এক রশিতে মা-মেয়েকে বেঁধে এলাকা ঘোরাল ইউপি চেয়ারম্যান

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ০৭:৩৮ এএম

কক্সবাজারের চকরিয়ায় গরু চুরির অভিযোগ তুলে এক মা ও তার মেয়েকে পেটানোর পর মাজায় রশি দিয়ে বেঁধে এলাকায় ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মিরানুল ইসলামের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার দুপুরে হারবাং ইউনিয়নের পহরচাঁদা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে ওই নির্যাতনের দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে প্রকাশের পর গত শনিবার রাতে তা ভাইরাল হলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার শিকার দুই নারীর গায়ে বারবার হাত দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার তাদের ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্য একটি ছবিতে দেখা যায় গুরুতর আহত এক নারী কোমরে রশি বাঁধা অবস্থায় মাথা হেলে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাচ্ছেন। এছাড়া ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, কোমরে রশি বেঁধে দুই নারীকে প্রকাশ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন। তাদের পেছনে রয়েছে আরও অনেক মানুষ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার দুপুরে নির্যাতনের শিকার মা-মেয়েকে গরু চুরির অভিযোগে আটকের পর কোমরে রশি বেঁধে সড়কে ঘুরানোর পর নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে। মা-মেয়ের ওপর একদফা নির্যাতন চলার পর হারবাং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম চৌকিদার আমিনকে পাঠিয়ে তাদের রশিতে বেঁধে তার কার্যালয়ে আনান। সেখানে চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম নিজে তাদের আবার মারধর করেন। একপর্যায়ে মা-মেয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চেয়ারম্যানের লোকেরাই স্থানীয় হারবাং পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ফোন করে পুলিশ এনে তাদের হাতে মা-মেয়েকে মুমূর্ষু অবস্থায় তুলে দেন। পুলিশ তাদের চকরিয়া হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে ওই দুই নারীকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্যদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

নির্যাতনের শিকার মা-মেয়ে বর্তমানে চকরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হারবাং তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুক্রবার স্থানীয়রা ফাঁড়িতে খবর দিলে আমরা ফোর্স পাঠাই। আমাদের ফোর্স গিয়ে গুরুতর অবস্থায় মা-মেয়েকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আসে। আমরা তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘স্থানীয় এক ব্যক্তির দায়ের করা গরু চুরির মামলায় মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে মা-মেয়েসহ চারজনের বাড়ি পটিয়ার শান্তির হাটে। অপরজনের বাড়ি চকরিয়া লালব্রিজ এলাকায়।’

অন্যদিকে চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারীসহ গরু চোর সিন্ডিকেটের ৫ সদস্যকে এক কিলোমিটার ধাওয়া করে স্থানীয় জনতা আটকের খবরে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এ সময় ২ নারী ও ৩ পুরুষ সদস্যকে স্থানীয় ইউপি কার্যালয় থেকে আটক করে প্রথমে চকরিয়া হাসপাতাল ও পরে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। ।’

তবে চোর সন্দেহে কোনো নারীকে এভাবে নির্যাতন করা যায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান বলেন, ‘এভাবে রশি বেঁধে নির্যাতন করে পাড়া-মহল্লায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানোর বিষয়টি প্রথম অবস্থায় আমরা জানতে পারিনি। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরাও তাদের ওপর নির্যাতনের কথা প্রথমে জানায়নি। বরং তারা যে গরু চুরি করতে এলাকায় এসেছিল, সেটি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে। আমরা শুধু মামলার বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউপি কার্যালয় থেকে পুলিশ তাদের নিয়ে এসেছে। পরে নির্যাতনের একটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশ গুরুত্ব সহকারে নেয়।’

এদিকে মা-মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরু চুরিতে অভিযুক্তদের আমি পরিষদে এনে মেরেছি বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক না। ওইদিন বিকেল তিনটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে এলাকায় ফিরে আসি। পরে গরু চোর আটকের ঘটনাটি জানতে পারি। তখন বিষয়টি আমি চকরিয়া থানা পুলিশ ও ইউএনওকে ফোন করে জানাই।’

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি : গরু চোর সন্দেহে মা-মেয়েকে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের নির্দেশে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক (উপ-সচিব) শ্রাবন্তী রায়কে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জেনেছি। আমি তখন গরু চোরদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ দিয়েছি। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও বিষয়টি আমি নিজেই খতিয়ে দেখছি। অভিযুক্তরা যদি মনে করে তাদের অপমান বা হয়রানি করা হয়েছে তাহলে তাদের অভিযোগও আমলে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত