বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২০, ১২:২৩ এএম

দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা করোনাকালে যতটা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে তা আগে কখনো ঘটেনি। আগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ নানা ভোগান্তি, হয়রানি ও ক্ষতির শিকার হলেও এ সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি আর প্রতারণার সংবাদ গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মনোযোগ পেয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারও এসব বিষয়ে নজর দিয়েছে।  বেসরকারি হাসপাতালগুলোর যে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে তার অন্যতম লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে তাদের উদাসীনতা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত টাস্কফোর্স হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়নের জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল তাতেও ৫২ শতাংশ হাসপাতাল নবায়নের আবেদন করেনি। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়নের জন্য এক মাসের সময় বেঁধে দিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত টাস্কফোর্স। গত রবিবার নির্ধারিত সময় পার হয়েছে। এ সময় সারা দেশে লাইসেন্সের মেয়াদ নেই এমন হাসপাতালের ৫২ শতাংশই লাইসেন্স নবায়নের জন্য কোনো আবেদন করেনি। অর্থাৎ লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ এমন ৮ হাজার ৪৮১টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৪৮ শতাংশ বা ৪ হাজারের মতো নতুন আবেদন জমা পড়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে মোট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাডব্যাংক মিলিয়ে মোট প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৩ হাজারের মতো। এর মধ্যে বর্তমানে লাইসেন্স আছে ৪ হাজার ৫১৯টির। এর বাইরে লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠান। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২-এর অধীনে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে জুলাই মাসের শুরুতে ভুয়া করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা, কভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় সরকার নির্ধারিত হাসপাতাল হওয়ার পরও অর্থাৎ বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও রোগীদের কাছ থেকে বিল আদায় এবং লাইসেন্সবিহীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দেয় সরকার। এর মালিক সাহেদ করিম জালিয়াতির দায়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন জালিয়াতের ওপর কভিড-১৯ পরীক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব দিয়েছিল। গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছয়টি হাসপাতালেরই সনদ ছিল না।  পরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনিয়ম বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে কোনোটি সিলগালা, কোনোটির কার্যক্রম বন্ধ এবং কোনোটিকে জরিমানা করে। সে সময় দেখা যায়, পুরো দেশে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহের একটি বড় অংশের নিবন্ধন নেই। এর বাইরে লাইসেন্স নবায়ন করেনি এমন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যাও কম নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৩ আগস্টের মধ্যে সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিবন্ধন নবায়ন করার নির্দেশনা জারি করেছিল। 

গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম বৈঠক শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ২৩ আগস্টের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন না করলে বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হবে। জানা গেছে, এখন তারা বিষয়টি টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য যেখানে কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে, সেখানে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনোমতেই লাইসেন্সের নবায়ন ছাড়া চলতে পারে না। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জায়গায় যদি টাস্কফোর্স বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সে সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আগের সিদ্ধান্তের অনুরূপ হতে হবে। লাইসেন্স নবায়ন না করে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনা করা যাবে না, এ বিষয়টি পরিষ্কার করে ঘোষণার বিকল্প নেই।  লাইসেন্স পাওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম এবং উৎকোচ গ্রহণের সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। যারা এসব অনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। 

পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হাসপাতালগুলোকে একটা নিয়মের মধ্যে না আনতে পারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দক্ষতার অভাব। এর কারণ লোকবলের অভাব।’ এক্ষেত্রে সীমিত জনবল দিয়েই যাতে কাজটি পূর্ণাঙ্গভাবে করা যায়, সেটা সরকারকে ভাবতে হবে। না হলে দ্রুত লোকবল বাড়াতে হবে। এর সঙ্গে মনিটরিংটাও বাড়াতে হবে। কারণ নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি না করলে হাসপাতালগুলো থেকে অনিয়ম দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাড়াহুড়া করে নয়, স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করে সংস্কার করা প্রয়োজন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত