দেশের পুঁজিবাজারে কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জের অধিকাংশ শেয়ারের দর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সবচেয়ে যেটা শুভ লক্ষণ, তা হলো লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। মাঝে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ চল্লিশ-পঞ্চাশ কোটি টাকায় নেমে এসেছিল। এখন লেনদেন বলা চলে পূর্বাবস্থায় ফিরে এসেছে; মাঝেমধ্যে সেটা হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করছে। এত তাড়াতাড়ি যে এরূপ ইতিবাচক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব হবে, তা ছিল অনেকেরই কল্পনার বাইরে। অতিদ্রুত এই ধনাত্মক প্রত্যাবর্তনের কারণ কী?
আসলে পুঁজিবাজার হলো আস্থা ও বিশ্বাসের স্বচ্ছ মোড়কে আবৃত অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি মঞ্চ, যেটার আঁধার হলো সুশাসন ও স্বচ্ছতা। এই আস্থার কারণে দেশি-বিদেশি বড় বড় ধনী মানুষ যেমন এখানে বিপুল পুঁজির সমাবেশ ঘটান, তেমনি দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় এখানে নিয়ে এসে বিন্দু-বিন্দুতে সিন্ধুর মতো বিনিয়োগের মহিরুহ গড়ে তোলেন; দেশকে করেন শিল্পায়িত, দেশের অবকাঠামোকে করেন উন্নত। মানুষ আইন মেনে সরকারকে ট্যাক্স দিতে কার্পণ্য করে, কিন্তু লোকসান হতে পারে এই সত্য জানা সত্ত্বেও সে সম্ভাবনাময় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পিছপা হয় না। মানুষের এই সম্ভাবনার পেছনে ছোটার প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বময় জুয়া ও ক্যাসিনো সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে আছে; যেখানে মোটের ওপর নিট কোনো লাভের হিসাব থাকে না, শুধু থাকে পরবর্তী চালে প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা। কিন্তু পুঁজিবাজারে জুয়ার মতো নিট ক্ষতির পরিবর্তে থাকে অর্থের জোগানদাতা ও উদ্যোক্তা উভয়েরই লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা। এখন সেই সম্ভাবনার আলো টানেলের অপর প্রান্তে দৃষ্ট হচ্ছে। এটাই এর পুনরুজ্জীবনের প্রধান হেতু।
পুঁজিবাজার তলানিতে পৌঁছানোর সময় বর্তমান কমিশন সমাসীন হয়ে মহামারীর মধ্যেও বাজার উন্নয়নে যেভাবে চারদিকে দৌড়ঝাঁপ দিয়ে চলছিল, সেটা ছিল সবার কাছে দৃশ্যমান। যদিও সেই তৎপরতায় এবার বাজেটে বাজার উন্নয়নে তেমন কোনো প্রণোদনা আসেনি; বরং তাতে এসেছে বিকর্ষণ করার মতো কিছু উপাদান; কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে এক বছরের লক-ইন এবং অনিবন্ধিত কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স কমানোর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির কর হার না কমানো এর দুটি দৃষ্টান্ত। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমানত ও ঋণের বিপরীতে দেয় সরকার নির্ধারিত সুদ-হার এবং সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনয়ন ও অর্থের পুঁজিবাজারমুখী প্রবাহকে উৎসাহ জোগাচ্ছে। আসলে কমিশন এ পর্যন্ত যে কাজগুলো করেছে, সেগুলোই মানুষের আস্থা ফেরাতে বেশি সাহায্য করছে। আইপিও ((Initial Public Offering) নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ ছিল না। বিগত কমিশন তার সুদীর্ঘ কার্যকালে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর অছিলায় যে বিপুলসংখ্যক আইপিও বাজারে নিয়ে আসে, সেগুলোর বেশির ভাগের মূল্য ফেইস ভ্যালুর নিচে নেমে যায়। অনুমোদন দেওয়ার সময় তারা এগুলোতে কোনো ত্রুটি খুঁজে পাননি। কিন্তু বর্তমান কমিশন আইপিও অনুমোদনকালে কীভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিয়াশীল করিৎকর্মা কুশীলবদের তেলেসমাতি ধরে ফেললেন এবং মাত্র দু-তিনটি ছাড়া বাকি আইপিওগুলো ফেরত দিয়ে দিলেন, তা সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আগের চেয়ারম্যান প্রায়ই বলতেন, তার আমলে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত আইনকানুন, বিধিবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। কথাটা আংশিক হলেও সত্য। কিন্তু সেগুলো তিনি প্রয়োগ করেননি, দু-একটি ক্ষেত্রে করলেও গুরু পাপে লঘু দণ্ড দিয়ে পাপীদের আরও লাভবান করেছেন; যিনি অপকর্ম করে দশ কোটি টাকা কামাই করেছেন, তাকে জরিমানা করেছেন দশ লাখ টাকা। এরূপ লাভজনক দণ্ড পেতে অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যে কারণে অনেক উদ্যোক্তা তার কোম্পানি যাতে স্টক এক্সচেঞ্জে ডিলিস্ট হয়ে যায়, তার জন্য পরোক্ষভাবে তদবির পর্যন্ত করেছেন বলে শুনেছি; ডিলিস্ট হয়ে পড়লে উদ্যোক্তার সব ঝামেলা ও জবাবদিহি শেষ, পচে মরেন শুধু বিনিয়োগকারীরা। বর্তমান কমিশন এই রোগেরও দাওয়াই নিয়ে আসতে চাচ্ছে। তারা অপরাধের মাত্রার সঙ্গে শাস্তির মাত্রার মিল রেখে ইতিমধ্যে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছেন, যা মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।
যেকোনো কোম্পানির লক্ষ্য অর্জনে তার কার্যক্রম কতটা আন্তরিকতা নিয়ে পরিচালিত হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে ওই কোম্পানিতে উদ্যোক্তা পক্ষের স্বার্থের পাল্লাটা কতটা ভারী তার ওপর। সেখানে উদ্যোক্তাদের স্বার্থ যদি নামমাত্র হয়, তবে সেই কোম্পানিকে লাভজনকভাবে এগিয়ে নেওয়া তাদের মিশন-ভিশন হতে পারে না; বরং সেখানে কোম্পানির ক্ষতি করে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বৃদ্ধির চিন্তা প্রাধান্য পেতে থাকে। এই প্রবণতা রোধকল্পে বিধি প্রণয়ন করে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে অন্যূন শতকরা দুই ভাগ এবং সমষ্টিগতভাবে ত্রিশ ভাগ শেয়ার ধারণ করার বাধ্যবাধকতা আনা হয়। অজ্ঞাত কারণে বিগত কমিশন তাদের এই বিধি বাস্তবায়নে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি; এই ফাঁকে বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, অর্ধ শতাধিক কোম্পানির মালিকপক্ষের শেয়ার ধারণের পরিমাণ এই ন্যূনতম শর্তের অনেক নিচে। বর্তমান কমিশন খেলাপিদের তাদের দায়িত্ব নিয়মিতকরণে সময় বেঁধে দিয়েছে। এর ফলে অনেক কোম্পানির কুশীলবরা নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন। এটাও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে। এসবের বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দেশে অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের যোগ্যতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সেটাকে সযত্নে লালন করার জন্য অগ্রভাগে গৃহীত নানা প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা। দেশ এই কভিড-পরিস্থিতিতেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে; খসড়া হিসাব অনুযায়ী গেল বছর ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড লি কভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অর্থনীতির ভি (v) ধাঁচের অর্থাৎ খাঁড়া গড়নের পুনরুত্থান প্রাক্কলন করেছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানিতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে; যেকোনো সময় তা ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যেতে পারে, সরকারি ঋণ-জিডিপির হারও বেশ নিচে; ৩৩ থেকে ৩৪ শতাংশ। সর্বোপরি, বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী, কষ্টসহিষ্ণু এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর যোগ্যতাসম্পন্ন। সরকার কভিভ মোকাবিলায় লক্ষাধিক কোটি টাকার যে ১৯টি স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, লকডাউন অবস্থা উঠে যাওয়ার পর সেগুলো এখন কাজ করতে শুরু করেছে; অর্থনীতি বেগবান হতে শুরু করেছে।
কথায় বলে ‘A good start is half the battle.’ সেজন্য কমিশন অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু পুরো লক্ষ্য অর্জন করতে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে; করতে হবে অনেক কাজ। পুনঃক্রয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি, ডিলিস্টেড কোম্পানির সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় কাঠামো, মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আনতে হবে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা, বাজারের গভীরতা বাড়াতে আনতে হবে প্রোডাক্টের বৈচিত্র্য; যেখানে থাকবে বন্ড, ডিবেঞ্চার ও নানা ধরনের ডেরিভেটিভ। বাজারে তালিকাভুক্তিতে যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে, নইলে ভালো কোনো কোম্পানি আসবে না। সরকারের প্রতিশ্রুত তার লাভজনক কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে আর্থিক দণ্ডের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ফৌজদারি দণ্ডের ব্যবস্থাও করতে হবে; রাঘববোয়াল ও তাদের কলাকৌশল চিনতে আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোর ওপর চোখ বোলাতে হবে। তবে একসঙ্গে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না, তাতে বেসামাল অবস্থা তৈরি হয়ে যেতে পারে। আবার এখানে চ্যালেঞ্জও আছে অনেক। কাজেই কমিশন যে অজনপ্রিয় অনেক কাজ করতে গিয়ে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অঙ্গীকার, দৃঢ়তা ও সৎসাহস থাকলে কোনো বাধাই তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। রাজস্ব আহরণের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টায় রসদ জোগাতে পুঁজিবাজারই হতে পারে প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ভাণ্ডার। তাদের আরও আছে পেশাগত দ্বন্দ্বের আশঙ্কা; কমিশনের সবাই অ্যাকাডেমিশিয়ান। অ্যাকাডেমিশিয়ানদের জ্ঞান-গরিমা বেশি থাকলেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কম থাকে, যেজন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের এই দুর্বলতাকে ক্যাশ করার সুযোগ নিতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর সময় পরিকল্পনা কমিশনে অ্যাকাডেমিশিয়ানদের নিয়ে এরূপ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কাজেই কমিশনকে সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে; আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমরা আমাদের ভাগ্যের বেশ কিছুটা উন্নতিও করছি, বিশ্ববাসী এখন আমাদের সম্মানের সঙ্গে দেখতে শুরু করেছে। এই অভিযাত্রায় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকায় অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে আগুয়ান হয়েছেন; এখন সেটার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুরু করা দরকার। আমাদের প্রত্যাশা বর্তমান কমিশন বিএসইসির (BSEC) এরূপ ঋজু ও স্বাদেশিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
