কক্সবাজারের মহেশখালীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একটি মৃত্যুর ঘটনায় টেকনাফ থানার সদ্য সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি খারিজ করে দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তিন বছর আগের ওই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে করা মামলাটি তদন্ত করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মহেশখালী আমলি আদালতের বিচারক মো. আব্বাসউদ্দিন এ আদেশ দেন।
তিন বছর আগে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের পূর্ব মাঝেরপাড়ার আবদুস সাত্তারকে হত্যা করা হয় বলে তার স্ত্রী হামিদা আক্তার গত বুধবার আদালতে অভিযোগ জমা দেন। এতে প্রদীপ কুমার দাশ ছাড়াও পুলিশের আরও পাঁচ সদস্যকে আসামি করা হয়। তারা হলেন মহেশখালী থানার সাবেক এসআই হারুনুর রশীদ ও ইমাম হোসেন, এএসআই মনিরুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম ও আজিমউদ্দিন। প্রদীপ কুমার দাশসহ পুলিশের ছয় সদস্যের পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ফেরদৌস চৌধুরীসহ তার বাহিনীর ২৩ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বাহিনীর প্রধান ফেরদৌস চৌধুরীকে প্রধান আসামি করা হয়। আর প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় ২৪ নম্বর আসামি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী শহীদুল ইসলাম জানান, বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক আব্বাসউদ্দিন হামিদার করা ফৌজদারি দরখাস্তটি আমলে নিতে অপারগতা জানিয়ে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে করা রিট রয়েছে। এ কারণে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যা মামলাটি এএসপি পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন সিআইডি কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন বিচারক।
হামিদা আক্তার জানান, ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে ফেরদৌস বাহিনীর সহায়তায় হোয়ানকের লম্বাশিয়া এলাকায় তার স্বামী আবদুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও তা নেওয়া হয়নি। থানা মামলা না নেওয়ায় ওই বছরের জুলাই মাসে স্বজনরা উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন। তখন পিটিশনটি ‘ট্রিট ফর অ্যাফায়ার’ হিসেবে গণ্য করতে আদেশ দেয় আদালত। সেই আদেশের আলোকে হত্যা মামলা নথিভুক্ত করতে হামিদা একই বছরের ১৭ জুলাই কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে লিখিত দরখাস্ত দেন। কিন্তু পুলিশ আবেদনটি আমলে নেয়নি।
প্রদীপসহ অন্য আসামিদের এখনো রিমান্ডে নেয়নি র্যাব : সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার মামলার আসামি চার পুলিশ সদস্য এবং ওই ঘটনায় পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষীকে সাত দিনের রিমান্ডের জন্য র্যাব হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে র্যাবের একটি দল আসামিদের রিমান্ডে নিতে কক্সবাজার জেলা কারাগারের ফটকে যায়। কিন্তু সেখানে আধা ঘণ্টা অবস্থান করে তারা আসামিদের না নিয়েই ফিরে যায়।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার মোহাম্মদ মোকাম্মেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনহা হত্যা মামলায় আটক আসামিদের মধ্যে সাত আসামিকে র্যাব রিমান্ডে নেওয়ার জন্য আসে। পরে র্যাব জেলগেট থেকে ফেরত যায়।’ তবে কী কারণে র্যাব সদস্যরা আসামিদের না নিয়েই ফেরত গেছেন সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এ কারা কর্মকর্তা।
গতকাল যে সাতজনকে রিমান্ডে নেওয়ার কথা ছিল তারা হলেন কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন ও এএসআই লিটন মিয়া এবং পুলিশের করা মামলার সাক্ষী মো. নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ।
এদিকে সিনহা হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে রিমান্ড আদেশের সাত দিন পরও হেফাজতে নিতে পারেনি র্যাব। গত ৬ আগস্ট এ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিনহা হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুল আলম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনে উল্লেখ আছে যেকোনো আসামিকে যদি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত, সেই মামলার তদন্তকারী সংস্থা বা কর্মকর্তা যেদিন থেকে রিমান্ডের জন্য হেফাজতে নিয়ে যাবে বা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে সেদিন থেকেই রিমান্ডের দিন গণনা শুরু হবে।’
কেন প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী এবং এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে রিমান্ডের জন্য হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে এ আইনজীবী বলেন, ‘সেটা সম্পূর্ণ তদন্তকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করবে। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
গত ৩১ জুলাই রাত ১০টার দিকে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান। গত ৫ আগস্ট ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ নয়জনকে আসামি করে সিনহার বোন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন। পরদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকতসহ সাত পুলিশ সদস্য। সেদিন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী এবং এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড এবং অন্য আসামিদের দুদিন করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেয় আদালত।
