এই মূল সুরের সঙ্গে সংগতি রেখে আমরা এ বছরের মূল সুর ঠিক করেছি, “কভিড ১৯ মহামারী ও আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম”। আদিবাসীদের বর্তমান বাস্তবতায় এই মূল সুর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদিবাসী জনগণ দরিদ্রদের মধ্যেও প্রান্তিক। তারা ঐতিহাসিকভাবে শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। এখন করোনার কারণে আদিবাসীদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। আদিবাসী সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এরই মধ্যে আমাদের দেশে সমতলের আদিবাসীরা শতকরা ৭০ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অনেক আদিবাসী চাকরি হারিয়েছেন। শহরে আদিবাসী গার্মেন্টসকর্মী, হোটেলকর্মী, বিউটি পার্লারের নারীকর্মী, গাড়িচালক, গৃহকর্মী, সিকিরিটি গার্ড ও অন্যান্য ইনফরমাল সেক্টরের আদিবাসীরা তাদের চাকরি হারিয়ে অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। এই ধরনের চাকরি হারানো আদিবাসী মানুষের সংখ্যা অন্তত কয়েক হাজার হবে। কৃষি ও অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত আদিবাসীদের অবস্থাও অনিশ্চিত। যেসব আদিবাসী দিনমজুর ও দৈনিক পারিশ্রমিকের কাজ করেন, তাদের জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। আমরা কেউ জানি না কভিড পরিস্থিতি কবে শেষ হবে। এই পরিস্থিতি যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আদিবাসী প্রান্তিক মানুষের অবস্থা হবে আরও শোচনীয়। তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, আদিবাসীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হোক। এই ধরনের প্রণোদনা প্রদানের সময় যেন স্থানীয় আদিবাসী সংগঠনগুলোকে যুক্ত করা হয়, যাতে কোনো আদিবাসী বঞ্চিত না হন। আমরা লক্ষ করেছি, এবারে বিশাল আকারের বাজেট প্রণীত হলেও করোনা-সহায়তা হিসেবে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। গতানুগতিক বাজেট হয়েছে। 

৩. স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর হতে চলল, দেশের ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আদিবাসীদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, এখন আত্মপরিচয়, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর এসে পড়েছে এই কভিড-১৯, যার কারণে আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকা আরও অনিশ্চিত ও হুমকির মুখোমুখি হয়েছে। সরকার করোনা মোকাবিলায় চেষ্টা করছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে চলেছেন, কিন্তু আদিবাসী প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্ব ও বিপন্নতা অনেক গভীরে। আর এ কারণেই আমরা এই করোনার সময় বিশেষভাবে অথনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

৪. আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো নয়। দুঃখের সঙ্গে এই করোনাকালেও আমাদের এই কথাগুলো বলতে হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল ও তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশে আদিবাসীদের ওপর সাম্প্রদায়িক হুমকি, আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদ, আদিবাসী নারী নির্যাতন, হত্যা, অপহরণসহ সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছর অতিবাহিত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখন থমকে আছে আর পাহাড়ের মানুষ সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের অবস্থাও ভালো নয়। সরকার বারবার সমতলের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন করেনি। এই বিষয়ে ন্যূনতম পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো লক্ষণ নেই।

৫. আদিবাসীরা সব সময় দেশের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সংগ্রামের পথেই আদিবাসীরা একদিন না একদিন তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের পথে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। বহু বছর ধরে আদিবাসীরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। এই করোনার সময় আদিবাসী ফোরাম কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে। যেমন, তাদের মতে, আদিবাসীসহ সব নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যেহেতু আদিবাসীরা অতি প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করেন এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অবস্থা নাজুক, তাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আদিবাসী অঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; করোনা মহামারীর কারণে যেসব আদিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অনিশ্চিত জীবনের সম্মুখীন, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় এককালীন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান করা; সারা দেশে কমপক্ষে ২৫ হাজার আদিবাসী তরুণকে করোনাকালে খন্ডকালীন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে পারে; আদিবাসী ছাত্রছাত্রী যাতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে না পড়ে, তার জন্য আর্থিক সহায়তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা; সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি বাস্তবায়নে আদিবাসীদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা; আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী অধিকার আইন প্রণয়ন করা ইত্যাদি।

৬. আদিবাসীরাও মানুষ এবং তারা এ দেশের নাগরিক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। তাই আজ আদিবাসী দিবসে আশা করছি, সরকার আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেবে। তাদের প্রতি বিশেষ সংবেদনশীল হবে। আর জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, মানবাধিকার সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আদিবাসী অধিকার রক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। সংখ্যালঘু আদিবাসীদের সঙ্গে বৃহত্তর বাঙালি জনগণের সেতুবন্ধন রচিত হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার পরিবেশ উন্নত হবে। যেখানে আস্থাহীনতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব রয়েছে, সেখানে আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তি রচনায় অগ্রগতি হবে। আদিবাসীদের অধিকার হলো মানবাধিকার। আদিবাসী ইস্যুতে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকার, জাতিসংঘ, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের বিশেষ ভূমিকা পালন করা জরুরি। জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে যেসব অধিকার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা সবার দায়িত্ব। এভাবেই আমাদের প্রিয় স্বদেশ একদিন আরও বেশি গণতান্ত্রিক, উদার ও অসাম্প্রদায়িক, উন্নত মানবিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত