আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশক এবং সিডও সনদ গৃহীত হওয়ার চার দশক হতে চলল কিন্তু নারীর প্রতি বৈষম্য প্রথা ঘোচেনি। যে সমাজ বা সামাজিক ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ সমঅধিকার ভোগ করে না, নারী প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হয়, রাষ্ট্র নারী এবং পুরুষকে সমমর্যাদায় দেখে না, তা-ই নারী পুরুষের বৈষম্যমূলক সমাজ। প্রথার দোহাই দিয়ে সমাজ অভ্যাসবশত পুরুষকে নারীর চেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রদান করে, সমাজ পুরুষকে নারীর চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে চলে। এই প্রক্রিয়া নারীকে পুরুষের অধস্তন রাখার প্রক্রিয়া, যা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে সমাজের মানসপটে স্থাপন করে রাখা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। এই জাতীয় সমাজ ব্যবস্থায় নারীর নায্য নাগরিক অধিকার না পাওয়া, নাগরিক অধিকার বলে যথাযথ ক্ষমতায়িত না হওয়া বা অধস্তনতা একটি মামুলি বিষয়। যেখানে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন পরিবার, আইন, শিক্ষা, সরকার প্রথাশ্রয়ী হয়ে নারীকে এই অধস্তন অবস্থানে সাধারণত ধরে রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতেগোনা কয়েকজন নারীর অবস্থার পরিবর্তন হলেও, সাধারণ নারীসমাজের অবস্থানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয় না। নারীর অবস্থান বলতে বোঝায়, নাগরিক হিসেবে নারীর মর্যাদা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ, পরিবারে এবং উত্তরাধিকার সম্পদে সমঅধিকার, পছন্দ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সামগ্রিক ক্ষেত্রে অধিকার ইত্যাদি অর্জন। সামাজিক বৈষম্য যা মনুষ্যসৃষ্ট, তা দূরীকরণের মাধ্যমে নারীর অবস্থানের উন্নয়ন সম্ভব। এই সম্ভবকে বাস্তবে রূপান্তর করতেই সিডওর ((Convention on the Elimination of All forms of Discrimination Against Women-CEDAW)) আবির্ভাব।
সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। যে আইনের বিধিবিধান মেনে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সংবিধানের কাজ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ। আর সিডও হচ্ছে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সনদ। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক সনদ বা কনভেনশন- সিডও গৃহীত হয়। জাতিসংঘ কর্র্তৃক ১৯৭৫ সালকে ‘বিশ্ব নারীবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করার পর নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে সিডও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সনদ বা কনভেনশন গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে নারীর জন্য সমান অধিকারের লক্ষ্য অর্জনের পথে সমগ্র বিশ্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সূচিত হয়। সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সব বিষয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সেই পথে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন করে বৈষম্যমূলক আচরণের অবসানের জন্য এবং পর্যায়ক্রমে আইন প্রণয়ন করে বৈষম্যমূলক আচরণের অবসানের জন্য এই সনদে আহ্বান জানানো হয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা স্থাপনই সিডও দলিলের মূল মর্মবাণী। ১৯৮০ সালের ১ মার্চ থেকে এই সনদে স্বাক্ষর শুরু হয়। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ২০টি রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর এই সনদ কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। তাই তখন থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩ সেপ্টেম্বর সিডও দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর সিডও সনদ স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে। সিডও সনদে মোট ৩০টি ধারা রয়েছে। ৩০টি ধারার মধ্যে ১৪টি প্রশাসনিক আর ১৬টি নারী অধিকার বিষয়ক। এই ১৬টি ধারা নারীর সমতা স্থাপনের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী কী করণীয়, তা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহকে বাতলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এই দলিলের ৩টি ধারা ২, ১৩(ক) এবং ১৬-১(গ) ও (চ) বাদ রেখে অনুমোদন করে স্বাক্ষর করে। ১৯৯৭ থেকে বাংলাদেশ সরকার ২ ও ১৬-১(গ) ধারা ছাড়া অন্য দুটি ধারার ওপর থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে। এ পর্যন্ত ১৮৬টি দেশ এই কনভেনশন অনুমোদন করে স্বাক্ষরদান করেছে। ইসলামি আইন মেনে চলা অনেক মুসলিম দেশ, যেমন ইয়েমেন, মরক্কো, তিউনিশিয়া সিডও ধারা-২ ও ধারা-১৬-১(গ)সহ সিডও সনদ অনুমোদন করেছে। নারীর মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া সিডও সনদের প্রাণকথা হিসেবে গণ্য ধারা-২ এবং অন্যতম একটি মূলধারা-১৬-১(গ) থেকে বাংলাদেশ সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। এই ধারা দুটি সংরক্ষণ বাংলাদেশের জন্য যুক্তিযুক্ত নয়। ধারা-২-এ বলা হয়েছে, যেসব আইন, রীতি, প্রথা নারীর প্রতি বৈষম্য তৈরি করে তা বাতিলের জন্য সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ধারা ১৬-১(গ)-তে বলা হয়েছে, বিবাহ, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রসমূহ নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবে। এই ধারাগুলো বাদ দিয়ে বাংলাদেশে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি, নারীদের পদদলিত করা, অধিকার বঞ্চিত করা বা অধিকার হরণ করা অর্থাৎ গাছের আগায় বসিয়ে গোড়া কেটে দেওয়ার শামিল।
অথচ নাগরিক হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সমতা স্থাপনের লক্ষ্যে সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রতি কিছু নির্দেশনা নির্দিষ্ট করে বলা আছে। যেমন ধারা : ১০- জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।/ধারা : ২৭-সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।/ধারা : ২৮(২)-রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।/ধারা : ২৮(৪)-নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।/ধারা : ২৯(১)-প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।/ধারা : ২৯(২)- কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের জন্য অযোগ্য হইবেন না; কিংবা সে ক্ষেত্রে তার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে, সব মানুষই স্বাধীনতা, সম-মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জাতি, বর্ণ, ধর্ম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সব অধিকারের সমান অংশীদার। অর্থাৎ সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের অধিকার লাভের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার পার্থক্য করা চলবে না। ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের আলোকে সবাই এমন একটি সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধিকারী যেখানে এ ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সব অধিকার ও স্বাধীনতা পূর্ণভাবে আদায় করা যায়। সিডও সনদ নারী অধিকারের আন্তর্জাতিক বিল হিসেবে স্বীকৃত। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সনদ সিডওতে তুলে ধরা হয় নারীর অধিকার মানবাধিকার। সাধারণত নারী-পুরুষ সমতা সম-অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন সমঅধিকার, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নীতিকে নির্দেশ করে। একজন মানুষ হিসেবে, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ অধিকার আছে। লেখাপড়া, চাকরি, সম্পত্তি, সিদ্ধান্তগ্রহণ, মতপ্রকাশ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, আইনি অধিকার, মজুরি, ভোটাধিকার, তালাক প্রদান ইত্যাদিতে পুরুষের মতোই নারী তার প্রাপ্য অধিকার পাবে। নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন-পৈতৃক সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর অধিকার পুরুষের সমান নয়, প্রচলিত কিছু আইনের দোহাই দেখিয়ে সংবিধানকে অকার্যকর রেখে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, ফলে নারী সংবিধানের বদৌলতে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এইক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-
(১) এই ভাগের বিধানাবলির সহিত অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।/(২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোনো আইন প্রণয়ন করিবে না এবং অনুরূপ কোনো আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।
সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। তাহলে সংবিধানের ওপর কি অন্য কোনো আইন থাকতে পারে? প্রত্যেক নাগরিকের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে। সম্পত্তির অধিকার স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নারীর সামাজিক অধিকার; সম্পত্তির অধিকারে সমতা অর্জিত না হওয়ার অর্থ শুধু অর্থনীতির মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা নয়, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ারও শামিল। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ এবং ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সময় কালকে আন্তর্জাতিক নারী দশক রূপে ঘোষণা করে। এ ঘোষণায় বলা হয় নারীরা উন্নয়নের চালিকাশক্তি ও উপকারভোগী উভয়েই। এই সময়েই নারীর সম-অধিকারের বিষয়টি মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে প্রথম বিবেচিত হয় এবং তা সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের আয়োজনে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে ‘সমতা উন্নয়ন ও শান্তি’- স্লোগান ঘোষিত হয়। ১৩৩টি দেশের ১২০০ প্রতিনিধি এতে যোগ দেন যার ৭৩ শতাংশই ছিল নারী। প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন দেশ কর্র্তৃক সিডও সনদ অনুমোদন এবং দেশে দেশে গড়ে ওঠা নারী সংগঠনগুলোকে তাদের কর্মকাণ্ড ও দাবি-দাওয়ার সপক্ষে একটি সাধারণ রূপরেখা এবং ন্যায্যতা প্রদান করে। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনা বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার রূপে ঘোষণা করে এবং নারীর মানবাধিকারজনিত সমস্যাকে জাতিসংঘের সার্বিক মানবাধিকার কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একীভূত করা হয়। ১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনে প্রথম নারীর ক্ষমতায়ন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে চিহ্নিত হয় এবং ১৯৯৫ সালে সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনে নারীদের সমস্যার পুরো বিষয়টি উত্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ কর্র্তৃক নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়।
বাংলাদেশের নারীসমাজ সংবিধান প্রদত্ত সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই নারীদের সমস্যা নানাবিধ, তা শুধু সমান অধিকার না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসব সমস্যার অনেকটাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সৃষ্ট। এছাড়াও সংবিধান যেসব নাগরিক অধিকারের কথা বলে, রাষ্ট্র কি তা মেনে চলে? পরিতাপের বিষয় হলো, জাতিসংঘের নানা মানবতাবাদী তৎপরতা ও মানবতাবাদীদের অবিরত তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাখ্যার পরও সমাজজীবনে নারীসমাজের সমান অধিকার ও ক্ষমতায়নের কাম্য স্বস্তি এখনো বহুদূর। সমাজের অভ্যন্তরে এমন অস্বস্তি, দূরত্ব এবং বৈষম্য বজায় রেখে কি বলা যায়, দেশ সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে?
লেখক কথাসাহিত্যিক
