পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে ৫.২৪% প্রবৃদ্ধির চমক

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ০৪:০৫ এএম

করোনা মহামারীতে সারা বিশ্বের অর্থনীতি সংকুচিত হলেও এ সময়ে বাংলাদেশের বেশকিছু অর্জন আশার আলো দেখাচ্ছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার পূর্বাভাস মিথ্যে প্রমাণ করে মহামারীর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় দুই হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। করোনা সংক্রমণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া ত্বরিত পদক্ষেপ ও ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের অর্থনীতি ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কিছুটা কম হলেও রেমিট্যান্স সে ক্ষতি অনেকটাই মেটাতে পেরেছিল। অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়ার সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছিল। শিল্পোৎপাদন ও সেবা খাতেও

সন্তোষজনক অগ্রগতি ছিল। তবে মার্চে করোনার ধাক্কায় টানা ৬৬ দিনের লকডাউন কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে করোনার প্রভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই-শতাংশের নিচে নামবে বলে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দেয়। তবে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি পদক্ষেপ ও প্রথম ৯ মাসের অর্জনের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে বিশ্বের শক্তিশালী প্রায় সব দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে, প্রবৃদ্ধি হয়ে পড়ছে ঋণাত্মক।       

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করোনা সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সে দেশের অর্থনীতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণাত্মক হতে পারে। এমন প্রবণতা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে পড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের গত মে মাসে সবশেষ এ বছরের জন্য মন্দার যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, এখন দেখা যাচ্ছে তা  ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নতুন হিসাব বলছে, ১৯ দেশের ইউরোজোনে ২০২০ সালে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ মন্দা দেখা দিতে পারে। আর পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (২৭টি দেশ) অর্থনীতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

একইভাবে পূর্বাভাস বলছে, ২০২১ সালে প্রত্যাশার চেয়েও শ্লথগতিতে পুনরুদ্ধার হওয়া শুরু হবে ইউরোপের অর্থনীতি। ইইউ কমিশন বলছে, ইউরোপের একেক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর যেমন মহামারীর প্রভাব একেক রকম, তেমনি ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও সেটিই হবে। যেমনÑ এ বছর জার্মানির অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, কিন্তু ফ্রান্সে তা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, স্পেনে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ও ইতালিতে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি আর্থিক বছরে (২০২০-২১) পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সংকুচিত হতে পারে বলে নর্থ ব্লক তার পূর্বাভাসে জানিয়েছে।

গত ৮ জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস ২০২০ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরও কমে ১ শতাংশে আসতে পারে। গত ৩ জুন প্রকাশিত আইএমএফের কান্ট্রি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কভিড-১৯ এর প্রভাব হবে মারাত্মক। আর এর প্রভাবে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সরকারও লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ পুনর্নির্ধারণ করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বৈশি^ক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর এই কঠিন সময়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেক বড় ব্যাপার। গত অর্থবছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় আমরা কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে ছিলাম। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে চলতে হয়েছে আমাদের। মার্চ থেকে জুন এই চার মাস প্রায় সব কিছুই বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বলেছিল, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। কিন্তু সেটা ভুল প্রমাণ করে একটা সম্মানজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আমার ধারণা, পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশ এই সময়ে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না।’

বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতিও মহামারীর ধাক্কা সামলে উঠতে শুরু করেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে রপ্তানি আয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা ইতিমধ্যেই কাটতে শুরু করেছে। হারানো রপ্তানি আদেশ ফিরে পাচ্ছে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে প্রবাসী আয়ে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ায় একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে রেমিট্যান্সে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও রেকর্ড ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মহামারীতে বিশে^র বড় অর্থনীতির দেশগুলো যখন নাকাল অবস্থায় সে সময় এসব অর্জন বাংলাদেশকে করোনাভাইরাস সংক্রমণপূর্ব অবস্থায় দ্রুত ফিরিয়ে আনছে।      

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া সাময়িক হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছর (২০১৯-২০) শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলার। তার আগের অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। এক বছরে মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে মহামারীর মধ্যেও গত অর্থবছরে স্থিরমূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় মানুষের মাথাপিছু আয় বছরে দাঁড়াচ্ছে গড়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, মাসে গড় আয় প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ টাকার মতো। মাথাপিছু গড় আয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত আয় নয়। একটি দেশের মোট আয়কে মাথাপিছু ভাগ করে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পিকেএসেএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান  দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসী আয়ে নগদ সহায়তা দেওয়া সরকারের একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত ছিল, যা এখন প্রমাণ হয়েছে। প্রবাসীরা এখন বৈধপথে টাকা পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছেন। এতে করে গত কয়েক মাসে রেমিট্যান্সে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। তিনি বলেন, করোনার মধ্যেও যে প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে তা খুবই ইতিবাচক। যদিও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন, তা যদি ঠিকমতো পৌঁছানো যেত তাহলে প্রবৃদ্ধি আরও ভালো হতো। এখন পর্যন্ত এসএমই খাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনার ঋণ কীভাবে বিতরণ করা হবে সেটার মডিউল এখনো ঠিক হয়নি। প্রণোদনার ঋণ যদি সঠিক জায়গায় সঠিক সময়ে পৌঁছানো যায় তাহলে প্রবৃদ্ধি সহসাই ঘুরে দাঁড়াবে।

এ বিষয়ে বিবিএসের জাতীয় আয় শাখার পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাথমিক হিসাবের তথ্য। আগামী দেড়-দুই মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করা হবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরেও ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে সরকার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হওয়াটা ‘অস্বাভাবিক কিছু নয়’। কেননা করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও কৃষিতে উৎপাদন ভালো হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স খুবই ভালো ছিল। মহামারীর মধ্যে রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছে।

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে স্থিরমূল্যে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা জিডিপির মধ্যে মধ্যে সেবা খাত থেকে এসেছে ৫৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। শিল্প খাত থেকে এসেছে ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৮ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। আর কৃষি খাত থেকে এসেছে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা বা ১৩ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল ১৯০৯ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ১৭৫১ ডলার। তার আগের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১৬১০ ডলার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত