ছাঁটাই হচ্ছে বিজেএমসির দুই-তৃতীয়াংশ জনবল

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২০, ০৪:৩৬ এএম

দেশের সরকারি সব পাটকল বন্ধের পর প্রশ্ন উঠেছে পাটকলগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) জনবল নিয়ে। বন্ধ হওয়া ২৫ পাটকলের কোথাও উৎপাদন কার্যক্রম না থাকলেও বিজেএমসির নিয়োগপ্রাপ্ত ২ হাজার ৯৫৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন এখনো স্বপদে। তাদের পেছনে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় করতে হচ্ছে মাসে ১২ কোটি টাকার বেশি। এ অবস্থায় বিদ্যমান জনবলের দুই-তৃতীয়াংশ ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার।

তবে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও কর্মক্ষম কর্মীদের ছাঁটাই না করে যেন অন্য কোনো জায়গায় তাদের বদলি (উদ্বৃত্ত কর্মী আত্তীকরণ) করা হয় সেই দাবিও উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান আবদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্ধ করা পাটকলগুলো এখন সরকারি-বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনায় (পিপিপি) ফের চালুর প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু বিজেএমসির যে জনবল আছে, তা মাত্রাতিরিক্ত। এ জন্য জনবলকাঠামো কমানোর চিন্তা চলছে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটির প্রথম সভা হবে কাল (বৃহস্পতিবার)। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কী প্রক্রিয়ায় এই জনবল কমানো হবে।

তবে বিজেএমসির ব্যবস্থাপক কাজী কামরুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০ বছর হলো এখানে চাকরি করছি। এখন সরকারি চাকরির বয়সও শেষ। বিদেশ থেকে পড়ালেখা করে এসে চাকরিতে ঢুকেছি। এখন যদি বেকার হতে হয়, তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি জানান, তার আত্মবিশ্বাস আছে যেকোনো দপ্তরে বদলি করা হলে সেখানে তিনি কাজ করতে পারবেন। তার মতো এমন অনেকেই আছেন। তাই তার দাবি, তাদের মতো যারা আছেন, তাদের যেন ছাঁটাই না করে অন্য কোনো দপ্তরে বদলি করা (উদ্বৃত্ত কর্মী আত্তীকরণ) হয়।

এ প্রসঙ্গে বিজেএমএসির চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, বিজেএমসির জনবলের পক্ষে আমি প্রতিনিধিত্ব করব। মিটিংয়ে অপেক্ষাকৃত কর্মক্ষম ও তরুণ জনবলকে আত্তীকরণ করার প্রস্তাব করা হবে। আর বাকিদের বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিজেএমসির ‘ঢাউস’ জনবলের জন্য সরকারকে প্রতি মাসে ১২ কোটি টাকার বেশি বেতন দিতে হয়। বেতন-ভাতাসহ সব মিলে বছরে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এত জনবল থাকার পর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বছরের পর বছর ধরে বিজেএমসির কলগুলো লোকসান দিয়ে আসছে। এ জন্য এক-তৃতীয়াংশ জনবল গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করা হবে। এ ক্ষেত্রে বন্ধ হওয়া পাটকলশ্রমিকদের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হয়েছে।

কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোন প্রক্রিয়ায় জনবল ছাঁটাই হবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মিটিংয়ের পর বলা যাবে।

বিষয়টি নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাটকল যত দিন চালু ছিল, তত দিন বিজেএমসি এসব প্রতিষ্ঠান দেখভাল করেছে। এখন সরকারের কাছে পাটকল থাকবে না। তবে পুনরায় চালু হলে বিজেএমসির কী ভূমিকা থাকবে, সেটা বলা যাচ্ছে না। তবে ভূমিকা যাহোক বিজেএমসির ঢাউস জনবলের দরকার নেই। ন্যূনতম জনবল রেখে বাকিদের বিষয়ে সরকারের ভাবতে হবে।

তিনি বলেন, পিপিপির মাধ্যমে এসব পাটকল উৎপাদনে আবার ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। আদৌ আসবে কি না এবং কবে আসবে তা কেউ জানে না। যদি কখনো আসেও তখন সীমিত পরিসরে কয়েকজন কর্মকর্তা দিয়েই সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকারি পাটকল পরিচালনা, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিজেএমসি গঠিত হয়। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বিলুপ্ত করার পর বিজেএমসির প্রয়োজন আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, বিজেএমসি থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং শিগগিরই গণমাধ্যমকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবহিত করা হবে।

জানা গেছে, এখন মিলগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, অবিক্রীত পাটপণ্য ও মজুদ কাঁচামালের মূল্য নির্ধারণের কাজ করছে একটি টাস্কফোর্স। এ সপ্তাহের মধ্যে বিজেএমসির সম্পদের সর্বশেষ তথ্য জানা যাবে। বিলুপ্ত ঘোষণার পর এসব সম্পত্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মিল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ নিরাপত্তা দলের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

আর্থিক লোকসানে থাকলেও প্রতি বছর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে বিজেএমসির। বিজেএমসির পাটকলে গত ৪৮ বছরের মধ্যে ৪৪ বছরই লোকসান হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে মোট লোকসানের পরিমাণ এখন ১১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত