গাস্তঁ রোবের্জের জন্য শোকগাথা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২০, ১২:১৮ এএম

সিনেমা তত্ত্বের কথা উঠলেই কোনো না কোনো সময় তিনি ঠিক চলে আসতেন আইজেনস্টাইন, বাঁজা, মেৎজ ও মিত্রি প্রসঙ্গে। প্রায় হাতে ধরে শেখাতেন সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখার চোখ কীভাবে তৈরি করতে হবে। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন তিনজন ফিল্ম তাত্ত্বিকের নাম বলুন, যিনি আপনার মধ্যে সিনেমা বোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন এক, দুই, তিন সব উত্তরই আমার কাছে এক হবে তিনি গাস্তঁ রোবের্জ। আমি একেক সময় ঠাট্টা করে বলি যে আমি আদ্যন্ত কলকাত্তাইয়া। জন্ম-কর্ম, পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা, রাজনীতি, প্রেম সব এ শহরকে কেন্দ্র করে। এখন এ বর্ষার সকালে মনে হচ্ছে যে কারণে কলকাতা নিয়ে এমন মোহমুগ্ধতা তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি গত বুধবার চলে গেলেন। তিনি গাস্তঁ রোবের্জ। সেই ১৯৬১ সালে কানাডা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন এই জেসুইট ফাদার। তখন কলকাতা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় উত্তাল। শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই অচলায়তন ভাঙার সময়। এ অচলায়তন ভাঙার মেজাজের প্রেমে মজলেন ফাদার রোবের্জও। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের সন্ন্যাসী শিক্ষক মুগ্ধ হলেন সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজি দেখে।

সারা জীবন ফাদার একইভাবে অপু ট্রিলজি প্রসঙ্গ উঠলেই কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম বাকপটু হয় উঠতেন! কলকাতা তখন অদ্ভুত এক বায়নারিতে দুভাগ হয়ে আছে। কফি হাউজের তুমুল আড্ডায় বামপন্থিদের বড় অংশ কট্টর ঋত্বিক ঘটকের সমর্থক। পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় পছন্দের হলেও তার বিরুদ্ধে বামপন্থি মহলের অভিযোগ তিনি যথেষ্ট রাজনৈতিক নন। পলিটিক্যাল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিতের জায়গা ঋত্বিক তো বটেই, মৃণাল সেনেরও অনেক পরে। এই তর্কাতর্কি আরও বেড়ে যায় সত্তর দশকে। কলকাতার বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ। নকশালবাড়ির আগুন দাবানলের গতিতে প্রভাবিত করছে শিল্পী, সাহিত্যিক, এমনকি সিনেমা পরিচালকদেরও। আক্ষরিক অর্থেই সিনেমা হয়ে উঠছে সমাজের আয়না। যাতে প্রতিফলিত হচ্ছে পুরো সমাজের আলো অন্ধকারের টুকরো টুকরো নানা ছবি। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’, মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ ,‘কলকাতা-৭১’, তপন সিনহার ‘আপনজনে’র পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জনঅরণ্য’র মতো সিনেমা করলেও প্রগতি মহলে তিনি ঠিকঠাক বিপ্লবী নির্মাতার স্বীকৃতি পাননি।

এরকম এক সময়ে রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিটে এক গির্জার ভেতরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এক শাখা হিসেবে ফাদার রোবের্জ গড়ে তুললেন চিত্রবাণী। সিনেমা শিক্ষার সম্পূর্ণ এক অন্য ধারার প্রতিষ্ঠান। কলকাতায় বিশের দশকে ফাদার লাঁফো সিনেমা মাধ্যমকে ব্যবহার করতেন শিক্ষার প্রয়োজনে। আর সিনেমা মাধ্যমকে নিছক বিনোদন হিসেবে না দেখে সমাজ সচেতন এক শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে দেখা দরকার বলে সত্তর দশকে গাস্তঁ রোবের্জ গড়ে তুললেন চিত্রবাণী।

লাঁফো ও রোবের্জ দুজনই ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের সঙ্গে যুক্ত। পার্ক স্ট্রিটের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের বিশাল বিল্ডিংটি একদা ছিল এ শহরের অন্যতম প্রাচীন এক নাট্যশালা সাঁ সুসি থিয়েটার। ফলে কলকাতার সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিতে সেন্ট জেভিয়ার্সের অবদান কিছু কম নয়। ফাদার রোবের্জ চিত্রবাণীর মধ্য দিয়ে শুধু এক সিনেমা শেখার প্রতিষ্ঠানই গড়লেন না, বস্তুত এক স্বয়ংসম্পূর্ণ কালচারাল হাব বা সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের অত্যাধুনিক এক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেন। চিত্রবাণীতে ঢুকলেই মনে হতো নতুন এক সিনেমা আবহে আপনি ঢুকে পড়েছেন। এ এক অদ্ভুত জ্ঞানসমুদ্র যেখানে নুড়ি কুড়ানোও মহা আনন্দের কাজ। গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, মহিনের ঘোড়াগুলির গৌতম চট্টোপাধ্যায় থেকে শিল্প সাহিত্যে, চিত্রকলা সব ক্ষেত্রের প্রতিভাবানদের মিলনমেলা ছিল চিত্রবাণী।

সত্যজিৎ রায়ের প্রতি অদ্ভুত এক আবেগ ছিল ফাদারের। চিত্রবাণী গড়ে তোলার পেছনে শোনা যায় সত্যজিতের উৎসাহ কম ছিল না। পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎ রায় বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন চিত্রবাণী অডিটরিয়ামে। অনেক পরে নব্বই দশকের একেবারে শেষের দিকে আমরা যখন একটুআধটু সিনেমা করার স্বপ্ন নিয়ে চিত্রবাণী যাচ্ছি, ফাদারের ঘনিষ্ঠ হচ্ছি, তখন বুঝেছিলাম সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে ফাদারের মূল্যায়ন কত সঠিক। সত্যজিৎ রায়ের ছবিও যে কতটা রাজনৈতিক তা রোবের্জ স্যার আমাদের ধরে ধরে দেখিয়েছিলেন। লাউড স্লোগানের পাশাপাশি অনেক ইমেজ, নিচু গলার ফিসফিসানিও কখনো কখনো মিছিলের স্বর হয়ে উঠতে পারে এ বোধ চারিয়ে দিয়েছিলেন গাস্তঁ রোবের্জ। পরবর্তীকালে ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যা নিয়ে ডকুমেন্টারি করতে গিয়ে ফাদারের কাছে শেখা এই বিষয়টাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছিলাম। কেউ যদি এখন নতুন করে গুজরাট ডকুমেন্টারি দেখেন তবে খেয়াল করবেন সচেতনভাবেই ছবিতে নিচুস্বর ব্যবহার করেছি। কথা কম বলে আক্রান্ত মানুষজনের মুখ চোখের বিষন্নতা ধরতে চেয়েছি। এসবই ছিল ফাদারের প্রভাব। ফাদার চলে যাওয়ার পর বলতে দ্বিধা নেই যে গুজরাট গণহত্যার ছবি যেটুকু যা ছাপ ফেলতে পেরেছে তার সিংহভাগ কৃতিত্ব ফাদার রোবের্জের। আমি শুধু তার শিক্ষা অনুসরণ করেছি মাত্র।

ফাদার সম্ভবত তা বুঝতেও পেরেছিলেন। শুটিং শেষ করে কলকাতায় ফিরে আসার পর রূপকলা কেন্দ্রের তখনকার ডিরেক্টর লেখক অনিতা অগ্নিহোত্রীর প্রবল উৎসাহে পুরো রাশ সবাই মিলে প্রথম দেখি ওই কেন্দ্রের ভেতরে। এখন আবার সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে। অনিতাদি তো ছিলেনই। আর ছিল আমার বন্ধুরা সুচরিতা, উজ্জ্বল, মোনা, তাপস আরও অনেকে। চুপচাপ দেখছিলেন আরও একজন ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ। এটাও ছিল ফাদারের আরেক বৈশিষ্ট্য। যে মনোযোগ দিয়ে উনি সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিক বা তার পরের প্রজন্মের গৌতম, বুদ্ধদেব বা উৎপলেন্দু দেখেন, ঠিক একই রকম গুরুত্ব দিয়ে উনি আমাদের মতো সাধারণ তরুণ পরিচালকদেরও কাজ দেখতেন।

স্টুডিওতে আলো জ্বলে উঠল একসময়। তিন-চার ঘণ্টার রাশ ধৈর্য ধরে দেখার পর ফাদারের মুখে একচিলতে হাসি এসেই নিমেষে যেন হারিয়ে গেল। ভয় পেলাম তবে কি ওই হাসি বিদ্রুপের! কিছুই দাঁড়াবে না ছবিটা! বন্ধুরা, অনিতাদি কত কিছু বলছেন। কানে ঢুকছে না। মনে মনে কাঙালের মতো চাইছি তিনি কিছু বলুন। ফাদার চলে গেলেন। যাওয়ার আগে থমথমে মুখ করে শুধু বলে গেলেন ‘আপত্তি না থাকলে কাল সকাল তোমাকে ঠিক আটটায় ফোন করব।’ আপত্তি করব কি! আমি একলব্যের মতো দ্রোণাচার্যের কথা শুনব বলেই তো অপেক্ষা করছি। পরের দিন কাঁটায় কাঁটায় সকাল আটটায় ফোন বেজে উঠল। ও প্রান্তে গমগমে গলায় গা¯ঁÍ রোবের্জ প্রথমেই বলে উঠলেন ‘কনগ্রেটস মাই বয়..’; আরও কীসব বলে গেলেন। আমার কানে কিছুই ঢুকছে না। মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে উঠে সেরা চলচ্চিত্রের শিরোপা জিতে নিচ্ছি। ওই সময় থেকেই ফাদারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হতে লাগল। ফাদারের লেখা ‘অ্যানাদার সিনেমা ফর অ্যানাদার সোসাইটি’ বই পড়ার পর সিনেমা নিয়ে যাবতীয় ভাবনাচিন্তাই পাল্টে গেল। এখন সত্যি কথা বলতে কি, ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার হওয়া যেন অনেকের কাছেই একধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডকুমেন্টারি বানানোও প্রযুক্তির দৌলতে অধিকাংশই মনে করেন অতি সোজা বিষয়। দুই-চারটি ইন্টারভিউ, তার সঙ্গে মানানসই শট আর জলদগম্ভীর ভয়েসওভার ব্যস; ছবি শেষ। ফাদার শিখিয়েছিলেন, ‘তোমার দর্শন মনন বোধ ঠিক না থাকলে তুমি পুরস্কার পেলেও সে ছবি কখনো উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।’ গাস্তঁ রোবের্জ বলতেন, ‘কখনো গ্ল্যামার ও পুরস্কারের পেছনে ছুটবে না। শুধু মাধ্যমটাকে ভালোবেসে পরিশ্রম করে যাও। ঠিক স্বীকৃতি পাবে।’

ভারতের সব রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে অন্য ধারার ডকুমেন্টারি, বিশেষ করে রাজনৈতিক তথ্যচিত্রের গুরুত্ব কম। বামপন্থিরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও অবস্থা কিছু পাল্টায়নি। ইন্টারন্যাশনাল সিনেমা ফেস্টিভ্যালেও ডকুমেন্টারি দেখানো হয় নমো নমো করে। গাস্তঁ রোবের্জ এ নিয়ে বিরক্ত ছিলেন। ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারদের জন্য চিত্রবাণীর দরজা ছিল সবসময় খোলা। তথাকথিত সেন্সরশিপ নিয়েও কোনো মাথাব্যথা ছিল না ফাদার রোবের্জের। শিল্পের স্বাধীনতায় প্রবল বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা ছিল তার। চিত্রবাণীর লাইব্রেরির মতো অত সমৃদ্ধ ফিল্ম লাইব্রেরি এশিয়ার খুব কম দেশে আছে। একটা সময় মুনমুন সেন ও তারপর সুনেত্রা ঘটক লাইব্রেরির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার আকাশে আজ সকাল থেকে মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। তবে সকালে একটা সময় আকাশের মুখ বড় বিষন্ন ছিল। তখন এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে। হতে পারে বিষয়টি প্রতীকী। ওই সময়ই কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির এক গোরস্তানে সমাধি হলেন কলকাতার এক শ্রেষ্ঠ সন্তান ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ। এ শহর আরও একবার নিঃস্ব হলো।

গাস্তঁ রোবের্জ

[জন্ম : ২৭ মে ১৯৩৫

মৃত্যু : ২৬ আগস্ট ২০২০]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত