প্রায় দুই বছর আগে ‘বস্ত্র আইন ২০১৮’ পাস হলেও কেবল কাগজেই রয়ে গেছে আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস। বস্ত্রশিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এটি দ্রুত চালুর তাগিদ দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যবসায় পরিবেশ সূচকের উন্নতিতে সব সেবা একস্থান থেকে দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। অথচ বস্ত্র অধিদপ্তর ব্যস্ত বস্ত্রশিল্প পরিদর্শন বিধি তৈরি নিয়ে, যা নিয়ে আপত্তি কারখানার মালিকদের।
বস্ত্র অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজ রবিবার বস্ত্রশিল্প পরিদর্শন নির্দেশিকার বিধিমালা চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন কমিটি বৈঠকে বসবে। এ সপ্তাহেই হয়তো এটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস বিধির চূড়ান্ত খসড়া কবে হবে তা জানে না কেউ। এমনকি এই সার্ভিসের মাধ্যমে কী কী সেবা দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়েও অন্ধকারে বস্ত্র অধিদপ্তর।
বস্ত্র আইনের ৬ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, ‘বস্ত্রশিল্পসংশ্লিষ্ট কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক সব সেবা, সুবিধা, প্রণোদনা, অনুমতি, ছাড়পত্র, লাইসেন্স, পারমিট ইত্যাদি প্রদান দ্রুত নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস কেন্দ্র থাকিবে।’ আইনের ১ নম্বর ওয়ান স্টপ সার্ভিস ধারার ২ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘ইহা অবিলম্বে কার্যকর হইবে।’ আইনে সুতা উৎপাদন থেকে শুরু করে পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বস্ত্রশিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এর তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বস্ত্র অধিদপ্তরকে। আলাদা বিধির মাধ্যমে এই আইন প্রয়োগ হবে।
বস্ত্রশিল্প পরিদর্শন নির্দেশিকা বিধি প্রণয়ন কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনবল না থাকায় ওয়ান স্টপ বিধিমালা করতে পারছি না। খুব শিগগির এটা নিয়ে কাজ শুরু করব। আপাতত যত দ্রুত সম্ভব বস্ত্রকল পরিদর্শন বিধিমালাটা করার চেষ্টা করছি। একবার একটা খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। মন্ত্রণালয় সেটাকে আবার কারেকশনে দিয়েছে। এখন আবার ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। আশা করছি এ সপ্তাহেই চূড়ান্ত হবে।’
সূত্র জানায়, আইন পাসের পর তিন দফায় তিনজন পরিচালক বিধিমালার খসড়ার পরিবর্তন করেছেন। সবশেষ গত বছরের ২৫ নভেম্বর বস্ত্র আইন ২০১৮-এর বিধিমালা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস বিধিমালা ও বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন নির্দেশনার খসড়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তখন সংশ্লিষ্ট মালিক সংগঠনকে ১০ দিনের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। মালিক সংগঠনগুলো পরিদর্শন নির্দেশিকার বিধিসহ বেশ কিছু কার্যক্রমে আপত্তি তোলে। একই সঙ্গে ওয়ান স্টপ সার্ভিস দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানায় তারা।
আপত্তিতে বলা হয়, বর্তমানে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) ও ক্রেতারা নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করছেন। অ্যাকর্ডেরও বিকল্প আছে। তাই নতুন করে আরেকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে গেলে হয়রানি ও ভোগান্তি বাড়বে, যা ব্যবসায় পরিবেশ সূচকের উন্নত করার যে প্রচেষ্টা চলছে তা বাধাগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া দেশে ব্যবসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এই মুহূর্তে ওয়ান স্টপ সার্ভিস খুব জরুরি। এটা করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও হয়রানি কমবে।
শিল্প মালিকদের এসব আপত্তি ও মতামত উপেক্ষা করেই অধিদপ্তর নিজেদের মতো করে কাজ করছে বলে অভিযোগ করছে মালিক সংগঠনগুলো। তারা বলছে, অধিদপ্তরের কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপন্থী। এটা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসার পরিবেশ আরও খারাপ হবে। ঘুষ লেনদেন আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে নিবন্ধন নেওয়ার সময় অনেক কারখানার মালিককে ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পোশাক শিল্প মালিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক ও বস্ত্র অধিদপ্তরের দেখভালের দায়িত্বে থাকা শহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘নতুন করে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা কী? এতে তো হয়রানি আরও বেড়ে গেল। এই যে চীন থেকে এত উদ্যোক্তা সরে যাচ্ছে তারা বাংলাদেশে আসছে না কেন? কারণ, এখানে সবকিছুতেই হয়রানি। ক্রেতারা স্যাম্পল পাঠালে সেটি রিসিভ করতেও পাঁচ দিন লাগে। আর হয়রানি তো আছেই। এমন প্রতিটি স্তরে সমস্যা। সেগুলো সমাধান না করে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আবারও পরিদর্শন করলে এতে কি পরিবেশের উন্নতি হবে না ভোগান্তি হবে?’
এই মুহূর্তে ওয়ান স্টপ সার্ভিস খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের পরিচালক ফজলে শামীম এহসান। বস্ত্র অধিদপ্তরের এটা বস্তবায়নে সদিচ্ছা ও সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এহসান বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলেছি, একই বিষয়ে তথ্য নেওয়ার জন্য সরকার কেন বারবার জনগণের টাকা অপচয় করবে? বস্ত্র খাতের দায়িত্ব তাদের দিয়ে যা হয়েছে তা হলো, নতুন করে আরেকটি ঝামেলা ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। নতুন করে নিবন্ধন, নতুন পরিদর্শন, তাদের ঘুষের জন্য নতুন বরাদ্দ। বস্ত্র মন্ত্রণালয় নতুন কোন বিষয়ে পরিদর্শন করবে, যেটা শ্রম মন্ত্রণালয় করে না, বিষয়গুলো পরিষ্কার করে তারপর বিধি প্রণয়ন করা হোক।’ এসব বাদ দিয়ে কীভাবে এক স্থান থেকে সেবা দেওয়া যায় অধিদপ্তরের সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে জানান তিনি।
ওয়ান স্টপ সার্ভিসে কেমন সেবা চান? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের অনুমোদন ও তদারকি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে চাই। সেটা বস্ত্র অধিদপ্তর হোক বা অন্য কোনো অধিদপ্তর। ৭-৮টা মন্ত্রণালয় দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের পায়ের তলা ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই একটি ভবনে সব সেবা। আমরা আবেদন করব। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সবকিছু সংগ্রহ করে সর্বোচ্চ কম সময়ে আমাদের সরবরাহ করবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস বলতে কিন্তু এটাই বোঝায়।’
ব্যবসায়ীরা ওয়ান স্টপ সেবা যেমন চাইছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার সবটুকু সম্ভব নয় বলেই মনে করেন বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিলীপ কুমার সাহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব সেবা তো আমরা দিতে পারব না। আমাদের তো সবগুলো করার মতো সক্ষমতা নেই। বিদেশে দেখেছি এক স্থানে আবেদন করে টেবিলে টেবিলে না দৌড়িয়ে একত্রে সবকিছু পায়। কিন্তু আমাদের এখানে কতটুকু করতে পারব, সেটা বিধি প্রণয়নের পরে বোঝা যাবে। এখন এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারব না। বিধির খসড়া নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সবাই মতামত দিয়ে এটা চূড়ান্ত করলেই বোঝা যাবে কতটুকু করতে পারব।’
পরিদর্শনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একেক প্রতিষ্ঠান একেক কারণে পরিদর্শন করবে। আমরাও নতুন করে করব। এতে ভোগান্তি হওয়ার কী আছে? আমরা কাদের অনুমোদন দিচ্ছি, সেটা আমরা দেখব না? আর ব্যবসায়ীরা যে হয়রানির আশঙ্কা করছেন, আগে তো হয়রানি হোক। এরপরে দেখা যাবে।’
