সম্পত্তিতে নারীর অধিকার

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২০, ১২:২১ এএম

‘কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি/ মামার বাড়ি চাতলপার/ বাপের বাড়ি বামনবাইড়া/ নিজের বাড়ি নাই আমার।’ কথাগুলো আমার ভীষণ প্রিয় এক পল্লীগীতির। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বিংশ শতকের গোড়ার দিকে জন্ম নেওয়া শিল্পী গিরিন চক্রবর্তীর এই লোকসংগীতটি ’৪৭-এ দেশহারা উন্মুল বাঙালিদের বহু কাঁদিয়েছে। কিন্তু এই গান শুনলেই আরেক চিরবঞ্চিত শ্রেণির কথা মনে পড়ে। গানের কথা যত এগোয়, ‘নিজের বাড়ি নাই’ ছাপিয়ে গানটি যেন হয়ে ওঠে সেই বঞ্চিত শ্রেণির মানুষগুলোর ‘অস্তিত্বহীনতার’ এক অমোঘ বয়ান। কোন শ্রেণির কথা বলছি জানতে চান? বলছি ‘নারী’র কথা। তারা ‘আছে’ কিন্তু তারা ‘নেই’। তারা বয়ে চলছে সমবেত অনাচারের ভার। ভয়াবহ বৈষম্য ও অনাচারে নিমজ্জিত এই পুরুষালি ত্রাসের দেশে নারীর তাসের ঘরের চিত্রই আজ তুলে ধরব।

ময়মনসিংহের মরিয়ম...

বিয়ের কয়েক বছর পরই স্বামী মারা গেছে। কোলে-কাঁখে দুই মেয়ে। সন্তানদের নিয়ে অভাবে-অনটনে স্বামীর ভিটেয় এক যুগের অধিক কাটিয়েছেন তিনি। মেয়েদের কৈশোর ছাড়িয়েছে। কিন্তু এখন দিন যত যায় মা ও মেয়েদের অন্তরাত্মা ততই ভয়ে কাঁপে। মেয়েদের চাচারা মনস্থ করেছেন ভিটেয় তাদের আর থাকতে দেবেন না। কারণ চাচারা মনে করেন, মেয়েদের হিস্যা বিশেষ নেই। প্রশ্ন ওঠে কেন নেই? উত্তরটির সারসংক্ষেপ এই : ছেলে থাকলে বাবার ওয়ারিশ পুরোটা পায়। মেয়েরা তো পায় না। মেয়েরা সামান্য কিছু পাবে। কিন্তু মেয়েদের তো বিয়ে-থা হবে। চলে যাবে ‘স্বামীর বাড়ি’। মেয়েরা ‘বাপের বাড়ির’ জমি দিয়ে কী করবে? বরং জমির দাম ধরে কিছু টাকা দিয়ে দিলেই হলো। বিধবা স্ত্রীর কী হবে? তার হিস্যা নেই? উত্তর এসেছে, তার আবার হিস্যা কি!

এই হলো আমার পরিচিত একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ‘সুশীল নাগরিকরা’ অবশ্য বলতে পারেন, ‘বললেই হলো নাকি! দেশে আইনকানুন নেই? মামলা ঠুকে দিলেই ‘বাপ বাপ’ করে হিস্যা বুঝিয়ে দেবে’। না, জনাব। কাজীর গরু কিতাবে যেভাবে থাকে মাঠে সেভাবে থাকে না বলে বহু আগেই প্রবাদে বলেছে। যে নারীর নিত্য টানাটানি, যার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই, তাকে আপনি ‘হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন’? দুই-চার দিন আদালতের বারান্দায় হাঁটলেই টের পাবেন কত শুকতলা খোয়ালে কত ন্যায়বিচার।

মরিয়মের সন্তান আছে। দুই মেয়ে। তারা ‘ছেলে সন্তান’ নয়। তাই মেয়ে সন্তানেরা থেকেও ‘না থাকার সমতুল্য’। এরকম মরিয়ম একজন নয়। আপনার নিরাপদ জীবনের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে আশপাশে একটু উঁকি দিয়ে দেখুন। আমাদের সমাজে পুরুষালি আচার-নিয়ম-কানুন-নীতি-নৈতিকতা দিয়ে নারীর জন্য সমাজে যে ফাঁস রচনা করা হয়েছে তার ভেতরে নারীরা দমবন্ধ হয়ে মরছেন। ওই ফাঁসের কারণেই সন্তান থাকার পরেও ‘ছেলে’ না থাকার ‘অপরাধে’ মেয়ে সন্তানেরা সমাজের চোখে ‘অদৃশ্য’। পুত্র বা পুরুষকে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে রচিত হয়েছে এদেশের উত্তরাধিকার আইন। তাই, ছেলের প্রত্যাশা করতে আপনি বাধ্য। পুত্রপ্রত্যাশী আরেক মায়ের কাহিনী শুনুন।

ছেলেকে দত্তক নেওয়া মা...

দুই মেয়ের জন্ম দিয়েছেন শিক্ষক দম্পতি রিয়াদ-রাবেয়া। পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে এখানে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করছি। কিন্তু ‘ছেলে নেই’, ‘ছেলে নেই’ শুনতে শুনতে তাদের কান ঝালাপালা। কেন? ছেলে কেন লাগবে? কারণ সহায়-সম্পত্তি ‘কে দেখবে’? ভিটেয় ‘আলো জ্বালবে কে’? এসব শুনতে শুনতে এই দম্পতিরও দুঃখ হয়। ‘ভিটেয় প্রদীপ’ দেওয়ার জন্য কন্যাসন্তান যথেষ্ট নয়। তাই, পুত্রসন্তানের আশায় রাবেয়া আবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। একবার, দুইবার, তিনবার। কিন্তু বারংবার গর্ভপাত হতে থাকে।

অবশেষে অতি সংগোপনে তারা একটি নবজাতক ছেলেকে দত্তক নেন। জন্মের পরপরই শিশুটিকে তাদের কাছে দিয়ে দেন অতি দরিদ্র এক মা, যার আরও কয়েকটি সন্তান আছে। দত্তকের ঘটনাটি জানেন কেবল রাবেয়া-রিয়াদের অতি নিকট ক’জন। প্রতিবেশী ও পরিজনরা ছেলেটিকে দম্পতির আপন পুত্র বলেই জানেন। এই নবজাতককে বুকের দুধ পান করানোর জন্য রাবেয়া ওষুধ খেয়ে কৃত্রিমভাবে তার বুকে দুধ আনিয়েছিলেন। সেই দুধ পান করেই বেড়ে উঠছে শিশু।

আপনার চারপাশে চোখ মেলে তাকান। দেখতে পাবেন বহু ধনী ও শিক্ষিত মানুষের ঘরে পর পর তিন কন্যা, অথবা দুই কন্যার পর এক পুত্র। একটি ‘বহুমূল্য পুত্রসন্তান’ পাওয়ার ব্যাকুলতা থেকেই এত সন্তান নেওয়া।

একুল ওকুল অন্ধকার...

চলুন ফিরে যাই গিরিন চক্রবর্তীর পল্লীগীতির কাছে। গানে বলছে, ‘আমি রে যেন জলের ঢেউ/ আমার বলতে নাই রে কেউ/চান্দের হাট ভাইঙ্গা গেছে/একুল ওকুল অন্ধকার।’ আহা! বঙ্গভূমের নারীর জীবন! বাবার বাড়ির সময়টুকু তার ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে বটে। কিন্তু এদেশের নারীর জীবন ‘যেন জলের ঢেউ’। ‘বাবার বাড়ি’ ‘স্বামীর বাড়ি’র ঠেলাঠেলিতে তার দুকুল অন্ধকার।

বাবার বাড়িতে জন্মের পর থেকে মেয়েটিকে এই মন্ত্র শুনিয়ে বড় করে যে, তার ‘প্রকৃত ঠিকানা স্বামীর ঘর’। কিন্তু স্বামীর ঘরে সে কখনো সেবিকা, কখনো আশ্রিতা, কখনো দাসী কখনো-বা স্বামীর গরবে গরবিনী। আদতে নারী উন্মুল। নারীর এই উন্মুলতার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ আইনে জারি থাকা বৈষম্য। সম্পত্তি দিয়ে সমাজে ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বাবার সম্পত্তিতে আইনের মাধ্যমেই পুত্র ও কন্যার মধ্যে বৈষম্য জারি রাখা হয়েছে। এটি এমনই এক বৈষম্য যেখানে নারীকে পুরুষের অর্ধেক হিসেবে আইনেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এভাবেই স্টেট এপারেটাসের ভেতর দিয়ে নারীর অস্তিত্বকে আলগোছে ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘অদৃশ্য’ করে দেওয়ার চল জারি আছে। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিলি-বণ্টন ব্যবস্থা নারীকে ক্ষমতাহীন করে রাখার এক নিগূঢ় চক্রান্ত।

গত একশ বছরে ভূ-ভারতের রাজনীতি আমূল পাল্টে গেছে। এক দেশ ভেঙে জন্ম নিয়েছে তিন দেশ। বিংশ শতকের গোড়ার দিকেও যে নারীর বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল বারণ সেই নারীরাই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হচ্ছেন। যে নারী ছিলেন অবরোধবাসিনী তারাই আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। তারাই আজ বিমান চালাচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যুদ্ধ করছেন। দেশে নারীশিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে। নারীরা রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজবিজ্ঞান কোথাও পিছিয়ে নেই। তাহলে সম্পত্তিতে এই বৈষম্য কেন?

নয়া জামানার নয়া ডাক, বৈষম্য নিপাত যাক...

সমাজ বদলেছে। সমাজে ক্ষমতায়িত স্বাধীন নারীদের মনোভঙ্গি বদলেছে। কিন্তু আইন এখনো পড়ে আছে পেছনে। সংবিধানে নারী-পুরুষ সব নাগরিকের সমান অধিকার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। যদি সংবিধান সত্য হয় তাহলে পিতার সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যাকে কেন অসমভাবে দেখা হবে? কেন কন্যাকে দেওয়া হবে পুত্রের অর্ধেক? যেই সংসারে পুত্র নেই, সেই সংসারে পিতার মৃত্যু হলে কেন কন্যারা সম্পদ হারানোর আতঙ্কে থাকবে? কেন কন্যাদের আইনের মারপ্যাঁচে ‘বঞ্চিত’ ও ‘নিগৃহীত’ করা হবে? যদি সংবিধানে ঘোষিত ‘সমানাধিকার’ সত্য হয় তাহলে বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইনে যে বৈষম্য আছে তা দূরীকরণে আইনের সংস্কার করতে হবে।

আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়াতেও সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। গত ১১ আগস্ট ডেইলি স্টার-এর এক সংবাদে জানিয়েছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে আজও পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

১৯৯১ সাল থেকে এই দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে নারী থাকলেও বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক উত্তরাধিকার আইনের কোনো বদল হয়নি। শুধু শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে না। এদেশে ‘সিস্টেমিক ডিসক্রিমিনেশান’ বা কাঠামোগতভাবে সমাজের পরতে-পরতে যত বৈষম্য বিরাজ করছে সেগুলো দূর করতে হবে। নইলে মরিয়মের মতন নারীদের দুর্দশার শেষ হবে না। যদি বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার না হয় তাহলে রাবেয়ার মতন নারীরা ঘরে ঘরে ‘পুত্র’ সন্তান লাভের ব্যাকুলতায় প্রাণান্ত চেষ্টা করতেই থাকবেন।

এই বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা সহজে বদলাবে না। বদলকে অনিবার্য করে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যে মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর নেতা-নেত্রীদের জরুরি উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

লেখক কবি ও সহকারী অধ্যাপক আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত