পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের নেপথ্যে এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বন্দ্বের জের ধরে পুলিশের সহায়তায় পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদককে হত্যার ছক সাজাতে গিয়েই ঘটে থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনা। এতে ভেস্তে যায় পুলিশের সহায়তায় নেপথ্যে থাকা সন্ত্রাসীদের হত্যা পরিকল্পনা। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও মিরপুরের একাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ভাষ্যে এসব তথ্য পাওয়া গেলেও পুলিশের গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এ সংক্রান্তে কোনো তথ্য নেই।
গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরক সংগ্রহ ও বিস্ফোরণ ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেয়েছি। তবে রিপোর্টে কী আছে বলা যাবে না।
ডিএমপির একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অস্ত্র, গুলি উদ্ধার ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তায়জুল ইসলাম বাপ্পী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাত-আটজনের তথ্য পেয়েছেন। যারা পল্লবী থানায় বিস্ফোরিত বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করেছিলেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে ফাঁসিয়ে মেরে ফেলার জন্য।
৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পরপরই বাপ্পীর ঘনিষ্ঠ অন্তত সাত-আটজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন তারা। তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত বাপ্পী ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাকে বাঁচাতে বাপ্পী ও তার প্রতিপক্ষ জুয়েল রানাকে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করছেন অনেকে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তায়জুল ইসলাম বাপ্পীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে গুলি করার পর থেকেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা চাপের মধ্যে পড়েন। এরই মধ্যে পল্লবীর এ ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর বিব্রত হন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তড়িঘড়ি করে গত শনিবার মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ, পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মিজানুর রহমান ও সহকারী কমিশনার মো. ফিরোজ কাওছারকে সরিয়ে দেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শহিদুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টও জমা দেওয়া হয় কমিশনারের কাছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনির হোসেন এ রিপোর্ট জমা দেন। অন্য দুই সদস্য হলেন সিটিটিসির বম্ব ডিসপোজাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী ও দারুস সালাম জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকি।
জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে থানা পুলিশের আসামি ও আলামত ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ত্রুটি মিলেছে। থানা পুলিশের অপেশাদারিত্বপূর্ণ আচরণের কারণেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সংক্রান্ত পেশাদারিত্ব অনুসরণসহ বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিস্ফোরিত বোমাকে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও সেগুলোর উৎস কোথায় বা কারা নিয়ে এসেছিল সে বিষয়ে তারা কোনো তদন্ত করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসির বম্ব টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্ল্যাহ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, পল্লবী থানায় বিস্ফোরিত বোমার আলামত বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছি এগুলো আইইডি ছিল। ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তুর মধ্যে চারটি আইইডি ছিল, যার সবই বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি আরও বলেন, বোমার উৎসসহ বাকি বিষয়গুলো তদন্তের জন্য মামলা হয়েছে। সেই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) উপকমিশনার আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরকের প্রকৃত জোগানদাতা কারা, এসব গোলা-বারুদের উৎস কোথায় সবকিছু তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর সবকিছু জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, পল্লবী থানা পুলিশের কাছ থেকে বুঝে পাওয়া দুই মামলার তিন আসামি শহীদুল, রফিকুল ও মোশাররফের ১৪ দিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে আগামী বৃহস্পতিবার। ওইদিনই তাদের আদালতের কাছে হাজির করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তায়জুল ইসলাম বাপ্পী ও তার দুই সঙ্গী মিলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তিন দফায় কথা বলেন। তাতে আড়াই কোটি টাকার বিনিময়ে পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জুয়েল রানার তিন সঙ্গীকে বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ কালশী কবরস্থানে নিয়ে অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক গুঁজে দেয়। তারপর সেগুলো উদ্ধার দেখিয়ে মামলা ও সিজার লিস্ট তৈরির পর জুয়েল রানাকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পন্ন করে। এরই মধ্যে থানার ভেতরে কাকতালীয়ভাবে বাপ্পী ও তাদের সরবরাহ করা ওয়েট মেশিনের ভেতরে থাকা বোমার বিস্ফোরণে সবকিছু উল্টে যায়। বিস্ফোরণের ঘটনায় চার পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আহত হন। এদের মধ্যে চিকিৎসাধীন এক পুলিশ কর্মকর্তার চোখ নষ্ট হওয়ার পথে, আরেক কর্মকর্তার হাত কেটে ফেলতে হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিস্ফোরণ ঘটনার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস এ হামলার দায় স্বীকার করে বলে জানায় জেহাদি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স। এরপরই মামলার তদন্তভার পল্লবী থানা পুলিশের কাছ থেকে ডিএমপির সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের কাছে ন্যস্ত হয়।
বিস্ফোরণ ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দুটি মামলা করা হয়। এসব মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহকারী অন্তত ছয়-সাতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
