বিদেশি কর্মীদের প্রবেশে খুলল ১০ স্থলবন্দর

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:০১ এএম

বিভিন্ন প্রকল্প, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা ১০টি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্পের কাজ পুনরায় চালু করা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কাজ অব্যাহত রাখতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২৪ আগস্ট এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করে গতকাল বুধবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অবহিত করেছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে এসব স্থলবন্দর। বিদেশি কর্মীদের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত দিয়ে খুলে দেওয়া স্থলবন্দরগুলো হচ্ছেবেনাপোল, ভোমরা, বাংলাবান্ধা, হিলি, বুড়িমারী-রৌমারি, দর্শনা, নাকুগাঁও, তামাবিল, শেওলা ও আখাউড়া। বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈধ ভিসা থাকতে হবে। ভ্রমণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইস্যুকৃত পিসিআরভিত্তিক কভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেটের ইংরেজিতে অনুবাদ করা কপিসহ স্থলবন্দরে থাকা দায়িত্বরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং অভিবাসন কাউন্টারে বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে। স্থলবন্দরে থাকা চিকিৎসকের দৃষ্টিতে কভিড উপসর্গমুক্ত হতে হবে। এসব বিদেশি কর্মীর কোয়ারেন্টাইনের কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

গত ৮ মার্চ প্রথম দেশে করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ২২ মার্চ থেকে স্থলবন্দরগুলো দিয়ে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। নিষেধাজ্ঞার কারণে জরুরি প্রয়োজনেও ভারতীয়সহ বিদেশি নাগরিকরা স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবশে করতে পারেননি। এতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়। 

দেশে বিভিন্ন প্রকল্প, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কত বিদেশি কর্মী কাজ করছে জানতে চাইলে কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেননি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে বিপুল পরিমাণ বিদেশি এদেশে কাজ করছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি। সংস্থাটি গত ৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, কম করে ধরলেও বাংলাদেশে আড়াই লাখ বিদেশি কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে পর্যটক ভিসায় এসে কাজ করেন ১ লাখ ৬০ হাজার কর্মী। এসব বিদেশি কর্মী প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়। টিআইবি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতার নামে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়।

টিআইবি বলেছে, এ দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে গেলে জনপ্রতি নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৩ হাজার থেকে ৩৪ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। বৈধভাবে বিদেশি কর্মী আনা হলে আটটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। অবৈধভাবে বিদেশি কর্মী আনা হলে তিন ধাপেই নিয়োগ চক্র শেষ হয়। বেশিরভাগই পর্যটক ভিসায় এসে এ দেশে তারা কাজ করেন।

সব মিলিয়ে আট ধরনের কাগজপত্র ঠিক করতে এই নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন করতে হয়। ভিসার সুপারিশপত্র, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা সংগ্রহ, বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন, কর্ম অনুমতির জন্য আবেদন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, দুই ধরনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধিএই আট ধরনের কাগজপত্র প্রক্রিয়া করতে ঘুষ দিতে হয়। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনে এ দেশে বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। বিভিন্ন সেক্টরে আমরা পিছিয়ে আছি। সেসব সেক্টরের উন্নতির জন্য তাদের কোনো বিকল্প নেই। তাদের এদেশে নিয়ে আসার জন্য নানা নিয়মকানুন রয়েছে। হয়তো এগুলো পরিপালনে চর্চার অভাব রয়েছে। এগুলো দূর করতে হবে।

বর্তমানে মোট ২১ খাতে ৪৪ দেশের শ্রমিক বাংলাদেশে কাজ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ভারতের। এরপর চীন, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে এবং নাইজেরিয়ার নাগরিকরা রয়েছেন। যেসব খাতে বিদেশি শ্রমিক কাজ করছেন এগুলো হলো তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বায়িং হাউস, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, মোবাইল ফোন কোম্পানি, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া শিল্প, চিকিৎসাসেবা, কার্গো সেবা, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডস, আন্তর্জাতিক এনজিও, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি, অডিট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, প্রকৌশল, ফ্যাশন ডিজাইন, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন, পোলট্রি খাদ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত