অর্জুনা রানাতুঙ্গা : শ্রীলঙ্কার উত্থানের নেতা

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২০, ০৬:৪৩ এএম

আশির দশকে ভারতের যুবদল নিয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন রবি শাস্ত্রি। ১৭ বছরের এক স্থানীয় যুবক সেই দলের বিপক্ষে অপরাজিত সেঞ্চুরি করেন। ‘এখনকার মতো সে ছিল নাদুস-নুদুস, চালাক ব্যাটসম্যান। স্মার্টও। পুরো ক্যারিয়ার জুড়েও সে তাই ছিল।’ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন শাস্ত্রি। যার কথা বলেছিলেন তিনি অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

দু’হাজার সালের এই দিনে (১০ আগস্ট) কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শেষ টেস্ট ইনিংসটি খেলেছিলেন রানাতুঙ্গা। প্রথম ইনিংসে নিকি বোয়ের বলে ১৪ রানে বোল্ড হন। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সেই টেস্ট ড্র করে শ্রীলঙ্কা। ততে অবশ্য রানাতুঙ্গার চেয়ে ১০১ রানে অপরাজিত মাহেলা জয়াবর্ধনের অবদানই বেশি ছিল।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে রানাতুঙ্গার অবদান অন্যখানে। তার জন্যই দেশটি ৯৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়। তিনি না থাকলে মুত্তিয়া মুরালিধরন নামের কেউ ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত কি না সন্দেহ আছে। তাছাড়া ৯৬ বিশ্বকাপে জয়সুরিয়া-কালুভিতারানাকে দিয়ে ওপেনিংয়ে পিঞ্চহিটিং করানোর কৌশল তারই। টাফ ক্রিকেটের জন্যও দলকে প্রস্তুত করেছিলেন তিনিই। মনে আছে নিশ্চয়, সেই বিশ্বকাপের মাস ছয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ায় লম্বা সফর করেছিল শ্রীলঙ্কা। সেই দলে ছিলেন মুরালিধরনরা। এমসিজিতে বক্সিং ডে টেস্টে মুরালিকে চাকিংয়ের জন্য ‘নো’ ডাকেন ড্যারিল হার্পার। সফর জুড়ে আরও অনেক বিতর্ক হয়েছিল। সেই সফরে পিঞ্চহিটিংয়ে সফল হয়েছিলেন জয়সুরিয়া-কালুভিতারানার জুটি। যদিও অস্ট্রেলিয়ার কাছে পাত্তা পায়নি রানাতুঙ্গার দল। অথচ সেই দলটাই কয়েক মাসের মধ্যে লাহোরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল। কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় তিন মাসের সফরেই মানসিকভাবে ইস্পাত কঠিন হয়ে উঠেছিল শ্রীলঙ্কা। রানাতুঙ্গা যদিও বলেছিলেন, ‘কপিলের (১৯৮৩) হাতে বিশ্বকাপ ওঠা দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, যদি একটা দল যাদের সুনিল গাভাস্কার আর কপিল ছাড়া কোনো তারকা নেই, তারা উইন্ডিজের মতো ক্রিকেট-দৈত্যকে হারাতে পারে, তা হলে শ্রীলঙ্কাই বা পারবে না কেন। ওটাই ছিল আমার প্রেরণা। তারপর ১৯৯২-এ ইমরানও পারল দেখে ঠিক করে ফেলি, আমাদেরও পারতেই হবে।’

ছিয়ানব্বই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ছিলেন মার্ক টেইলর। দলে ছিলেন রিকি পন্টিং, ওয়াহ ভাতৃদ্বয় এবং শেন ওয়ার্নের মতো তারকা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তারা শ্রীলঙ্কাকে গোনার মধ্যেই রাখেনি। অন্যরাও পাত্তা দেয়নি। নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া-উইন্ডিজ খেলতে না যাওয়ায় লঙ্কা দুটি ম্যাচ ওয়াকওভার পেয়েছিল। সেই সময়ই ক্ষুব্ধ রানাতুঙ্গা বলেন, ‘লাহোরের ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরা অস্ট্রেলিয়াকে চাই।’ সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সফরের তিক্ততা তো ছিলই। যা নিয়ে টেইলর পরে বলেছিলেন, ‘খেলা ছাড়ার পরে আমি বুঝেছি পুরো ব্যাপারটাই রানাতুঙ্গার চালাকি ছিল। ও ঠিক জানত, কী করলে আমরা উত্ত্যক্ত হব। অস্ট্রেলিয়াকেও রাগাতে জানত। আমরা মাথা গরম করে নিজের কাজটা ভুলে যেতাম। আর ও দিব্যি কাজ হাসিল করে চলে যেত। সেই সময় আমার ওকে (রানাতুঙ্গা) ছোটখাটো গুণ্ডা মনে হতো। খেলা ছাড়ার পর দেখলাম, লোকটা মোটেও তেমন নয়। ও যথেষ্ট ভদ্র। তখন আমি বুঝলাম আমাদের বোকা বানিয়ে আড়ালে রানাতুঙ্গা নিশ্চয়ই প্রচুর হেসেছে। তবে ট্যাকটিক্যালি অর্জুনা আহামরি কিছু ছিল না। দলকে টগবগে রাখতে পারত। আর প্রতিপক্ষকে বিরক্তিতে জ্বালিয়ে মারতেও রানাতুঙ্গার জুড়ি ছিল না।’

এই রানাতুঙ্গার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ১৯৮২ সালে, নিজ দেশের প্রথম টেস্টে। খেলেছেন ৯৩টি টেস্ট। ৩৫ গড়ে পাঁচ হাজারের ওপর রান করেছেন। দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ৫৬ টেস্টে। ২৬৯ ওয়ানডেতে ৭৪৫৬ রান করেছেন ৩৫.৮৪ গড়ে। অধিনায়কত্ব করেছেন ১৯৩ ম্যাচে। রান ৫৬০৮।

খেলা ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন রানাতুঙ্গা। পার্লামেন্টের মেম্বার হয়েছিলেন। মাহেন্দ্র রাজাপাকসের আমলে পোর্ট ও শিপিং মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট আমাকে অনেক দিয়েছে। খেলার মাঠেই আমি শিখেছিলাম কীভাবে অনেক লোকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হয়। ক্রিকেট আমাকে শিখিয়েছিল ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। আমি সব সময় বলি, সংসদে আসার আগে রাজনীতিবিদদের ক্রিকেট খেলা উচিত। এতে তারা বুঝতে পারবে কীভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়।’

রাজনীতিক রানাতুঙ্গার সঙ্গে অধিনায়ক রানাতুঙ্গার কি তুলনা হয়? একেবারেই হয় না। কারণ রানাতুঙ্গার জন্ম না হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে শ্রীলঙ্কার প্রতিষ্ঠা দুই দশক পিছিয়ে যেত। আর ক্রিকেট না খেললে তাকে কেউ ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠাত বলে মনে হয় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত