চুরির অভিযোগ তুলে নির্যাতন

চুরির মামলায় মা মেয়ের জামিন গ্রেপ্তার ৩

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২০, ০৩:০৪ এএম

কক্সবাজারের চকরিয়ায় গরু চুরির অভিযোগ তুলে মা-মেয়ের কোমরে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত রোববার গভীর রাতে তাদের হারবাং এলাকা থেকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন চকরিয়া থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান। পরে গতকাল সোমবার বিকেলে গ্রেপ্তারদের ৫৪ ধারায় আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গ্রেপ্তাররা হলেন উত্তর হারবাং বিন্দারবানখীল এলাকার মাহবুবুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম (১৯), ইমরান হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩০) ও জিয়াবুল হকের ছেলে নাছির উদ্দিন (২৮)।

চকরিয়া থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই নারীকে রশিতে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় কয়েকটি ভিডিও ও ছবি পুলিশ সংগ্রহ করেছে। এসব ভিডিও ও ছবি দেখে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় হারবাং ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে রবিবার রাত ৩টার দিকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

চুরির মামলায় মা-মেয়ের জামিন : চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গতকাল দুপুরে নির্যাতিত মা ও মেয়েসহ তিনজনকে জামিন দিয়েছেন। চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী ইলিয়াস আরিফ জানান, তিনি চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নির্যাতিত মা ও মেয়েসহ গরু চুরির মামলায় কারাগারে আটক থাকা ৫ জনের জামিন আবেদন করেছিলেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজিব কুমার দেব কারাগারে থাকা পারভিন আক্তার, সেলিনা আক্তার শেলী ও রোজিনা আক্তারের জামিন মঞ্জুর করেন। মামলার অন্য দুই পুরুষ আসামির জামিন নামঞ্জুর করেন বিচারক।

এদিকে মা-মেয়ের কোমরে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত দলের প্রধান কক্সবাজারের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শ্রাবন্তী রায়সহ অন্য সদস্যরা গতকাল দুপুরে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম মিরানসহ সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। বিস্তারিত তদন্ত শেষে তারা আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে জানিয়েছেন শ্রাবন্তী রায়।

চুরির অভিযোগে মা-মেয়েসহ ৫ জনকে আটকের পর কোমরে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় গত রবিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা নেয় চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মামলাটিতে চকরিয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন বিচারক রাজিব কুমার দেব। একই ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্তে অসংগতি থাকলে হস্তক্ষেপ করবে হাইকোর্ট : গরু চুরির অভিযোগ তুলে মা-মেয়েকে প্রকাশ্যে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি নজরে রাখবে উচ্চ আদালত। একইসঙ্গে এ নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কোনো অসংগতি থাকলে তাতে হস্তক্ষেপ করবে হাইকোর্ট। ওই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনা হলে এমন অভিমত জানায় আদালত। বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেসমিন সুলতানা ও এ এম জামিউল হক ফয়সাল।

অ্যাডভোকেট এ এম জামিউল হক ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অমানবিক এই ঘটনাটি আদালতে নজরে এনে শুনানিতে বলেছি, এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই শুধু নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারও লঙ্ঘিত করেছে। আদালত বলেছে, যেহেতু এ নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এটি তাদের নজরে থাকবে এবং তদন্তে অসংগতি থাকলে তারা হস্তক্ষেপ করবেন।’

গরু চুরির অভিযোগ তুলে গত শুক্রবার চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের পহরচাঁদা এলাকায় মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে কোমরে রশি বেঁধে কয়েকটি গ্রাম ঘুরিয়ে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিরানুল ইসলাম আরেক দফা নির্যাতন করেন। এক পর্যায়ে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ তাদের চকরিয়া হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

গরু চুরির অভিযোগে শুক্রবার রাতে স্থানীয় একজন চকরিয়া থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় আদালতের মাধ্যমে পরদিন শনিবার বিকেলে মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। রশি দিয়ে বেঁধে মা-মেয়েকে প্রকাশ্যে নির্যাতনের ঘটনাটি ফেইসবুকে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত