হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় ৬টি নদী বয়ে গেছে। এর মধ্য থেকে কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ১১ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ১৭ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশন বলছে, কিশোরগঞ্জের নদীগুলো যদি ফ্লাশ ফ্লাডের কারণ হয় তাহলে এত দীর্ঘ নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ কতটুকু যৌক্তিক। এ ছাড়া ওসব নদী ড্রেজিং ও বিভিন্ন খাল পুনর্খনন করা হবে। এ উদ্দেশ্যে ১ হাজার ১১২ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে চায় পাউবো। এ-সংক্রান্ত পাউবোর পাঠানো প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ১৭ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ, ৬৫ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ৩৭ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার খাল পুনর্খনন, ৮ কিলোমিটার ওয়েব প্রটেকশন, ৪৩ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ, একটি জিপ, তিনটি মোটরসাইকেল, একটি স্পিডবোটসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়, বানানো, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণ ও বিদেশে প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, করোনার কারণে সরকারের অনেক ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে বেশ কিছু কম্পোনেন্ট বাতিল করার নির্দেশনা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া ১৭.৩৫ কিলোমিটার নদীরক্ষা বাঁধের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, কিশোরগঞ্জের নদীগুলো যদি ফ্লাশ ফ্লাডের কারণ হয়, তাহলে এত দীর্ঘ নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ কতটুকু যৌক্তিক। এ ছাড়া পুরো নদীর দৈর্ঘ্য, কতটি স্থানে তীর প্রতিরক্ষা কাজ করা হবে, হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল স্টাডি ও ব্যথেমেট্রিক সার্ভের মাধ্যমে বিস্তারিত ডিজাইন এবং ডিজাইনের ভিত্তিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা প্রয়োজন। যদিও প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) তা উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজের পর কী কী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা পাবে তা-ও উল্লেখ করা হয়নি ডিপিপিতে।
প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাবদ ৪২ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক করোনা-পরবর্তী অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণের সংস্থান বাদ দিতে বলেছে কমিশন।
প্রকল্পের আওতায় একটি জিপ কেনা বাবদ ৯৪ লাখ টাকা, তিনটি মোটরসাইকেল কেনা বাবদ ৫ লাখ টাকা, একটি স্পিডবোট কেনা বাবদ ৫০ লাখ টাকা, একটি ইঞ্জিনবোট বাবদ ৭ লাখ টাকা, ৭ সেট কম্পিউটার বাবদ ৫ লাখ টাকা, দুটি ফটোকপিয়ার বাবদ ৩ লাখ টাকা, প্রকৌশল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বাবদ ৪০ লাখ টাকা এবং আসবাব বাবদ ১৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, সরকারের সীমিত সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে প্রকল্পের আওতায় দুটি মোটরসাইকেল কেনা বাবদ ৩ লাখ টাকা, দুই সেট কম্পিউটার (প্রিন্টার, স্ক্যানারসহ) বাবদ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, একটি ফটোকপিয়ার বাবদ দেড় লাখ টাকা, ১ সেট লেবেলিং মেশিন ও টোটাল স্টেশন বাবদ ৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখা যেতে পারে। তবে একটি জিপ, একটি স্পিডবোট, একটি জলযান এবং আসবাব বাবদ বরাদ্দ বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৬৫ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং বাবদ ৪৩১ দশমিক ৭৭ কোটি টাকার বরাদ্দ চওয়া হয়েছে, যা প্রতি ঘনমিটারে ১৮১ দশমিক ৪০ টাকা। প্রস্তাবিত নদী ড্রেজিং কাজ নির্ধারণের বিষয়ে হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল স্টাডি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয় বিধায় এ ধরনের স্টাডি সম্পাদনের পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের আওতায় ৪৩ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন না হলে জমি অধিগ্রহণ পরিহার করা সমীচীন বলে মনে করে কমিশন। প্রকল্পটি পাস হলে চলতি বছর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে। সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, হাওরের বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলস্রোতে আনা হবে। এ জন্য সরকার পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে। হাওরবাসীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার পক্ষে রয়েছি, কিন্তু কোনোভাবেই যেন কেউ বাড়তি বা অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় যে করে হোক ঠেকানো হবে।
পাউবো বলছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাওরের ফসল রক্ষার্থে নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। ৩৭ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করে নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন ও শুস্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। ড্রেজট ম্যাটেরিয়ালস দ্বারা আটটি ভিলেইন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ এবং আট কিলোমিটার ওয়েভ প্রটেকশনের মাধ্যমে হাওর এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তাসহ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা। পরিবেশের প্রভাব থেকে প্রকল্প এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রকল্পের মাধ্যমে গাছ লাগানো হবে।
প্রকল্পের ডিপিপিতে বলা হয়েছে, হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ জেলার উল্লেখযোগ্য নদীর মধ্যে ধনু, ঘোড়াউত্রা, বৌলাই, কালনী-কুশিয়ারা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ অন্যতম। ধনু নদী সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার প্রবাহিত বাউলাই বা বালু নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় ঘোড়াউত্রা নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটির গতিপথের অধিকাংশই হাওর এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ঘোড়াউত্রা নদীটি কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার শিংপুর ইউনিয়নে ধনু নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এরপর নদীটি একই জেলার বাজিতপুর উপজেলার মাইজচর ইউনিয়নে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। পথে সিঙ্গুয়া নদীটি নিকলী উপজেলার নিকলী ইউনিয়নের ঘোড়াউত্রা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বরাক নদী থেকে কুশিয়ারা নদী উৎপত্তি হয়ে বরদপুর হয়ে অমলসিদ নামক স্থান হয়ে নবীগঞ্জের ভেতরে প্রবেশ করে দিরাই হয়ে আজমিরীগঞ্জে কালনী নাম ধারণ করে অষ্টগ্রামে ধলেশ^রী নদীতে পতিত হয়েছে। ধলেশ^রী নদী মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। নদীগুলোর গতির পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হাররের বিভিন্ন এলাকায় এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে বর্ষাকালে প্রবাহ বেড়ে গেলে দুই পাশের প্লাবন ভূমি দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। লুপ তৈরি হওয়ার ফলে আউটার বেন্ড এলাকায় নদীভাঙন তীব্র হয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীতে পলি জমা, নদীতীর ভাঙন অব্যাহত আছে। এরূপ বউলাই, মেঘনা নদী ও বহ্মপুত্র নদেরও বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে। নদীভাঙনের কারণে স্থানীয় জনসাধারণ ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জায়গাজমি হুমকির সম্মুখীন। অপরদিকে নদী-খাল ভরাটের ফলে নিষ্কাশন ও নাব্য হ্রাস পাচ্ছে। এতে বন্যার প্রকোপ বাড়ছে। আগাম বন্যার ফলে হাওর এলাকার কৃষকের ফসলহানি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট দেখা দেয়। এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ২০১৯ সালে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে।
