ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হয়েছে গতকাল শনিবার। দিনটি উপলক্ষে ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক বাড়ির সামনের সড়ক লোকে লোকারণ্য ছিল। করোনাভাইরাস দুর্যোগ থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক নিবেদনে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় দেখা যায়। পুষ্পস্তবক ও ফুল দিয়ে মানুষ একে একে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার তৃপ্তি ছিল অনেকের চোখে-মুখে। অনেকে মুখেও প্রকাশ করেছেন সেই ভাব। লালবাগ থেকে ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে আসা প্রবীণ আবুল কালাম এমন মন্তব্যই করেছেন। মিরপুর থেকে বাবা সাইফুলের সঙ্গে আসা কন্যা সন্তান সুমাইয়াও বলেছে, সে এসেছে জাতির পিতার সঙ্গে দেখা করতে!
এমন ভালোবাসা আর ফুলেল শ্রদ্ধার্ঘ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবারও স্মরণ করল বাঙালি জাতি। শনিবার রাজধানীর ধানম-িতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বাংলাদেশের স্থপতি, হাজারবছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টে শহীদদের কবরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এবারের শোক দিবসের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। এ নিয়ে নানান প্রস্তুতি থাকলেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেকটা সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে পালন করা হয়েছে এবারের শোক দিবস। আর করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশব্যাপী বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ায় এর মধ্যে শোক দিবসের আয়োজনে ভাটা পড়েছে। প্রতিবার ১৪ আগস্ট মধ্যরাত থেকেই নানান আয়োজন চোখে পড়ত। ১৫ আগস্ট সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় থাকত। তবে করোনার কারণে সেটা কম দেখা গেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে কাঙালিভোজ আয়োজন করা হতো। তবে এবার সেটাও কম দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন ছিল উল্লেখযোগ্য। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নানান কর্মসূচি পালন করেছে।
শনিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোয় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি। সকাল সাড়ে ৫টার দিকে ধানম-ি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের পর এই মহান নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর।
পরে ১৫ আগস্টের শহীদদের রুহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু ভবনের ভেতরে যান। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বনানী কবরস্থানে যান। সেখানে তিনি তার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্টের অন্য শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় ১৫ আগস্টের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সকাল ৮টায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর, কৃষকলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগে নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু ভবনে সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ও বনানী কবরস্থানে শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এদিকে করোনার কারণে এবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া যেতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামাধিসৌধের বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী। এ সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের নিহত সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান নেতার্মীরা।
এসময় প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, মির্জা আজম, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এমপি, আফজাল হোসেন, সদস্য সাহাবুদ্দিন ফরাজী, আনিসুর রহমান, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খানসহ জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বেলা ১১টায় সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া মাহফিলে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালন করেন।
মেয়র সকাল সাড়ে ৯টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। বেলা সাড়ে ১০টায় কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম বনানী কবরস্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও অন্য শহীদদের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। বনানী কবরস্থানে তিনি শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন।
এ সময় ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই, সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া, অন্যান্য কর্মকর্তা, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরগণ উপস্থিত ছিলেন। সেমিনার, প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে সংস্কৃতি অঙ্গনে মাসব্যাপী জাতীয় শোক দিবস পালিত হচ্ছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. বদরুল আরেফীন বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) মো. আব্দুল মান্নান ইলিয়াস এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
গতকাল দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সরকারি-বেসরকারি রেডিও ও টিভি চ্যানেলগুলো দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
