রাম মন্দিরের ‘ভূমি পূজন’ অনুষ্ঠান ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) যে বিশাল রাজনৈতিক ফায়দা এনে দিল তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে আপনাদের আমার মতো অযোধ্যায় যেতে হতো। মন্দির নির্মাণ ও বাবরি মসজিদ তৈরির জন্য বিকল্প স্থান দেওয়ার সিদ্ধান্তটা হয়তো আদালতই দিয়েছে। কিন্তু বিজেপি ও এর সমর্থকদের জন্য সাফল্যটা পুরোটাই নরেন্দ্র মোদি সরকারের। অযোধ্যার রাস্তাঘাট ব্যাপকভাবে গেরুয়ায় সজ্জিত করা হয় এ উপলক্ষে। ছিল বেলুন, ফেস্টুন আর পতাকার ছড়াছড়ি। তবে বেশি প্রভাব বিস্তার করা দৃশ্যমান ছবিটি ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদির। তিনি যেন আক্ষরিকভাবেই শহরের ওপরে জুড়ে বসেছিলেন বড় বড় হোর্ডিং আর প্রতিটি বিদ্যুতের খুঁটিতে সাঁটা পোস্টার থেকে। লাখো রামভক্তের কাছে দিনটি ছিল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ভরা। তবে খোলাসা করে না বললেও এর রাজনৈতিক বার্তাটি এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ ছিল না কোনো। আর সেটি হচ্ছে : মোদি ম্যাজিক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি শক্তিশালী।
উদারপন্থি আর প্রগতিশীলরা বিজেপির এই আস্ফালন নিয়ে হা-হুতাশ করেছেন। ওই সময়ের অন্য বড় ঘটনাটিকে (জম্মু-কাশ্মীর বিষয়ক আর্টিকেল ৩৭০ বাতিলের বর্ষপূর্তি) প্রায় পুরোই উপেক্ষা করে অযোধ্যা নিয়ে মূলধারার প্রচারমাধ্যমের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয়ের নিন্দাও করেছেন তারা। তবে অপ্রিয় সত্যিটা হচ্ছে কাশ্মীর থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত শুধু বিজেপির রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টিই ফুটে ওঠেনি, প্রকট হয়ে উঠেছে বিকল্পধারার রাজনীতির চূড়ান্ত ব্যর্থতাও।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে থাকা অন্য রাজনৈতিক নেতাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে মন্দির বিষয়ে ‘আমিও আছি’ বলতে ছাড়েননি। বলার ভঙ্গিতে অবশ্য সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। রাহুল গান্ধীর মতো কেউ কেউ অবতার রাম আসলে কীসের প্রতীক সে সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে টুইট করেছেন। তবে কংগ্রেসের বেশিরভাগ নেতাই মরিয়া ছিলেন কৃতিত্বের ভাগ পেতে। এ দলেরই প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় রাজীব গান্ধী প্রথম অযোধ্যার বিরোধপূর্ণ স্থানের ফটক খুলে দিয়েছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীর বিষয়ে কয়েকজন স্বতন্ত্র রাজনীতিক (তাদের অন্যতম পি চিদাম্বরম) ছাড়া তেমন কেউ কোনো অর্থবহ বা লক্ষণীয় বিকল্প ভাষ্য দেননি। অযোধ্যা বা কাশ্মীর যা-ই হোক না কেন, কার্যত এই দিনটির রাজনৈতিক আখ্যানের একচ্ছত্র রচয়িতা ছিল বিজেপিই। বিরোধী দলগুলো একান্তে অভিযোগ করে যে, তাদের জানানো কোনো প্রতিক্রিয়াই যথেষ্ট ভালো বলে মনে করা হয় না। যদি তারা জম্মু ও কাশ্মীরের ঘটনাপ্রবাহ বিষয়ে আপত্তি জানায় তবে তাদের বলা হয় দেশবিরোধী। যদি তাল মিলিয়ে চলে তাহলে আবার বলা হয় সস্তা অনুকরণকারী। নেহরুবাদের পথে চললে বলা হয় গৎবাঁধা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। আবার ধর্মীয় প্রতীকবাদকে সমর্থন করলে ছদ্ম-উদারপন্থি বলে ছাপ্পা মেরে দেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলোর এই হা-হুতাশ করা বন্ধ করতে হবে। তাদের ব্যর্থতার আসলে রয়েছে দুটি দিক : মোদিকে মোকাবিলা করতে পারেন এমন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি এবং একটি অনন্য ও গ্রহণযোগ্য বয়ান তুলে ধরতে না পারা। আপনি নিজেকে যার বিরুদ্ধে লড়ছেন তারই আলোকে কিংবা তার সম্পূর্ণ বিরোধী হিসেবে এ দুটির কোনোভাবেই চিত্রিত করতে পারবেন না। এটি করে আপনি যা প্রকাশ করবেন তা হলো, আপনার নিজের হয়ে কিছু বলার নেই। অথবা আপনি মানুষকে কী বার্তা দিতে চান সে সম্পর্কে নিজেই নিশ্চিত নন।
ভারতের আদর্শিক বামেরা হয়তো গিরগিটি কায়দায় রং বদলানো কংগ্রেসের চেয়ে বিশুদ্ধ বা আরও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু নির্বাচন এবং রাজনীতির বেলায় তা-ও তেমন কার্যকর নয়। বেশিরভাগ প্রগতিশীল তাদের সমস্ত আক্রমণের শক্তি ব্যয় করে এমন লোকদের বিরুদ্ধে যাদের তারা যথেষ্ট ক্রুদ্ধ বা বামপন্থি মনে করেন না। অথচ সাংবিধানিক উদারপন্থার নতুন ভাষা খুঁজে পেতে তারা ওই শক্তিকে কাজে লাগাতে পারতেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বামপন্থিরা যাদের আক্রমণ করে ডানপন্থি শিবিরও তাদের ওপরই চড়াও হয়। এতে হিসাবের খাতায় ফল হয় শূন্য।
জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা হারানোর বার্ষিকীর দিনেই রাম মন্দিরের ভূমি পূজনের সময়টি পড়া কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এর মাধ্যমে বিজেপি ইঙ্গিত দিয়েছে, এর দুটি মূল আদর্শিক প্রতিশ্রুতি শুধু সম্পন্নই হয়নি, এগুলোর পক্ষে রয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন। এমনকি কাশ্মীরে, যেখানে মূলধারার রাজনীতিবিদদের আটকের বিষয়টি প্রশাসনের সবচেয়ে নাজুক সিদ্ধান্ত ছিল, সেখানেও দলগুলো জনগণের সমর্থন টানতে বা স্থানীয় ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছিল। নীতিগতভাবে ভুল হওয়া ছাড়াও মূলধারার এরকম প্রান্তিককরণ আমার দৃষ্টিতে খুব বিপজ্জনক। তবে বিজেপিকে এখন পর্যন্ত এর জন্য কোনো রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়নি।
যে ধারণাটির সঙ্গে আপনি দ্বিমত পোষণ করেন অধিকতর ভালো একটি ধারণা দিয়েই তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আপনি যে বার্তাটিকে ঘৃণা করেন সেটিকে পরাস্ত করতে হবে আরও শক্তিশালী একটি বার্তা দিয়ে। আপনি যে আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করেন তার সঙ্গে লড়তে হবে আরও সৃষ্টিশীল কিছু ভাবনা দিয়ে। ভুয়া খবর, হোয়াটসঅ্যাপ প্রচারণা এবং ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির যুগে কেতাবি সেকেলে ঠিক-বেঠিকের নীতি দিয়ে সুবিধা করতে পারবেন না। নির্বাচনের সঙ্গে নৈতিকতা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের বিরোধী দল নিজেদের হয় বিজেপিরই এক ছোটখাটো সংস্করণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে, না হয় ইতিমধ্যেই হাল দেবে বলে ঠিক করেছে, কিংবা নতুন রাজনীতিকে মোকাবিলা করছে সেকেলে, মরচেপড়া হাতিয়ার দিয়ে। এ তিন কৌশলের সবগুলোই ব্যর্থ হতে বাধ্য। ভারতের এখন দরকার নতুন বিরোধী দল।
লেখক : ভারতের টিভি সাংবাদিক ও লেখক
হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
