শেয়ারহোল্ডারদের বঞ্চিত করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শতাধিক কোম্পানি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে ঋণ দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিলেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বিনা সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে ঋণ দিয়েছে। যদিও ব্যাংকঋণের সুদ বহন করতে গিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিট মুনাফা কমে যাচ্ছে। সুদ বাবদ ব্যয় বাড়ায় কোনো কোনো কোম্পানি পড়েছে লোকসানে। এতে করে প্রকৃত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শেয়ারহোল্ডাররা। বেআইনিভাবে বিতরন করা এসব ঋণের অর্থ এখন মূল কোম্পানিতে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।
শুধু ঋণ নয়, শেয়ার মানি ডিপোজিটের আড়ালেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বিনা সুদে বিপুল পরিমাণের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ করে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে রেখেছে ওষুধ খাতের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানি। হাসপাতালের উন্নয়নে শেয়ার মানি ডিপোজিট হিসেবে সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এ অর্থ ব্যবহার করতে দিলেও ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নেয়নি। ওষুধ খাতের আরেকটি কোম্পানি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনা সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বিপুল পরিমাণের ঋণ দিয়েছে। এ কারণে কোম্পানিটির সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়তে হয়েছে।
একইভাবে ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় দুই কোম্পানি একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনা সুদে বিপুল পরিমাণের ঋণ দিয়েছে। যদিও ওই দুই তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
২০১৯ সালে রাইট শেয়ার ইস্যু করে তালিকাভুক্ত কোম্পানি গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ব্যাংকঋণ পরিশোধে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে যখন টাকা উত্তোলন করে সে সময় সহযোগী সাত কোম্পানিকে অন্তত ৪৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া ছিল। অথচ সহযোগী কোম্পানিকে ঋণ না দিলে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ত না। ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছর অনুযায়ী গোল্ডেন হারভেস্টের ৩৮০ কোটি টাকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছিল। ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ ওই সময়ে কোম্পানিকে ৪৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, যা কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয়ের ১৯ শতাংশ। এ সময় কোম্পানির নিট মুনাফা হয় ২৫ কোটি টাকা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সুত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে সহযোগী কোম্পানিকে ঋণ দেয় তালিকাভুক্ত ১৩১টি কোম্পানি। চলতি বছর এর পরিমাণ ১০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে। সহযোগী কোম্পানিকে এভাবে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব কোম্পানি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করেছে।
২০০৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এসইসির এক প্রজ্ঞাপনে তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে বলা হয়, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি তার কোনো পরিচালকের অন্য কোনো কোম্পানিকে কোনো প্রকার ঋণ বা ঋণের বিপরীতে জামানত দিতে পারবে না। তবে কোম্পানির পর্ষদ ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করলে এবং সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা অনুমোদন করলে পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ দেওয়া যাবে। সিকিউরিটিজ আইনে এমন বিধান থাকলেও কোম্পানি সাধারণ সভায় সহযোগী কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেনি। এ ধরনের ঋণে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা লাভবান হলেও শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হয়েছেন।
এদিকে ২০১৬ সালে আইন তৈরি হলেও এতদিন তা প্রয়োগ করেনি এসইসি। এমনকি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানও কোনো পর্যবেক্ষণ বা আপত্তি দেয়নি। ডিএসই এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে ২০১৯ সালে ১৩১ কোম্পানিতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বেআইনি ঋণের বিষয়টি উদঘাটন করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ বিষয়ে ড. খায়রুল হোসেন কমিশনের নজরে আনলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে বর্তমানের পুনর্গঠিত কমিশন তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে বেআইনি ঋণ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কমিশনের সুনির্দিষ্ট আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ইতিমধ্যেই তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির পরিচালকদের বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। একই কারণে জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের আইপিও আবেদন বাতিল করেছে। একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে গত ১৩ আগস্ট সহযোগী কোম্পানিকে দেওয়া ঋণের সব তথ্য চেয়ে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে এসইসি। তথ্য পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি ঋণ ফেরত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে এসইসি সূত্রে জানা গেছে।
