বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কাস্টমস আইন ও খেলাপি আইনের যুগোপযোগীকরণের বিকল্প নেই। এ ছাড়া বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিমালাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যকার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। জবাবে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সরকারি সুবিধা ও প্রণোদনার ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা হবে না। এমনকি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিও সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। খুব শিগগিরই খেলাপি আইন ও কোম্পানি আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগের গতিপ্রবাহে কভিড-১৯-এর প্রভাব : সমস্যা ও উত্তরণ’ শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী। এ ছাড়া ওয়েবিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি।
স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কভিডপরবর্তী সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সময়োপযোগী সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া তিনি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন, সরকারি-বেসরকারি যোগাযোগ বাড়ানো, স্থানান্তরিত বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাশিত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কমপ্লায়েন্স, দক্ষ মানবসম্পদ, পণ্য পরিবহনে সহজতর প্রক্রিয়া, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিমালাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যকার সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, হ্রাসকৃত করের হার বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে, তবে আমাদের দেশে কর-জিডিপির আনুপাতিক হার এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে নতুন করদাতা খুঁজতে হবে। সরকার নীতি সংস্কারের ওপর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং নীতি সংস্কারের এ উদ্যোগ দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, খুব শিগগিরই খেলাপি আইন ও কোম্পানি আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর কাঠামোকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, এসইজেড অঞ্চলে খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে বিনিয়োগ করলে উদ্যোক্তারা ২০ শতাংশ ক্যাশ ইনশিয়েটিভ পাবে। তিনি জানান, মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি কমে ১০ শতাংশের নিচে আনা হবে। তিনি বেজা, বিডা এবং হাইটেক পার্ক প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের আরও ক্ষমতায়নের আহ্বান জানান। এ ছাড়া নীতিমালার সংস্কার এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো একান্ত আবশ্যক।
বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীর বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী এবং ২০১৯ সালে এশিয়াতে জাপানি বিনিয়োগ ছিল ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে বাংলাদেশে ০.০৯ শতাংশ জাপানিজ বিনিয়োগ এসেছে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরভিত্তিক অর্থনীতি এবং এশিায় অঞ্চলে আঞ্চলিক যোগাযোগ স্থাপনে জাপানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ট্যাক্সেশন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রিফর্ম অতীব গুরুত্বপূর্ণ ।
বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন জোঅ্যান ওয়াগনার বলেন, বাংলাদেশের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে এবং কভিড-১৯-এর কারণে ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, বায়ো-টেকনোলজি প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে কাজ করতে পারে।
জেট্রোর বাংলাদেশ আবাসিক প্রতিনিধি ইউজি এন্ডো বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ কর নীতিমালার সংস্কার ও আধুনিকায়ন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ সার্বিকভাবে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বাণিজ্য পরিবেশের উন্নয়ন হলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় হ্রাস পাবে।
স্যামসং-ফেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুততম সময়ে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সুবিধা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রদান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে।
আবদুল মোনেম লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম মহিউদ্দিন মোনেম বলেন, আমাদের দেশে ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অত্যন্ত প্রকট এবং এ সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। তিনি বিডা, বেজা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমন্বয় আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। তিনি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান।
অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পক্ষ থেকে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিতকরণ এবং কাস্টমস আইন ও খেলাপি আইনের যুগোপযোগীকরণের ওপর জোরারোপ করেন।
বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, সম্প্রতি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রবেশাধিকারের বিষয়টি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে এবং এ সুযোগ গ্রহণের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্রুততম সময়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তাবয়ন খুবই জরুরি।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম মনে করেন, জ¦ালানি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিতকরণ প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারছেন, যা একটি ইতিবাচক দিক।
