বছর শেষে পুরো ঘুরে দাঁড়াবে পোশাক খাত

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ০৪:০৮ এএম

দীর্ঘ চার মাস পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। সেসব দেশের শপিং মল-স্টোরগুলো খুলেছে। ফলে পোশাকের চাহিদাও বেড়েছে। ওই দেশগুলোতে গ্রীষ্মকাল শুরু হওয়ায় চার মাস আগের মজুদ করা পোশাক এখন বিক্রি করা যাচ্ছে না। আবার দীর্ঘদিন গুদামে থাকায় এসব পোশাকের গুণগত মান নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এসব পোশাক আগামী বছর পর্যন্ত রাখা সম্ভব হবে না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে পোশাক খাতের চলমান স্থবিরতা ও হতাশা কাটতে শুরু করেছে। ইউরোপ, আমেরিকার সবকিছু খুলে যাওয়ার পর গত মাস থেকেই নতুন ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করেছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম দাম দিচ্ছেন বেশির ভাগ ক্রেতা। পোশাক মালিকরা অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদেশের চাহিদা এবং খারাপ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসান দিয়েও বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। মূলত তারা প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টিকে থাকতে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

কারখানার মালিকরা বলছেন, আগস্ট-সেপ্টেম্বর লিন পিরিয়ড (এই সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কাজ কম থাকে) থাকার পরেও বেশির ভাগ কারখানায় ৭০ শতাংশের ওপরে বুকিং আছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ সবাই সক্ষমতার সমান বা অতিরিক্ত কাজ পাবে। করোনা পরিস্থিতিতেও যেহেতু বুকিং ভালো তাই এই শিল্পের বিপর্যয়ের আর তেমন কোনো আশঙ্কা নেই। আশা করা হচ্ছে, বছরের শেষের দিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে পোশাক শিল্প। তখন হয়তো লোকসান দিয়ে কাজ নিতে হবে না। তবে যদি ইউরোপ-আমেরিকায় আবারও করোনার ধাক্কা লাগে, সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) এম এ রহিম বলেন, ‘দামে কম হলেও আমাদের টিকে থাকার জন্য এখন ক্রয়াদেশ নিতে হবে। বর্তমানে যে ক্রয়াদেশ আছে তা সক্ষমতা অপেক্ষা যথেষ্ট না হলেও অনেক ভালো। দিনে দিনে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। ক্রেতাদের ধরে রাখতে ও প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে আমরা ক্রয়াদেশ নিচ্ছি। আশা করছি, আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াব।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ দশমিক ২৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কম। এর আগের বছর একই সময়ে পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয় ৩ দশমিক ৩১০ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ১৬ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।  আগের বছর (২০১৮ সাল) একই সময়ে রপ্তানি হয় ১৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত বছর জুলাই-ডিসেম্বরে তার আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছিল।

এ খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, জুলাইয়ে রপ্তানি রাতারাতি ভালো হওয়ার পেছনে কাজ করেছে করোনায় বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ পুনরায় রপ্তানি করা। আগস্টেও বাতিল হওয়া কিছু পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন অর্ডারের কাজ চলছে। তবে সেপ্টেম্বরের বুকিংয়ের পুরোটাই নতুন অর্ডারের।

স্কয়ার গ্রুপের মার্চেন্ডাইজিং বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মনে করছেন, ‘আমাদের মতো যাদের বড় কারখানা আছে, তাদের এখনো যথেষ্ট পরিমাণে বুকিং আছে। দিনে দিনে এটা আরও বাড়বে। আশা করছি বছর শেষে পোশাক খাত খুবই ভালো অবস্থানে যাবে। তবে ছোট যেসব কারখানা আছে, তাদের তৎপরতা এখনই বাড়াতে হবে। কোনোভাবেই দাম কম বলে ক্রেতা ছাড়া যাবে না।’

দাম কম হলেও বুকিং নিতে হবে : বাংলাদেশ থেকে যেসব পোশাক রপ্তানি করা হয় তার অধিকাংশই বেসিক আইটেম। এসব পণ্যে লাভের পরিমাণও সীমিত। কিছু কিছু পণ্যে লাভের হার ২-৩ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালে নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্রেতাই দাম কমিয়েছেন। কোনো কোনো ক্রেতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এ অবস্থায় অনেক কারখানা লোকসান দিয়ে বুকিং দিলেও অনেকে দ্বিধায় পড়েছে।

দীর্ঘদিন এ খাতের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, দাম কম হলেও এই মুহূর্তে সবাইকে যত পারা যায় বুকিং নিতে হবে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে লোকসানের পরিমাণ সক্ষমতার বাইরে চলে না যায়। আর লোকসান কমাতে অন্যান্য খরচ যতটা সম্ভব কমাতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতাদের থেকেও শক্ত দর-কষাকষি করে লোকসান কমিয়ে আনতে হবে। তবে কোনোভাবেই ক্রেতাকে ফেরত দেওয়া যাবে না।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোশাররফ হুসাইন বলেন, ‘করোনা বিশ^ব্যাপী সমস্যা। ক্রেতারাও কিন্তু লোকসান দিচ্ছেন। তাই সবকিছু হিসাব করে আমাদের কাজ নিতে হবে। বর্তমানে কাজের যে হার তাতে বেশির ভাগেরই লোকসান হবে। কিন্তু এটা মন্দের ভালো। বর্তমান দাম দিয়ে যদি খরচের ৯০ শতাংশও ওঠে, তা-ও কিন্তু লাভ। কারণ কাজ না থাকলে তো পুরোটাই লোকসান। এ ছাড়া এখন পোশাক প্রস্তুতকারী সবগুলো দেশই কাজের জন্য মুখিয়ে আছে। তাই ক্রেতারা একবার যদি বাংলাদেশ ছাড়েন, তাহলে কিন্তু তাদের আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।’

একবার দাম কমালে ক্রেতারা আবার পণ্যের দাম বাড়াবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘ছয় মাস পরে যখন মানুষের চাহিদা বাড়বে, তখন এমনিতেই পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। আর এত সস্তায় অন্য কোন দেশ কাজ নেবে? তাই আমাদের এখন যেকোনো মূল্যে ক্রেতাদের ধরে রাখতে হবে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যাতে কাজ নিতে গিয়ে দেশের ক্ষতি না হয়। কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি লোকসান দেওয়া যাবে না। তাও আবার লিন পিরিয়ড পর্যন্ত।’

যেভাবে লোকসানের সমন্বয় করা হবে : পোশাক উৎপাদকরা জানান, কোনো পণ্যে যদি ১০ শতাংশ লোকসান হয় তাহলে তার ভার পুরোটা উৎপাদকের বহন করতে হচ্ছে না। এ খাতে সংশ্লিষ্ট সবার ওপর এর ভার পড়ছে। তাই কারখানার মালিকদের ওপর এককভাবে খুব একটা চাপ সৃষ্টি হবে না।

উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, একটি পণ্যের দাম ৩০ ডলার। এখন ক্রেতা করোনাকালে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা পণ্যটির দাম ২৫ ডলারে নিয়ে আসবেন। এ জন্য তারা ওই উৎপাদন বাবদ দশমিক ৮০ ডলার কমিয়ে ৪ দশমিক ২০ ডলার দিতে চাইলেন। সে ক্ষেত্রে লোকসানের ৮০ সেন্টের সর্বোচ্চ ৩০ সেন্ট সুইং কারখানাকে বহন করতে হবে। বাকিগুলো ফেব্রিকস উৎপাদক, অ্যাকসেসরিজ উৎপাদক ও কেমিক্যাল উৎপাদকের ঘাড়েও পড়বে। কারণ ওই সব কারখানারও এখন কাজ প্রয়োজন। আর এটা যেহেতু একটা চেইন ব্যবসা, তাই সবাই এর ভার নেবেন।

প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন বলেন, করোনায় কিন্তু শুধু রপ্তানি কমেনি। যারা কাঁচামাল উৎপাদন করত, তারাও কিন্তু ক্রেতাসংকটে ভুগছে। আমরা যেমন ক্রেতা ধরে রাখতে চাচ্ছি, তারাও কিন্তু সেটাই চাইবে। তবে সবাই এখন পর্যন্ত দাম না কমালেও কেউ করোনাকালে বাড়ায়নি।’

এ ছাড়া কারখানাগুলো তাদের অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করছে। এর বাইরে কারখানাগুলো তাদের কাপড়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে। আগে যেখানে তুলা থেকে কাপড় প্রস্তুত পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ ওয়েস্টেজ (ঘাটতি) ধরা হতো তা এখন কমিয়ে ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। শ্রমিকরাও যাতে কাপড় নষ্ট না করেন, সেদিকে নজর দিচ্ছেন।

রাজধানীর দক্ষিণখানের একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদেরও কড়া নির্দেশ দিয়েছি যাতে সেলাই করার সময় কোনোভাবেই কাপড় নষ্ট না হয়। উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত