হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যাওয়া খালাতো ভাই হাসেমের জানাজায় অংশ নিতে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী যাচ্ছিলেন দুই ভাই শাহজাহান ও শারফুল। সঙ্গী হয়েছিলেন তাদের মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ ১৪ স্বজন। কিন্তু পথে মাইক্রোবাসটির চালকের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তাদের মধ্যে আটজনের প্রাণ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ময়মনসিংহ-শেরপুর সড়কের ফুলপুর উপজেলার বাঁশাটি এলাকায় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় শাহজাহান ও শারফুল প্রাণে বেঁচে গেলেও চিরতরে হারিয়েছেন মা ও শিশুসন্তানসহ আট স্বজনকে। নিজেদের চোখের সামনেই স্বজনদের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না শাহজাহান ও শারফুল। বোবা কান্নার পাষাণভারে তারা স্তব্ধ। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চালকের ভুলে তাদের জীবনে এমন কঠিন শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে কোনোমতেই তা মানতে পারছেন না।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন শামসুল হক (৬৫), নবী হোসেন (৩০), মিলুয়ারা বেগম (৫৫), রিপা খাতুন (৩০), রেজিনা খাতুন (৫৩), পারুল আক্তার (৫০), মোসাম্মৎ বেগম (৩০) ও বুলবুলি আক্তার (৭)।
ফুলপুর থানার ওসি ইমারত হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, শেরপুরের নালিতাবাড়ীর বারমারি গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাসেম (৩৮) গত সোমবার রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে খালাতো ভাই শাহজাহানসহ ভালুকায় থাকা স্বজনরা জানাজায় অংশ নিতে একটি মাইক্রোবাসে করে নালিতাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হন। পথে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ফুলপুর ছনধরা ইউনিয়নের বাঁশাটি গ্রামে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায় মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো চ-১৯-২৩৯৯)। খবর পেয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ চালান পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেড সদস্যরা। এ সময় শিশুসহ আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন শাহজাহানের মা মিলুয়ারা বেগম, স্ত্রী মোসা. বেগম ও সাত বছর বয়সী শিশুসন্তান বুলবুলি আক্তার। দুর্ঘটনার পর জীবিত উদ্ধার হয়েছেন শাহজাহান (৪০), তার ভাই শারফুল (৩৬), মিজান (২৮), হাবিব (৫৫), রাজু (২৭) ও রতন (৫৫)। নিহতদের সবার বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা ও গফরগাঁও উপজেলায়। তারা সবাই একে অন্যের আত্মীয়।
বাবার বুকে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ল শিশু বুলবুলি : নিজের শিশুসন্তান বুলবুলিকে বাঁচানোর জন্য সব চেষ্টাই চালিয়েছেন বাবা শাহজাহান। সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি পুকুরে পড়ে ডুবে শিশুসন্তান বুলবুলি প্রাণ হারালেও মানছিল না বাবার মন। দুর্ঘটনার পর নিজের আদরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আর্তনাদ আর আহাজারিতে শাহজাহান ভারী করছিলেন সেখানকার বাতাস। এমন একটি ছবি গতকাল সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই সেই ছবিসহ ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লেখেন, ‘সন্তানকে বুকে জড়িয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন বাবা শাহজাহান।’ কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে বাবা শাহজাহান প্রাণে বেঁচে গেছেন। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে ছাড়াও পেয়েছেন। কিন্তু চিরতরে হারিয়েছেন আদরের সন্তান বুলবুলিকে। মূলত বাবার বুকেই অন্তিম যাত্রা হয়েছে বুলবুলির।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া বাবার বুকে সন্তানের বেদনার্ত ছবিটি সবার হৃদয়ে দাগ কেটেছে। বাবা শাহজাহান বেঁচে আছেন। কিন্তু অনেকেই না বুঝে বাবা-সন্তানের মৃত্যুর দৃশ্যের ছবি বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এ ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতেই আমরা ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছি।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মাইক্রোবাস সড়কের পাশের পুকুরে ডুবে গেলে নিজ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রক্ষার শেষ চেষ্টা করেন বাবা শাহজাহান। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার টিম যখন তাদের পানি থেকে উদ্ধার করে তখনো প্রাণ হারানো মেয়েটিকেই বুকে জড়িয়ে শোকতাপ করছিলেন শাহজাহান।
সড়কে আরও দুজন নিহত : এদিকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ভটভটি উল্টে হাসান আলী বাবু (৪৫) নামে এক গরু ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন। গতকাল সকালে আক্কেলপুর-জয়পুরহাট সড়কের মাতাপুর চারমাথা নামক স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বাবু আক্কেলপুর পৌরসভার বেলকু-ি গ্রামের ইসমাইল সরদারের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকালে সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে গরু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ভটভটিযোগে পাঁচবিবি গরুর হাটের উদ্দেশে রওনা হন বাবু। পথে আক্কেলপুর-জয়পুরহাট সড়কের মাতাপুর চারমাথা নামক স্থানে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাইসাইকেলকে সাইড দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভটভটিটি রাস্তার পাশে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই বাবুর মৃত্যু হয়। আক্কেলপুর থানার ওসি আবদুল লতিফ খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
দিনাজপুরের হাকিমপুরে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্বপন হোসেন (৩২) নামে এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হয়েছেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার মহেশপুর ঘাট নামক ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্বপন বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মথুরা গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে। হাকিমপুর থানার ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বন্ধু সোহেলকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বগুড়া থেকে হিলিতে আসছিলেন স্বপন। পথে মহেশপুর ঘাট নামক ব্রিজের পাশে মোটরসাইকেলটির সঙ্গে বিপরীতমুখী একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই স্বপনের মৃত্যু হয়। আহত সোহেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় চালকসহ ট্রাকটি জব্দ করা হয়।
