চিলমারীর বন্যা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ০৭:০১ এএম

মানচিত্রে কুড়িগ্রাম জেলা উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। পূর্বদিকে সদরের নুনখাওয়া থেকে উলিপুরের সাহেবের আলগা হয়ে চিলমারীর রমনায়, পশ্চিমে কাউনিয়া থেকে রাজারহাট-উলিপুর হয়ে রমনায় এসে ব্রহ্মপুত্রে মিলেছে তিস্তা। এভাবে উপবৃত্তাকারভাবে দুটি নদী কুড়িগ্রামকে ঘিরেছে। আর একইভাবে দেওয়া হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। ধরলা, দুধকুমোরসহ ছোট-বড় অন্য নদ-নদীগুলো বিপদসীমা অতিক্রম করে পানি বয়ে নিয়ে যায় ব্রহ্মপুত্রে, তখনই বাঁধের ভেতরে আটকে থাকা জীবিত-হারানো নদ-নদী হয়ে ভেতরের শহর-গ্রাম তলিয়ে যায়। চিলমারী সবচেয়ে ঢালু এলাকা হওয়ায় সমস্ত পানির চাপ এসে চিলমারীতে পড়ে। তখন জলাবদ্ধতাকে আমরা বন্যা বলে ডাকি।

কেন চিলমারীর নাম বারবার ওঠে : কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়ক। এটাই জেলা বোর্ডের সড়ক। উলিপুরের পরের উপজেলাই চিলমারী। এই সড়ক ধরে উলিপুর থেকে যত দক্ষিণে যাওয়া যায়, ততই চারদিকে পানির রাজ্য টের পাওয়া যায়। এই সড়কের আড়াআড়ি ও দুদিক থেকে কয়েকটি নদীর পানি গিয়ে চিলমারীতে গিয়ে থেমেছে। উলিপুরের গুনাইগাছ মোড় থেকে বজরা যাওয়ার পথে অটোতে কথা হলো নাছিমা বেগমের সঙ্গে। বয়স ৫০-এর আশপাশে হবে। তিনি চিলমারী-সংলগ্ন উমানন্দ থেকে বজরা বাপের বাড়ি যাচ্ছেন। ‘বান্দের ওপাশে নদীর পানি সকালে আসি বিকেলে যায়। আর এইগলে পানি জমিদারি পানি। পানি দেখি চকচান্দা (কিংকর্তব্যবিমূঢ়) খায়া গেছি!’ বলছিলেন নাছিমা বেগম। বজরার গাবতলী বাজার। যে সড়ক ধরে আসছিলাম তা বাজারের পেছনে মানাস নদ অতিক্রম করে তিস্তায় গিয়ে ঠেকেছে। এই মানাস নদে দেবী চৌধুরানীর বজরা ডুবে গিয়ে জায়গাটির নাম হয়েছে বজরা। যেমনভাবে এই বাজারের গাবের গাছটির কারণে নাম হয়েছে গাবতলী। এখান থেকে পুবদিকে আরেকটি সড়ক চলে গেছে চিলমারী সদরে। পুরো সড়কটি এক কোমর পানিতে ডুবে আছে। পূর্বদিকের সড়কটির নিচ দিয়ে মাইলডাঙ্গা নদীসহ তিন-চারটি নদী মিলেমিশে চিলমারীর পাত্রখাতা সøুইসগেটে গিয়ে পড়েছে। ফলে বন্যা হলেই চিলমারীর নাম চলে আসে। আহা চিলমারী! এমন নাম চিলমারীবাসী চায় না।

গড়ে অর্ধডজন নদীর জন্য একটি স্লুইসগেট : ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে গত ২১ জুলাই স্থানীয় রেডিও চিলমারীর কর্মী আশিক ও তার বন্ধুরা স্লুইসগেটের উভয় পাশের পানির উচ্চতা মেপেছেন। তাতে তফাৎ দেখেছেন ৩৭ ইঞ্চি। তখন তিস্তায় বিপৎসীমার ওপরে পানি ছিল ৩০ সেমি। এই গেটটিতে মানাস, মাইলডাঙ্গাসহ কয়েকটি নদী এসে মিলেছে। তেমনিভাবে রানীগঞ্জের কাঁচকোল গ্রামের স্লুইসগেটের সামনে বুড়িতিস্তায় এসে মিলেছে দেউতি নদী আর রানীগঞ্জের উত্তরে যমুনা বাজারে যমুনা এসে মিলেছে দেউতিতে। এ ছাড়া দুর্গাপুর হাটের দুই পাশে বামনি ও চণ্ডিজনের প্রবাহও যুক্ত হয়েছে। নদ-নদীর মুখে স্লুইসগেট দেওয়া মানে নদীকে হত্যা করা। আর বাঁধ যে বন্যা প্রতিরোধে অকার্যকর, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আসলে বাঁধ অপসারণ, ব্রিজ-কালভার্টগুলো আরও প্রশস্ত করা এবং প্রবাহের মুখ থেকে স্থাপনাগুলো অপসারণ করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, পানি রেগুলেটরগুলো দিয়ে বের হচ্ছে। মূল সমস্যা হচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে ব্রিজ-কালভার্টগুলো নির্মাণ না করায় স্লুইসগেটের মুখে পানি আসতে পারছে না। নদ-নদীর মুখে স্লুইসগেট বসলে তা কি নদী থাকে? তখন হয়ে ওঠে খাল, তারপর দখল, তারপর ভরাট। কিছুদিন আগে হাইকোর্ট নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা বলে ঘোষণা করেছে, তাহলে নদ-নদী হত্যার দায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কি নিবে?

বিপদের নাম ইটভাটা ও জলাভূমি ভরাট : নিরাশার বন্ধ, মাচাবান্দা, মাইলডাঙ্গার বিল, শরীফের হাটের দুই পাশের বিলসহ চিলমারীর প্রত্যেকটা বিলে কোথাও একটি, কোথাও তিনটি পর্যন্ত ইটভাটা। যেখানে ইটভাটা নেই, সেই জায়গাগুলো থেকে মাটি তুলে ইটভাটায় আনা হয়। এতে প্রতি বছর বিলগুলো দু-তিন ফুট নিচু হচ্ছে ক্রমে। ইতিমধ্যে আগের চেয়ে নিচু হয়ে গেছে তিন-চার ফুট। ফলে নদ-নদী সামান্য পানিতেই উপচে গেলেই বিলগুলোতে পানি প্রবেশের পর আটকে যায়, অন্যদিকে সাধারণ বৃষ্টিপাতেই গ্রামের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে বালু ব্যবসায়ীদের প্রলোভনে পুকুর-দিঘিগুলো ভরাট করা হচ্ছে। ফলে নিজ নিজ বাড়ির বৃষ্টির পানিটুকুও রাখার ভাণ্ডার আর নেই। পানি যে ব্রহ্মপুত্রে, তিস্তায় যাবে, সে পথও তো থাকেনি।

আপদ যেখানে প্রভাবশালীরা : পেদীখাওয়ার বিল। রমনা সরকারবাড়ি, উত্তর রমনা, রাজারভিটা, পুঁটিমারী-কাজলডাঙ্গা, বহরেরভিটাসহ ছয়-সাতটি গ্রাম এই বিলের চারদিকে। সবগুলো গ্রাম থেকে বৃষ্টির পানি চলে আসে এখানে। এখন এখানে ঘরে ঘরে পানি। কোথাও এক হাত, কোথাও আধা হাত। এই বিলের পুবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। উত্তর দিকের কোনায় একটি সেতু ও পশ্চিমে রেললাইনের দিকে আরেকটি সেতু। কিন্তু রেললাইনে কোনো সেতু না থাকায় প্রতি বছর রেললাইন ধসে গিয়ে পানি বের হয়ে যায়। রেললাইন না ভাঙলে পানি বেরোতে পারে না ওই সেতুটি দিয়ে। আর বিলের উত্তর-পশ্চিম কোনায়, মাটি কাটার দিকে যে সেতুটি আছে, সেটাই মূলত পানি বেরোনোর পথ। কিন্তু সেতুর মুখে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের স্ট্যান্ড বানানো হয়েছে। তারপর সেতুটির ঠিক পেছনেই নালাটির একাংশ দখল করেছে একটি হাফেজি মাদ্রাসা ও বর্তমান থানাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তারপরই নালার ওপরই গড়ে উঠেছে মার্কেট। এরপর রানীগঞ্জ যাওয়ার সড়কে হেলিপ্যাডসংলগ্ন সেতুর পেছনেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের নতুন ভবন ও ব্যক্তি মালিকানাধীন কয়েকটি দোকান। ফলে সেতুগুলোর মুখে এসেই পানি আটকে যাচ্ছে। একই অবস্থা রমনা পানাতিপাড়া, থানাহাটের হরিশ্বের ডেরা, মণ্ডলপাড়া, ছোট কুষ্টারী, কাঁচকোলের বিলগুলোর। সবখানেই কালভার্টগুলোর মুখ দখল করে স্থাপনা গড়ে উঠেছে। মানুষ পানিতে ভাসে কিন্তু কর্তারা কেন ভাসছে তা জানেন না। শুধু জানেন, যত ব্রিজ-কালভার্ট তত উন্নয়ন তত জিডিপি। নদ-নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি থেকে দেশের মানুষকে যত বিচ্ছিন্ন করা যায়, তত শান শওকত।

লেখক : রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত