দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা সারকারখানার ডিলারদের অভিযোগ, কারখানায় উৎপাদিত সারের সঙ্গে আমদানিকৃত নষ্ট সার নিতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে অগ্নিকাণ্ডের বছরখানেক পর কারখানা ফের চালু হলেও অতিরিক্ত পরিমাণ সার আমদানি করা হয়। আমদানিকৃত বেশিরভাগ সার দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় থেকে মান হারিয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আমদানিকৃত এই সারের মান নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের, তাই এই সার নিতে চান না অধিকাংশ ডিলার। তবে ট্রাক মালিক সমিতির নেতৃস্থানীয় কিছু লোক, কিছু অসৎ ডিলার ও কারখানার কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিলে গড়ে ওঠা একটি চক্র ডিলারদের আমদানি সার নিতে বাধ্য করছে। শুধু যমুনায় উৎপাদিত সার নিতে ট্রাকপ্রতি দুই-তিন হাজার টাকা দিলে অনেকে পার পান। সম্প্রতি এসব কারণে দুই দিন সার নেওয়া বন্ধ রাখেন ডিলাররা। কিন্তু তাও রেহাই মিলছে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠান যমুনা সারকারখানা জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার তারাকান্দিতে অবস্থিত। এটি থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাসহ কারখানার আওতাধীন ১৯ জেলায় মেটানো হয় ইউরিয়া সারের চাহিদা। কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এক বছর বন্ধ থাকে কারখানাটি। এ সময় ইউরিয়া সারের চাহিদা মেটাতে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয় ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯৮৪ দশমিক ২০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার। এক বছর পর যমুনা সারকারখানা চালুর সময় আমদানিকৃত সারের মজুদ ছিল ৩৮ হাজার ২২৯ দশমিক ৩৫ টন। এরপরও বিভিন্ন সময় আমদানি করা হয় আরও ৪২ হাজার ৯৩ দশমিক ৬০ টন। বর্তমানে যমুনা সারকারখানায় আমদানিকৃত সারের মজুদ রয়েছে ৪০ হাজার ৯০০ টন এবং যমুনায় উৎপাদিত সার রয়েছে ৮৫ হাজার টন। কারখানার আওতাধীন ১৯ জেলায় ১ হাজার ৯০০ জন ডিলারের মাধ্যমে এসব সার বিতরণ করা হয়। ডিলারদের প্রতি গাড়িতে ৯ টন যমুনায় উৎপাদিত ইউরিয়ার সঙ্গে ৩ টন করে আমদানিকৃত সার সরবরাহ করত কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। আমদানিকৃত সার না নেওয়ার দাবিতে সম্প্রতি ২ দিন সার উত্তোলন বন্ধ রাখেন ডিলাররা। পরবর্তী সময়ে ডিলারদের সঙ্গে বৈঠকে কারখানা কারখানা কর্র্তৃপক্ষ প্রতি ট্রাকে ২ টন করে আমদানিকৃত সার দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে গত ২৪ আগস্ট থেকে ফের সার উত্তোলন শুরু করেন ডিলাররা।
ডিলাররা অভিযোগ করেন, কারখানা চালুর পরও অতিরিক্ত পরিমাণ সার আমদানি করে কর্র্তৃপক্ষ। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আমদানিকৃত এসব সার যমুনায় উৎপাদিত সারের সঙ্গে ডিলারদের নিতে বাধ্য করে কারখানার প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ট্রাকপ্রতি দুই-তিন হাজার টাকা না দিলে জোর করে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যবহারের অনুপযোগী আমদানিকৃত সার।
যমুনার ডিলার ইকরামুল হক নবীন জানান, ‘এখানে কোনো বাফার গুদাম না থাকলেও কারখানা চালুর পরও অসৎ উদ্দেশ্যে সার আমদানি করে ফেলে রাখা হয়। আমদানিকৃত বেশিরভাগ সারই জমাট বাঁধা ও ওজনে কম। জমে যাওয়া এসব সার হাতুড়ি দিয়েও ভাঙা যায় না। দীর্ঘদিন এসব সার পড়ে থেকে মান নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা এসব সার না কেনায় ডিলারদের গুদামেই পড়ে থাকছে। এতে করে ডিলাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের জামালপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী বলেন, ‘কারখানা থেকে প্রতিদিন ১০০ গাড়ি সার ডেলিভারি দেওয়া হলে তার মধ্যে ৫০ গাড়িতেই অতিরিক্ত পরিমাণে আমদানিকৃত ব্যবহারের অনুপযোগী সার চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গাড়িপ্রতি দুই হাজার টাকা করে নিচ্ছে। সিন্ডিকেটের বিষয়ে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন মহলে বারবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনোভাবেই এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারখানা কর্র্তৃপক্ষের যে যোগসাজশ, তা বন্ধ করা যায়নি।’
তবে যমুনা সারকারখানা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মুকুল বলেন, ‘সিন্ডিকেট করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেউ এমন অভিযোগ দিয়ে থাকলে তাকে প্রমাণ দিতে বলেন। ট্রাক মালিক সমিতি নিয়ম অনুযায়ী শুধু ট্রাক পরিচালনা করে। এর বাইরে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমাদের ইমেজ নষ্ট করার জন্য এমন বলে থাকতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুদীপ মজুমদার জানান, ‘নতুন করে কোনো আমদানিকৃত সার আনা হয়নি। কারখানা বন্ধের সময় সরকার যে সার বরাদ্দ দিয়েছিল সেটাই বিতরণ করা হচ্ছে। প্রত্যাশিত সময়ের ২ মাস আগেই কারখানা চালু হওয়ায় আমদানিকৃত সারগুলো থেকে যায়। আমদানিকৃত সারগুলোর মান ভালো আছে।’
কারখানাকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সম্পর্কে জানতে চাইলে সিন্ডিকেটের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে সুদীপ মজুমদার বলেন, ‘আমার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই, আমি নতুন যোগদান করেছি। তবে এমন হয় না।’
